অভিমত

পাট শিল্পের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে করণীয়

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক (এমব্লেম) নির্ধারিত হয় বহতা পানির ওপর শ্বেতশাপলা, দুই পাশে ধানের ছড়া, চারটা তারা এবং পাটের তিনটা পাতা।

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক (এমব্লেম) নির্ধারিত হয় বহতা পানির ওপর শ্বেতশাপলা, দুই পাশে ধানের ছড়া, চারটা তারা এবং পাটের তিনটা পাতা। পৃথিবীর সব দেশেই তার জাতীয় প্রতীক বা ন্যাশনাল এমব্লেম বা জাতীয় প্রতীক আদতে সংক্ষেপে সে দেশের পরিচয় তুলে ধরে, বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিরাও আদতে ঠিক সেই কাজটি করেছিলেন। নদীমাতৃক দেশ বলে জাতীয় প্রতীকে বহতা পানি আছে। শ্বেতশাপলা, যা এ দেশের জলাশয়ে সুলভ, তা মানুষের শান্তিপ্রিয়তার প্রতীক। ভাত এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য তাই দুই পাশে ধানের শীষ। সমাজতন্ত্রের প্রতিভূ চার তারকা আর শীর্ষে সবার ওপরে প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের পাতা। স্বাধীন দেশের জনপ্রতিনিধিরা যে বাস্তবতা বুঝেছিলেন সেই বাস্তবতা পরিবর্তিত, পরিবর্তিত হয়ে আজ প্রায় হারানো অতীত। বহতা নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়, আর পাট বিশ্ববাজারের স্বল্পমূল্য কাঁচামাল মাত্র।

প্রেক্ষাপট: স্বাধীন বাংলাদেশে ব্রাত্য হয়ে পড়েন পশ্চিম পাকিস্তানি উদ্যোক্তারা। নিরাপত্তাহীনতায় অনেকেই ফিরে যান পাকিস্তানে, সম্পত্তিগুলো হয়ে পড়ে ‘শত্রু সম্পত্তি’, এমনকি তাদের কল-কারখানাগুলোও। যা পরে জাতীয়করণ করা হয়। যে বিশাল পাট শিল্প ‘পাকিস্তানি’ উদ্যোক্তারা গড়ে তুলেছিলেন তা পিতৃহীন ‘এতিম’ শিশুতে পরিণত হয়। অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের ‘নিয়ন্ত্রণের কাঙ্ক্ষা’ থাকলেও পরিচালনের যোগ্যতা কখনই ছিল না! মনোপলি বাজার ব্যতীত আমলাতন্ত্রের পরিচালনায় কোনো ব্যবসাই লাভের মুখ দেখেনি এ দেশে, আজ অব্দি। অত্যন্ত লাভজনক পাট শিল্পের পতনের শুরু সেই মুজিব আমল থেকেই, বড় জাহাজের যেমন ডুবতে সময় লাগে, পাট শিল্পের ক্ষেত্রে হয়েছেও তেমনটাই। বাংলাদেশ টের পেয়েছে অনেক পরে।

(ক) ১৯৮০-এর দশকে যেখানে গড়ে বছরে ৩০ লাখ টন পাট উৎপাদন হতো তা ২০২৪-এ এসে দাঁড়ায় ১৮ লাখ টনে, এক্ষেত্রে ফ্ল্যাশ ফ্লাডেরও অবশ্য অবদান রয়েছে। যদিও পৃথিবীর মোট পাট উৎপাদনের সিংহভাগই উৎপাদন হয় বাংলাদেশে, সর্বোপরি বাংলাদেশের পাটের আঁশের শক্তি, পাটের রঙ পৃথিবীর অন্যান্য যে কোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে বলেই বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট রফতানি হয় বিভিন্ন দেশে। আজও বার্ষিক গড় উৎপাদন ২০ লাখ টন পাটের প্রায় ১০ লাখ টনই আমরা কাঁচামাল হিসেবে রফতানি করি বিভিন্ন দেশে।

(খ) মানে, গড়ে ৬৯০ ডলার টনপ্রতি রফতানি মূল্যে কাঁচা পাট রফতানি হয় মূলত সড়কপথে, এ কাঁচা পাটই পাটজাত পণ্য হয়ে গড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার প্রতি টনে বিক্রি হয় বিশ্ববাজারে! আফ্রিকার মতো বাংলাদেশও কাঁচামাল উৎপাদনকারী নতুন কলোনি হয়ে গেছে। শোষকদের শুধু বদলেছে চামড়ার রঙ, মুখের ভাষা আর হরফ দেবনাগরী।

(গ) বাংলাদেশের কি সক্ষমতা নেই এ রফতানি করা পাট প্রক্রিয়াজাত করার?

