বাজেট প্রতিক্রিয়া

বাজেটে এসএমই খাতের জন্য আরো প্রণোদনা প্রয়োজন ছিল

ছোট ও ছিমছাম বাজেট দিয়ে অর্থ উপদেষ্টা যতটা সফল হয়েছেন, এসএমই উদ্যোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে ততটা নন। আবার যা বলা হয়েছে, তার ভাষা এতটাই কঠিন যে এটা বুঝে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা হয়তো খুব বেশি উপকৃত হতে পারবেন না।

ছোট ও ছিমছাম বাজেট দিয়ে অর্থ উপদেষ্টা যতটা সফল হয়েছেন, এসএমই উদ্যোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে ততটা নন। আবার যা বলা হয়েছে, তার ভাষা এতটাই কঠিন যে এটা বুঝে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা হয়তো খুব বেশি উপকৃত হতে পারবেন না। এছাড়া নতুন কিছু কর আরোপের মাধ্যমে এ ক্ষুদ্র উদ্যোগ স্তিমিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ দীর্ঘদিন থেকে বাড়ছে না। এসব নীতি বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরো দুর্বল করতে পারে। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাজেটে একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ ফান্ড স্থাপনের কথা বলা হয়েছে, বেশকিছু প্রকল্প বাদ দেয়া হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় বিবেচ্য প্রকল্প মূল্যায়নে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, যা এর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই করার পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু এসএমই যেহেতু আমাদের মূল জীবনীশক্তি তাই এর প্রতি আলাদা যত্ন দরকার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপিতে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রায় ১২ শতাংশ অবদান রেখেছে এবং এক্ষেত্রে আগামী তিন বছরে ১৫ হাজার নতুন উদ্যোগ তৈরির কথা বাজেটে বলা হয়েছে। এসএমই এবং মহিলা উদ্যোগের জন্য ঋণ বিতরণ সুবিধা বাড়ানো এবং তাদের জন্য ডাটাবেজ, ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরির কথাও বলা হয়েছে। কর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়ের কথা বললেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি।

বাজেটে প্লাস্টিকের তৈরি সব ধরনের পণ্যের ওপর উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কটন সুতা উৎপাদন পর্যায়ে করহার প্রতি কেজি ৩ টাকার পরিবর্তে ৫ টাকা এবং কৃত্রিম আঁশ বা ম্যান মেইড ফাইবার এবং অন্যান্য আঁশের মিশ্রণে তৈরি সুতার ক্ষেত্রেও উৎপাদন পর্যায়ে করহার ৩ টাকার পরিবর্তে ৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ব্লেড উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে।

এটা সত্য যে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট না বাড়ালে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তিতে ভাটা পড়বে। সর্বজনীন ভ্যাটের উচ্চহার এবং যে ট্যাক্স অন ট্যাক্স রয়েছে, কর ক্রেডিট নেয়ার যে সুবিধা ভ্যাটের ক্ষেত্রে সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য সেটা বাংলাদেশে এখনো তেমনভাবে কার্যকর নয়। বিভিন্ন ভ্যাটহার রয়েছে এবং ১৫ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ করহার কমপ্লাই করলেই কেবল ভ্যাট ক্রেডিট নেয়া যায়। কাজেই অন্যান্য হারে প্রযোজ্য ভ্যাট রেয়াত নেয়ার সুযোগ নেই।

প্লাস্টিক খাতের ওপর বাড়তি করের বোঝা বহন করতে হবে ভোক্তাকে, এ পণ্যের বেশির ভাগ বিক্রয় হয়ে থাকে গ্রামগঞ্জে এবং সেটা হয় ইনফরমালি যেখানে ভ্যাট ক্রেডিট নেয়ার তেমন সুযোগ নেই। এছাড়া প্লাস্টিক খাতের যেসব পণ্যের কথা বলা হয়েছে তা মূলত দরিদ্র ক্রেতাদের ব্যবহৃত পণ্য, এগুলোর মূল্যবৃদ্ধিতে বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার যে প্রত্যয়ের কথা বলা হয়েছে তার অনেকটাই হয়তো সফল হবে না।

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আগাম করের হার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক আমদানিকারকের ক্ষেত্রে আগাম কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এসএমই উদ্যোক্তা মূলত বাণিজ্যিক আমদানিকারকের কাছ থেকে কাঁচামাল ক্রয় করে এবং ক্রেডিট নিতে পারে না। এক্ষেত্রে তাদের জন্য পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।

বাজেটের ধারা ১২২ এ মূল্য সংযোজন আইন, ২০১২-এর ক্ষেত্রে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে যে বাণিজ্যিক আমদানিকারকের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি না হলে ব্যবসায়ী পর্যায়ে ফাইন্যাল সেটেলমেন্ট করে ভ্যাট আরোপের বিধান না করা। সাধারণত বাণিজ্যিক পর্যায়ে ২০ শতাংশের বেশি মূল্য সংযোজন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর একটি বিষয় হলো, ১৫ শতাংশের কম হারে ভ্যাট ক্রেডিট নেয়ার সুযোগও নেই। কাজেই এক্ষেত্রে ভ্যাট ক্রেডিট নেয়ার বিষয়টি আর থাকছেই না, সেখানে আইনের ভাষা এতটা জটিল করে ক্ষুদ্র উদোক্তাকে ভারাক্রান্ত করা হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল বাজেটে ৬২টি মন্ত্রণালয়ের বা বিভাগের জন্য ৭ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন টাকার বরাদ্দ ছিল। এর মধ্য ১০টি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বা খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মধ্য সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের। উল্লেখ্য, বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছর (৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ) থেকে কৃষির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে এটি দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা খুবই আশঙ্কাজনক। এ ব্যাপারে বাজেটে অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি করে এ অবস্থা সামলানো গেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেয়া দরকার। খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির ভূমিকা অনেক বড়। এছাড়া ব্যাপক সংখ্যক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এ খাতে বিশেষভাবে জড়িত। বাজেটে কৃষিপণ্য প্রস্তুতকারী উদ্যোক্তাদের ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। তাদের একটি অংশ আমাদের প্রতিবেশী দেশের রফতানির সঙ্গে জড়িত ছিল। এখানে নন-ট্যরিফ বাধা কাটিয়ে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কীভাবে তাদের উদ্যোগ পরিচালনা করবেন সে ব্যাপারে বাজেটে কোনো নির্দেশনা নেই।

