নেপালের ভোটাররা কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে

হিমালয়কন্যা নেপাল তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার বিস্ময়কর পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে। ২০০৮ সালে দীর্ঘ ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একটি হিন্দু রাষ্ট্র থেকে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর ছিল নেপালের ইতিহাসের প্রথম বড় সন্ধিক্ষণ। তবে রাজতন্ত্র-পরবর্তী দেড় দশকে দেশটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মুখ দেখেনি। ঘনঘন সরকার পরিবর্তন, দুর্নীতি এবং মাওবাদী ও মূলধারার দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক গভীর রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি করেছিল। গত দুই দশকের এ অস্থিরতা নেপালের গণতন্ত্রকে এক জটিল সংকটে ফেলে দেয়। কিন্তু চলতি বছর নেপালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সে সংকট উত্তরণের সাহসী প্রচেষ্টা দেখা গেছে। বালেন্দ্র শাহ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তার শপথ নেয়ার পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সাধারণ নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর এ নতুন সরকার গঠিত হলো। এটি কেবল শাসক পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, বরং নেপালি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের এক নবতর সংগ্রাম।

নেপালের এ নির্বাচনের পটভূমি রচিত হয়েছিল ২০২৫ সালের মধ্যভাগে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। দীর্ঘ সময় ধরে নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন-ইউএমএলএর মতো প্রথাগত দলগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান বা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, নেপালের মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৮-৪০ বছরের মধ্যে। এ তরুণরা মূলত ‘জেন-জি’ প্রজন্মের প্রতিনিধি। নতুন এ প্রজন্ম পুরনো আদর্শিক সংঘাত দেখতে চায়নি। বরং তারা মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিবান্ধব শাসন ব্যবস্থাই প্রত্যাশা করছিল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের তরুণ প্রজন্ম নেতৃত্ব নয়, বরং গোটা রাষ্ট্র পরিচালনা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন চাচ্ছিল। রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি চরম অনাগ্রহ ও অনাস্থাই শেষ পর্যন্ত নেপালে ব্যালট বিপ্লবে রূপ নিয়েছে।

নেপালের সাধারণ নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার ক্ষেত্রে বেশকিছু কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ সক্রিয় ছিল। প্রথমত, ডিজিটাল বিপ্লব ও সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন। বালেন্দ্র শাহ ও তার দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রথাগত প্রচারণার চেয়ে টিকটক ও ফেসবুককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এভাবে সরাসরি তরুণ প্রজন্মের সমর্থন আদায় করা গেছে। দ্বিতীয়ত, আদর্শহীন বাস্তববাদী রাজনীতি। দীর্ঘদিন নেপালের রাজনীতি সাম্যবাদ বা উদারবাদের মতো তত্ত্বের জালে আটকে ছিল। কিন্তু জেন-জি ভোটারদের কাছে এসব তত্ত্বের চেয়ে ‘ফলাফল’ বা কাজের গুরুত্ব বেশি ছিল। তারা এমন এক নেতৃত্ব চেয়েছিল যারা রাস্তার গর্ত মেরামত করবে, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এ প্রজন্ম আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিকে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

