বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। নদীকে কেন্দ্র করে আমাদের সভ্যতার বিকাশ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলেও নদী সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে গেছে। নিত্য দূষণ, দখল আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের থাবায় নদী বারবার আক্রান্ত হয়েছে। এমনকি দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা কত সে পরিসংখ্যানও অবহেলার হাত থেকে রেহাই পায়নি। দেশে নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলছে বছরের পর বছর। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের গণনার সঙ্গে মেলে না নদী রক্ষা কমিশনের হিসাব, আবার এ দুই সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) সংখ্যার ছিল গরমিল। অবশেষে নদ-নদীর তালিকা তৈরিতে সব সংস্থার সমন্বয়ে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের উদ্যোগ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। দেশে ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বাপাউবোর ওয়েবসাইটে। সরকারের দুটি মন্ত্রণালয় ও তিনটি সংস্থা এবং নদীকর্মীদের সমন্বয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে নদ-নদীর সংখ্যা নির্ণয় করা হয়েছে। তবে এবারের কাজ ব্যতিক্রম বলছেন নদীকর্মীরা। কারণ এবার স্থানীয়দের মতামতকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তার পরেও তালিকাটি নিয়ে নদী গবেষক ও নদীকর্মীদের বেশ আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। তারা বলছেন, দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক নদ-নদী এবারের তালিকা থেকেও বাদ পড়েছে। যদিও উপদেষ্টা বলেছেন, সরকারের নথিপত্রে আছে এমন নদীগুলোই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত তালিকা নয়, কাজটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতে আরো নদ-নদীর সন্ধান পাওয়া গেলে তাও তালিকাভুক্ত করা হবে।
- দেশে নদ-নদী অবৈধ দখল ও দূষণ নতুন কিছু নয়। যুগের পর যুগ ধরে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী এ কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল-সংশ্লিষ্ট ও এলাকার প্রভাবশালীরা এ কাজে জড়িত। নদীর অবৈধ দখল-দূষণে শত শত নদ-নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। দেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের অসংখ্য শাখা নদী জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। এসব নদ-নদী বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। অবৈধ দখলের কারণে অনেক নদী বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। বসতি গড়ে ওঠায় সেখানে যে একসময় নদী ছিল, বোঝা যায় না। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষিপণ্য উৎপাদন-বিপণনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে উজান থেকে ভারতের পানি প্রত্যাহার, অন্যদিকে দেশের প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলের কারণে দেশের নদ-নদী একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে নদী দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। এতে যেমন দেশে পানি সংকট দেখা দিচ্ছে, তেমনি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশ সজীবতা হারাচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়েছে। অবৈধ দখল ও দূষণে বহু নদী নাব্য হারিয়ে নালায় পরিণত হয়েছে।
- নদী রক্ষায় সরকার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করলেও কমিশন নদ-নদী দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। ২০২৩ সালে দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলকারীদের তালিকা তৈরিতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ওই প্রকল্পের আওতায় ৩৭ হাজার ৩৯৬ নদী দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল। তালিকাটি কমিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানেই সেই তালিকা ওয়েবসাইট থেকে মুছে দেয়া হয়েছিল। নদ-নদী অবৈধ দখলকারীদের নতুন তালিকা প্রণয়ন করা সময়সাপেক্ষ। তাই নদী কমিশনের তালিকা অনুসারে অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীর অবৈধ দখল ও এর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করার ক্ষেত্রে যে আইন রয়েছে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অবৈধ দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন কোনো নজিরও নেই।
- অস্বীকার করার উপায় নেই, নদ-নদী অবৈধ দখলের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীরা জড়িয়ে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। নদ-নদী কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে তা দখল করে রাখবে। এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রাষ্ট্রীয় সম্পদ কেউ অবৈধভাবে দখল করে রাখবে এবং তার বিরুদ্ধে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠিত বা দ্বিধান্বিত হবে, তা হতে পারে না। সমন্বিতভাবে নদ-নদীর অবৈধ দখলকারী ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। নদীগুলো দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। অবৈধ দখলকারী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে এবং শাস্তির মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। নদ-নদী কিছু লোকের অবৈধ দখল-দূষণের কবলে পড়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে, প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।
- নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের পাশাপাশি এখন দরকার নদ-নদীগুলো দখল-দূষণমুক্ত করা। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নির্বিঘ্নে প্রবাহিত হবে সব নদী। নদ-নদীগুলো বাঁচানো প্রয়োজন। কেননা, প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি এসব নদ-নদীর ওপর দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে। নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা, দূষণমুক্ত রাখা এবং দখল রোধে জড়িত আছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। নদীর অবৈধ দখল ও পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে রয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। তবু রক্ষা পাচ্ছে না নদীর দখল ও দূষণ। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্রই ময়লা-আবর্জনা সব নদীতে ফেলা হচ্ছে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। উজান থেকে নেমে আসা পলি এসে জমছে নদীতে। ময়লা-আবর্জনার কারণে একদিকে যেমন জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীকে এখনই রক্ষা করতে না পারলে বাংলাদেশে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দেবে। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, শহরের কঠিন বর্জ্য এবং নৌযানের বর্জ্য—চারটি বড় উৎসকে নদীদূষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। নদীদূষণের উৎস যেমন একাধিক, তেমনি দূষণ রোধ ও তদারক করার কর্তৃপক্ষও একাধিক। রাজধানীসহ বিভিন্ন বড় শহরের পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে ওয়াসা, শিল্প-কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর, কঠিন বর্জ্য অপসারণ ও পরিশোধন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার আর নৌযানের বর্জ্য অপসারণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর। তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করলে নদ-নদীর এ অবস্থা হওয়ার কথা নয়।
- নদী দখল ও দূষণ রোধে প্রথমেই নজরদারি বাড়াতে হবে। যেসব কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে তা উৎস থেকে নজরদারির মাধ্যমে বন্ধ, দূষিত তরল নদীতে ফেলা রোধ করতে হবে। এর জন্য যে আইনগুলো আছে সেগুলোর প্রয়োগ জরুরি। নদীর প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য, নদীগুলোর রাসায়নিক ও জীববৈচিত্র্যগত মান বজায় রাখার জন্য বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের নদ-নদী, জলাভূমি দখল ও দূষণ প্রতিরোধে কঠোর আইন, নৌপথকে সচল রাখতে নদীগুলোকে খনন, নদী ও জলাভূমির দূষণ রোধে সব কারখানায় শিল্পবর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণে সরকারকে অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে অভিযোগ আছে, পরিশোধন যন্ত্র থাকলেও কোনো কোনো কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি তা নদী ও পাশের খাল এবং নর্দমায় ফেলে দেয়া হয়। এতে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ খাদ্যচক্রে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি হয়। কাজেই নদীদূষণ রোধেও নিতে হবে কার্যকর ব্যবস্থা। কেননা নদীর পানিতে দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে তা শুধু মাছ নয়, জলজ অন্যান্য প্রাণীর জন্যও হুমকিস্বরূপ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে শিল্প-কারখানার বর্জ্য। প্রথমে এ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ নদ-নদী উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াও জরুরি।