আলোকপাত

দারিদ্র্য নিরসনী অর্থ ব্যয় ও বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের কার্যকারণ সম্পর্ক

বিশ্বের যে দেশেই দারিদ্র্য ব্যাপ্ত, সেখানেই দাবি ওঠে যে দারিদ্র্য বিমোচন ব্যয় বাড়াতে হবে। নানা সময়ে বহু দেশেই দারিদ্র্য অভিমুখীন অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের আপাতনের ওপর তেমন একটা প্রভাব পড়েনি।

বিশ্বের যে দেশেই দারিদ্র্য ব্যাপ্ত, সেখানেই দাবি ওঠে যে দারিদ্র্য বিমোচন ব্যয় বাড়াতে হবে। নানা সময়ে বহু দেশেই দারিদ্র্য অভিমুখীন অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের আপাতনের ওপর তেমন একটা প্রভাব পড়েনি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য অর্থ ব্যয় একটি আবশ্যিক শর্ত, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। অর্থাৎ অর্থ ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমাজে দারিদ্র্যের আপাতন কমাতে হলে আরো কিছু বিষয় বুঝতে হবে এবং বেশকিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। যেমন এ ব্যাপারে একটি পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার যে দারিদ্র্যের জন্য বরাদ্দ অর্থ কোন কোন খাতে ব্যবহার করলে সবচেয়ে সুফল পাওয়া যাবে। তেমনিভাবে বুঝতে হবে, দরিদ্রবান্ধব প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাসের একটি অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য নিরসনে অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা বুঝতে হলে দুটো বিষয়ের ধারণা অত্যন্ত জরুরি। এক. এ দেশের দারিদ্র্যের গতিময়তা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান এবং দুই. এ দেশে দারিদ্র্য নিরসনী অর্থ ব্যয়ের প্রকৃতি। এজন্য দেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য পরিসংখ্যানের সঙ্গে সুপরিচিতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি দরকার দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশে ব্যয়িত অর্থের ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি ধারণা।

বাংলাদেশের দারিদ্র্যের নানা মাত্রিকতা আছে। একদিকে এ দারিদ্র্য কাঠামোগত, অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যেই এর কারণ নিহিত, অন্যদিকে এ দারিদ্র্য ক্ষণকালীন মৌসুমিও হতে পারে। সুতরাং মানুষ স্থায়ীভাবে একটি দারিদ্র্যফাঁদে স্থিত থাকতে পারে অথবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌসুমের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তারা দারিদ্র্যফাঁদের ভেতরে বা বাইরে থাকতে পারে। এখানে বঞ্চনার কারণও নানা ধরনের হতে পারে—অর্থনৈতিক মন্দা, কভিড-১৯-এর মতো অতিমারী, পরিবেশ বিনষ্টীকরণের মাধ্যমে পরিবেশ উদ্ভূত দারিদ্র্যের সৃষ্টি। অন্যদিকে দারিদ্র্য অনপেক্ষ বা আপেক্ষিক হতে পারে। আপেক্ষিক দারিদ্র্যের অন্য নাম হচ্ছে অসমতা। এটাও মনে রাখা জরুরি যে বঞ্চনা শুধু আয়ের ক্ষেত্রেই ঘটে না, বঞ্চনা আয়বহির্ভূত বিষয়গুলোতেও হতে পারে। তেমনিভাবে বঞ্চনা যেমন ফলাফলের ক্ষেত্রে (ধরা যাক, শিক্ষাগত অর্জনের ক্ষেত্রে) হতে পারে, তেমনি বঞ্চনা থাকতে পারে সুযোগের ক্ষেত্রেও (যেমন স্বাস্থ্য সুবিধার লভ্যতার ক্ষেত্রে)।

দারিদ্র্য নিরসনী ব্যয়ের দুটো দিক আছে—দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব ফেলবে এমন ব্যয় আর দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ব্যয়। প্রথম প্রকারের ব্যয় নানা পন্থার মাধ্যমে দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব ফেলে, সরাসরিভাবে দারিদ্র্যকে প্রভাবিত করে না। যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জলের লভ্যতার মতো সামাজিক সেবার ক্ষেত্রে ব্যয় দারিদ্র্যকে হ্রাস করে। যে সমাজে দারিদ্র্য বিস্তৃত, সেখানে সামষ্টিক ও খাতস্তরে দারিদ্র্য দূরীকরণ কৌশল অপরিহার্য। সত্যিকার অর্থে, এমন অবস্থায় সামষ্টিক নীতিমালাকে দারিদ্র্য অভিমুখী হতে হবে, যাতে দারিদ্র্যমুখী ব্যয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মনিয়োজন, সামাজিক সেবার প্রসারের মাধ্যমে দারিদ্র্যের আপাতন কমাতে পারে। এত কিছু করার পরও বিপুলসংখ্যক লোক সামষ্টিক নীতিমালার প্রভাববলয়ের বাইরে থাকবে। সেই সব জনগোষ্ঠীর জন্য প্রত্যক্ষ লক্ষ্যভিত্তিক দারিদ্র্য দূরীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমন চরম দরিদ্র মানুষ, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, পরিবেশ-নাজুক ভূমিতে যারা বাস করে, তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী বড় দরকার।

বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আয়-দারিদ্র্যের আপাতন কমেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আয়-দারিদ্র্যের আপাতন দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়ে ৫৮ থেকে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং এ দেশের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এ অর্জন তাৎপর্যপূর্ণ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আপেক্ষিক দারিদ্র্য বা অসমতা সম্পর্কে একই কথা বলা যাবে না। আয়ের গিনি সহগ (অসমতার একটি অর্থনৈতিক পরিমাপ) ২০২২ সালে ছিল দশমিক ৫০। জিনি সহগের মান শূন্য মানে সম্পূর্ণ সমতা আর এর মান ১ মানে চরম অসমতা। সুতরাং গিনি সহগের দশমিক ৫০ মান উচ্চতর অসমতাই বোঝায়। আসলে বাংলাদেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য শুধু উচ্চতরই নয়, এ বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশে অসমতা ও বৈষম্য শুধু আয়ের ক্ষেত্রেই বিদ্যমান নয়, আয়বহির্ভূত বিষয়গুলোতেও বৈষম্য লক্ষ্যণীয়। যেমন শিশু অপুষ্টির ক্ষেত্রে দেশের জনসংখ্যার দরিদ্রতম ২০ শতাংশের মধ্য শিশু অপুষ্টির হার যেখানে ৩৮ শতাংশ, সবচেয়ে বিত্তবান ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার।

বিগত দিনগুলোয় সরকারি ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি দারিদ্র্য নিরসন অভিমুখী ছিল। মোটামুটিভাবে অতীতে সরকারি ব্যয়ের ৫৫ শতাংশ দারিদ্র্য নিরসনে বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য নিরসনের জন্য প্রত্যক্ষ ব্যয়ের প্রবণতা বিগত বছরগুলোয় ছিল নিম্নমুখী। ২০২০-২২ সালে দারিদ্র্য নিরসনের জন্য বরাদ্দ অর্থসম্পদের চার-পঞ্চমাংশ যেখানে দারিদ্র্য নিরসনী প্রত্যক্ষ বরাদ্দ ছিল, চার বছর পরই তা দুই-তৃতীয়াংশে এসে দাঁড়ায়।

এসব পরিসংখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, যদিও দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ব্যয়িত অর্থ ও দারিদ্র্য হ্রাসের মধ্যে একটি সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করা দুরূহ, কিন্তু এ দুইয়ের মাঝের একটি অনুষঙ্গকে অস্বীকার করা যায় না। সত্যিকার অর্থে, হ্রাসকৃত দারিদ্র্যের একটি বড় অংশই দারিদ্র্য নিরসনী বিপুল অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, বরাদ্দকৃত এ বিপুল অর্থসম্পদের ব্যবহার আরো কত উৎপাদনশীল ও কার্যকরী করা যেত। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য নিরসনের জন্য প্রত্যক্ষ ব্যয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা দরিদ্রতম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরো নাজুক অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ব্যাপারে কী করা যেতে পারে?

দারিদ্র্য নিরসনী সরকারি ব্যয়কে আরো কার্যকর করতে হলে এ ক্ষেত্রের সামষ্টিক ও খাতওয়ারি কর্মসূচি এবং প্রকল্পগুলোকে আরো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রণয়ন করতে হবে। প্রাসঙ্গিক সময় নিয়ে যদি একটি বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে সে নীলনকশা নানা সম্পদক্ষয় রোধ করবে। দারিদ্র্য নিরসনী কর্মসূচি এবং প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা বহুগুণে বাড়বে, যদি সেগুলো বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে সুগভীরভাবে সম্পৃক্ত হয় এবং যদি সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং খাতওয়ারি নীতিমালা দারিদ্র্য সংবেদনশীল হয়। দারিদ্র্য দূরীকরণ ব্যবস্থাগুলোকে যদি কর্মনিয়োজন, সামাজিক সেবাগুলো এবং দরিদ্রবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা যায়, তাহলে দারিদ্র্য নিরসনী সরকারি অর্থ ব্যয় আরো কার্যকর হবে।

চরম দরিদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর বঞ্চনা নিরসনের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের হ্রাস নয়, বরং আরো প্রত্যক্ষ সরকারি অর্থ ব্যয় অপরিহার্য। এসব জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকে আরো জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হবে নানা সৃজনশীল পন্থার। বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দেশজ ও বহির্বিশ্বের নানা অনিশ্চয়তার কারণে এসব কার্যক্রমের উপযোগিতা আরো বেড়েছে।

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

আরও