কিছু ক্ষুদ্র এসএমই উদ্যোক্তা অনলাইনে তাদের বিক্রয় কার্যক্রম চালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অনলাইনে পণ্য বিক্রয় কমিশনের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে একেবারে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা একেবারেই মুখ থুবড়ে পড়বেন।

এছাড়া গত ৯ জানুয়ারি একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভ্যাট রেয়াত সীমা ৫০ লাখ থেকে হ্রাস করে ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি টার্ন ওভার ট্যাক্স অর্থাৎ যারা ভ্যাট ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশ দিতেন তাদের জন্য এর পরিমাণ আগের ৩ কোটি টাকা থেকে হ্রাস করে ৫০ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনই ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য নিরাশার কারণ।

তবে বাজেটে বন্ড ব্যবস্থাকে সহজীকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব করার জন্য কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ করার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেক সংকট সমাধান হতে পারে।

এছাড়া বাজেটে স্টার্টআপের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি তহবিলের কথা বলা হয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন হলে অনেক নতুন স্টার্টআপ উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি রিফাইন্যান্সিং স্টার্টআপ ফান্ড তৈরি আছে, যেখানে তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফার মাত্র ১ শতাংশ পরবর্তী পাঁচ বছর কন্ট্রিবিউট করবে বলে বলা হয়েছিল, সেটির বাস্তবায়ন তেমন হয়নি। ২০২০ সালে স্থাপিত এ ফান্ডের মাত্র ৩৫ কোটি টাকা ব্যবহার হয়েছে। এটি কেন ব্যবহার হচ্ছে না তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। তা না হলে নতুন ফান্ডের ঘোষণা দিয়ে কোনো লাভ নেই।

এছাড়া বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড কোম্পানি তাদের মুনাফা রিপাট্রিয়েট করতেও অনেক সমস্যার সন্মুখীন হন, এ কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ রেজিস্টার্ড কোম্পানি যারা বিদেশী ফান্ড এখানে নিয়ে আসতে চান তারা বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড না হয়ে বরং সিঙ্গাপুরকে বেশি পছন্দ করে।

সরকার মিনিমাম করের আওতা বাড়িয়েছেন, নতুন ৪০টি ধারা (খসড়া ফাইন্যান্স অ্যাক্ট ২০২৫ ধারা ১৬৩) এতে যুক্ত হয়েছে। এটি এমন একটি কর যা মুনাফা বা ক্ষতি নির্বিশেষে প্রদেয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমদানীকৃত পণ্যের জন্য আরোপিত এ কর অ্যাডজাস্ট করা যাবে বলে বলা হয়েছে।

বিভিন্ন হারে প্রদেয় এসব কর, বিশেষ করে বেভারেজ পণ্যের ওপর প্রযোজ্য কর ৩ শতাংশ হারে নির্ধারিত আছে। অন্যদিকে সিগারেট, বিড়ি এগুলোর ক্ষেত্রে এ হার গ্রস প্রাপ্তির ১ শতাংশ। বেভারেজ পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্কও প্রযোজ্য আছে। স্বাস্থ্যগত কারণে এ খাতে করের হার বেশি। এ খাতে এসএমই নয়, কিন্তু প্রকৃত মোট করের হার অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এবারের বাজেটে সব ধরনের আইসক্রিমের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশের স্থলে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন বিস্কুট ও পাউরুটির ওপর ভ্যাট বাড়বে না। অর্থাৎ সরকার একদিকে মিষ্টিজাতীয় খাদ্য তরুণদের জন্য নিরুৎসাহিত করতে চায় বিধায় বেভারেজ পণ্যের ওপর মিনিমাম কর এবং সম্পূরক কর বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের খাদ্য বিস্কুট-পাউরুটির ওপর করহার বাড়াতে চায় না। কারণ এটা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাবার। আবার আইসক্রিমের ওপর করহার হ্রাস করেছে। এ ধরনের নীতির ক্ষেত্রে কিছুটা সামঞ্জস্য দরকার।

ক্ষুদ্র উদ্যোগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডার মূল বিষয়। এ দুটো দিকেই বাজেটের নজর ও দৃষ্টিভঙ্গি আরো সুদৃঢ় করা দরকার। এসএমই কর্মসংস্থানের একটি বড় জায়গা, এখানে কর ব্যবস্থা এমনভাবে নমনীয় করা দরকার যাতে দেশে অনেক নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হতে পারে।

ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড-একটি পাবলিক প্রাইভেট ডায়ালগ প্লাটফর্ম

আরও