আদমজী-উত্তর বাংলাদেশের পাট কারখানাগুলো বর্তমানে বছরে ১২ লাখ টন কাঁচা পাট প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রাখে, কিন্তু কাঁচামাল রফতানির ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত পরিচিতির ফলে বিপণন সমস্যা প্রকট। যে কারণে মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৬৩ শতাংশ ব্যবহার হয়। স্বাধীনতা-উত্তর সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারের যে শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা পূরণ করে মূলত ভারত। ফলে আন্তর্জাতিক পাটপণ্যের বাজার মূলত ভারতমুখী এবং ভারতীয় কিংবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত।

উপরন্তু অধিকাংশ পাটজাত পণ্য আমদানিকারক রাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষিপণ্যের মূল্য হ্রাসের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে বসে আছে ভারত। যেখানে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। ফলে ভারত পাটজাত পণ্য ‘কৃষিপণ্য’ হিসেবে রফতানি করে কর সুবিধা পায়, যা বাংলাদেশ পায় না। ক্রেতারা সহজেই আকর্ষিত হয় কম শুল্কে ভারত থেকে পাটজাত পণ্য ক্রয়ে। তার ওপর নিজ শ্রমবাজার স্থিতিশীল রাখতে ভারত বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্য আমদানিতে টনপ্রতি ন্যূনতম ১৩৯ ডলার, সর্বোচ্চ ৩৯৮ ডলার অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে বসে আছে বাংলাদেশের ওপর। ফলে কাঁচা পাট ছাড়া কোনোভাবেই পাটজাত কোনো পণ্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। রেসিপ্রোকাল করের এ যুগে বাংলাদেশ করেনি কিছুই!

এ দুষ্টচক্র থেকে বেরোনোর উপায় কী: সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া, সরকারিভাবে। অর্থাৎ পাট, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, যুব ও ক্রীড়া, অর্থ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। যেহেতু কাঁচা পাট রফতানি আমরা নিষিদ্ধ করতে পারব না কোনোভাবেই। পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবনে যা করা যায়:

প্রথমত, আমরা বরং কাঁচা পাট রফতানিতে টনপ্রতি ২৫০ ডলার ট্যাক্স বসাতে পারি এবং সড়কপথে সব কাঁচা পাট রফতানি বন্ধের মাধ্যমে নৌবন্দরের মাধ্যমে পাট রফতানি বাধ্যতামূলক করে ফেলতে পারি। এ পদক্ষেপে প্রয়োজন অর্থ, বাণিজ্য, পাট, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ।

দ্বিতীয়ত, শস্য বিশেষত: কফি, কোকো, কাজু, আখরোট, পেস্তা উৎপাদনকারী সব দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো পাটজাত পণ্যের বিশেষ রোড শো আয়োজন করা উচিত। যেখানে পণ্য উৎপাদক মিলগুলোর নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং ই-মেইল এবং উৎপাদিত পণ্যের তালিকা গ্রন্থিকাকারে সব অংশগ্রহণকারী আমদানিকারককে দেয়া উচিত। এ আয়োজনের খরচ জোগাবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, কৃষি এবং পাট মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে। এ দূতাবাসগুলো সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে ‘দ্বিপক্ষীয় কৃষিজাত পণ্য কর মওকুফ বা হ্রাস’ চুক্তি সম্পাদনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করতে পারে, যার ফলে কম শুল্কে বাংলাদেশী পাটজাত পণ্যে ক্রয়ে উৎসাহী হবে সে দেশের আমদানিকারকরা।

তৃতীয়ত, পাটের ওপর ধার্যকৃত টনপ্রতি ২৫০ ডলার ট্যাক্স যা সরকারের তহবিলে জমা হয়েছে তার অর্ধেক (১২৫ ডলার) ‘উৎপাদন প্রণোদনা’ হিসেবে প্রতি অর্থবছর শেষে জুলাইয়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রফতানি অনুযায়ী বণ্টন করা এবং বাকি ১২৫ থেকে ৫০ ডলার দিয়ে পাটচাষীদের মধ্যে স্বল্প মূল্যে বীজবণ্টনের ব্যবস্থা করা হলে পাট উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে (৩০ লাখ টন না হলেও অন্তত ২২ লাখ টন হবে, লক্ষ্যমাত্রা থাকবে ২৫ লাখ টন), যা নজরদারি করবে উপজেলা কৃষি অফিসার।

পাট উৎপাদন বৃদ্ধি সাপেক্ষে সেরা তিনজন কৃষি কর্মকর্তাকে ‘বর্ষসেরা’ পুরস্কার দেয়া যেতে পারে, যার উল্লেখ তার এসিআরে থাকবে।

চতুর্থত, পাট রফতানি ২৫০ ডলারের মধ্যে এখনো বাকি আছে টনপ্রতি ৭৫ ডলার, যা খরচ করা হবে কর্মী প্রশিক্ষণে। গোটা বাংলাদেশের সব জেলার যুব উন্নয়ন একাডেমি রয়েছে, বিশাল জায়গা নিয়ে।

চীনের যান্ত্রিক সহযোগিতা নিয়ে এই প্রতিটি সেন্টারকে পাটজাত পণ্য উৎপাদনের প্রশিক্ষণশালায় পরিণত করে স্বল্প শিক্ষিত, পিছিয়ে থাকা মানুষকে তিন মাসে প্রশিক্ষিত করে পাট শিল্পে নিয়োগ করা সম্ভব, পাটকলগুলোয় যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষিত তরুণদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

কী লাভ হবে বাংলাদেশের: পাট শিল্পে (সুতা ও ব্যাগ) প্রতি টন পাট প্রক্রিয়াজাত করতে গড়ে ২৩ জন শ্রমিকের দরকার হয়।

যদি বাংলাদেশে পাট উৎপাদিত হয় বছরে ২০ লাখ টন, উৎপাদিত সেই পাট প্রক্রিয়াজাত করতে গেলে শুধু শ্রমিকই লাগবে ৪৬ লাখ জন! উল্লেখ্য, এ শিল্পের ৬০ শতাংশ শ্রমিক নারী বিধায়, নারীর ক্ষমতায়নেও তা সহায়ক হবে। তদারককারী এবং কর্মকর্তাসহ কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষের। উপরন্তু গড়ে টনপ্রতি ১ হাজার ২০০ ডলার করে মূল্য ধরলে বাংলাদেশের উপার্জন হবে বছরে ২৪০ কোটি ডলার।

উপার্জিত এ বৈদেশিক মুদ্রার পুরোটাই বাংলাদেশের, ব্যাক টু ব্যাক এলসির মূল্য মেটানোর দায় নেই অন্যান্য শিল্পের মতো।

যেই মুহূর্তে কাঁচা পাট রফতানিতে ২৫০ ডলার শুল্ক বসানো হবে এবং সমুদ্রবন্দর দিয়েই শুধু কাঁচা পাট রফতানি করা বাধ্যতামূলক করা হবে, সেই মুহূর্ত থেকেই বিশ্ববাজারে পাটজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে অবশ্যম্ভাবীভাবেই। কেননা বিশ্ববাজারে কাঁচা পাট মূলত রফতানি করে বাংলাদেশই। এর ফলে বিশ্বের পাটপণ্য বাজারের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ফিরে পাবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে কোকো-কফি-কাজু-আখরোট-পেস্তা উৎপাদনকারী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যদি বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় কৃষিজাত পণ্য রফতানি শুল্কহ্রাসের চুক্তিটা করতে সক্ষম হয়, বিশ্ববাজার খুলে যাবে পাটপণ্য উৎপাদকদের জন্য। সেই সঙ্গে উৎপাদন প্রণোদনা, পাট কৃষক প্রণোদনা, সেরা কৃষি কর্মকর্তা প্রতিযোগিতা পাট চাষ বৃদ্ধি এবং পাটপণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। বাজার তো তৈরিই আছে! বর্তমানের কর্মী সংকট মোকাবেলায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর তৈরি রেখেছে প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী।

অন্যদিকে সৌদি আরবও ১০ বছর ধরেই এ পাটপণ্য উৎপাদন খাতে বিপুল বিনিয়োগ করতে তৈরি, যা বিগত সরকার স্থগিত রেখেছে তৈল শোধনাগারের সঙ্গে। এগুলো এক করলে বিশ্বের পাটপণ্যের বাজার সম্পূর্ণভাবেই বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

আর কে না জানে, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী দেশ সর্বোচ্চ সুবিধা এবং মূল্য বরাবরই আদায় করে নেয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি খাত হিসেবে বাংলাদেশ কি পারবে পাটকে প্রাধিকার দিতে, নাকি বহতা নদীর মতো আমাদের একদার মসলিনের মতোই পাটকলগুলোও কোনো এক অতীতের কাব্য হবে, সিদ্ধান্ত সরকারের।

অজেয় রোহিতাশ্ব আল কাযী: চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার, জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেড

আরও