তৃতীয়ত, ব্যক্তিত্বের প্রভাব। বালেন্দ্র শাহর ইমেজ তরুণদের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন পেশাদার স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রিয় র‍্যাপার। প্রকৌশলীর যৌক্তিক চিন্তাধারা এবং শিল্পীর সংবেদনশীলতা—এ দুইয়ের সংমিশ্রণ তাকে তরুণদের চোখে একজন ‘আধুনিক আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার মধ্যে তারা এমন এক নেতার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছে, যিনি বিজ্ঞান বোঝেন এবং মাটির মানুষের ভাষাও জানেন। চতুর্থত, অভিবাসন সংকট। নেপালের অর্থনীতির একটি বড় অংশ রেমিট্যান্স-নির্ভর হলেও প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণের দেশান্তরী হওয়া সমাজ কাঠামোয় এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। বালেন্দ্র শাহর ‘নেপালের মেধা নেপালেই ব্যবহার’ করার প্রতিশ্রুতি দেয়ায় তরুণদের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেম জেগেছে। বিদেশের মাটিতে শ্রম দেয়ার চেয়ে নিজ দেশে সম্মানজনক জীবিকার যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা জেন-জি ভোটারদের জন্য এক শক্তিশালী নির্বাচনী ইশতাহার হিসেবে কাজ করেছে। ব্যালটে তিনি ‘ঘণ্টা’ প্রতীককে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ঘুমন্ত প্রশাসনকে জাগিয়ে তোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নেপালে নির্বাচনের ফলাফল ছিল এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প। বালেন্দ্র শাহ প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি ভেঙে নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ। এর সিংহভাগই ছিল তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেয়া নাগরিক। আরএসপি বড় বড় শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়লাভ করে, ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টি আসন পেয়ে বালেন্দ্র শাহর দল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এটি ১৯৫৯ সালের পর নেপালের নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো দলের জন্য শ্রেষ্ঠ ফলাফল। বিপরীতে নেপালের কংগ্রেস তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি সিপিএন-ইউএমএল প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি তার নিজের আসন ঝাপা-৫-এ বালেন্দ্র শাহর কাছে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। বিবিসি তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, "বালেন্দ্র শাহর বিজয় মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় পপুলিস্ট রাজনীতির এক নতুন ঘরানা, যা কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ নয় বরং সমস্যা সমাধানের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।" একজন প্রকৌশলী থেকে সরকারপ্রধান হওয়ার এ যাত্রা প্রমাণ করে যে নেপালের ভোটাররা এখন আর কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, বরং যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এবারের নির্বাচনের এ অভাবনীয় ফলাফল নেপালের প্রথাগত দলগুলোর জন্য ছিল এক বড় চপেটাঘাত। নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএলের মতো দলগুলো এ ফলাফলকে প্রাথমিকভাবে "আবেগতাড়িত" ও "পপুলিস্ট রাজনীতির জয়" বলে অভিহিত করেছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করা অসম্ভব এবং এ পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে ভেতরে ভেতরে তারা এক বিশাল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যা তাদের নিজস্ব দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছে। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

নেপালের রাজনীতিতে ‘ডিপস্টেট’ বলতে সাধারণত রাজতন্ত্র আমলের আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ এবং পর্দার আড়ালের সেই প্রভাবশালীদের বোঝানো হয়। এ গোষ্ঠীই দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। তবে এ নির্বাচনে তারা কেন সফল হতে পারল না, তার প্রধান কারণ হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কোনো গোপন সমঝোতা হওয়ার আগেই তা জনসমক্ষে চলে আসছিল। তাছাড়া ২০২৫ সালের ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে ডিপস্টেটের পক্ষে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া সম্ভব ছিল না। বালেন্দ্র শাহর মতো ‘আউটসাইডার’রা প্রথাগত রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থেকে লড়াই করায় ডিপস্টেটের পুরনো ফর্মুলাগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। হিমালয়ের রাজনীতিতে এবার পেশিবল ও গোপন ষড়যন্ত্রের চেয়ে ‘ব্যালট ও বাইট’ শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সবসময়ই নেপালের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক শক্তি হিসেবে উপস্থিত থাকে। ভারতের জন্য বালেন্দ্র শাহর উত্থান ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক বন্ধুদের পরিবর্তে একজন অপ্রথাগত ও জাতীয়তাবাদী নেতার আগমন দিল্লির কৌশলগত চিন্তায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বালেন্দ্র শাহর ‘নেপাল ফার্স্ট’" নীতি ভারতের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ ও সীমান্ত চুক্তিতে নতুন করে দরকষাকষির ইঙ্গিত দিচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, নেপালে নতুন নেতৃত্ব ভারতের জন্য এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ফলে পুরনো সমীকরণগুলো আর কাজ নাও করতে পারে।"তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় ভারত এখন নতুন এ নেতৃত্বের সঙ্গে এক ধরনের কাজের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।

নেপালের প্রথম গণতান্ত্রিক যাত্রা ছিল রাজতন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি, আর দ্বিতীয় যাত্রাটি হলো দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা থেকে মুক্তি। নতুন সরকারের সামনে প্রধান লক্ষ্য হলো ‘ই-গভর্নেন্স’ বা প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করা। তবে পথটি সহজ নয়। ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ মোকাবেলা করা হবে বালেন্দ্র শাহর প্রথম পরীক্ষা। নেপাল এখন একটি ‘ডেটা-চালিত’ প্রশাসনের দিকে এগোচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে। হিমালয়ের পাদদেশে সূচিত এ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ কেবল নেপালের সীমানায় আটকে নেই। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা—জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে কোনো রাজনৈতিক রাজবংশ বা পুরনো দলই চিরস্থায়ী নয়। বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্ব যদি সফল হয়, তবে তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি নতুন রাজনৈতিক পথরেখা হিসেবে কাজ করবে।

ড. মো. আবু সালেহ: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও