ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় চিকিৎসা, প্রাণিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের মতো অত্যাবশ্যকীয় খাতের কাঁচামাল এবং পণ্য আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট খাতের শিল্পসংগঠনগুলোর তথ্যে দেখা গেছে যে কাঁচামাল আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারা এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশীয় উৎপাদন খরচ প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। শুধু প্রাণিসম্পদ খাতেই যেখানে বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজার রয়েছে, সেখানে ভ্যাকসিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ১২ শতাংশ পূরণ করতে পারছে; বাকি বিশাল অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
এ পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে—টেকসই উন্নয়ন ও প্রকৃত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প নিজস্ব সমাধান উদ্ভাবনে মনোযোগ দিতে হবে। আর এ লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে অণুজীব বিজ্ঞান (মাইক্রোবায়োলজি) এবং তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অণুজীব প্রযুক্তি (মাইক্রোবিয়াল টেকনোলজি)।
আমদানিনির্ভরতার বর্তমান চিত্র ও সম্ভাবনার দ্বার: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প হলেও ওষুধ ও কৃষি প্রযুক্তি খাতে আমাদের সম্ভাবনা অপরিসীম। বর্তমানে পোলট্রি ও ডেইরি খাতের চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ পশু ওষুধ, ভ্যাকসিন, প্রোবায়োটিকস ও এনজাইম আমদানি করতে হয়। অথচ এ খরচের একটা বড় অংশ সাশ্রয়ের সুযোগ আমাদের হাতের নাগালেই আছে।
উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রোবায়োটিকের বাজারে দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। স্থানীয় অণুজীব ব্যবহার করে গবাদিপশু, পোলট্রি ও মাছের জন্য সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্রোবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এ সাফল্য প্রমাণ করে যে সঠিক গবেষণা ও উদ্যোগ থাকলে আমরা বিদেশী পণ্যের বিকল্প দেশে তৈরি করতে শতভাগ সক্ষম।
শুধু প্রোবায়োটিক নয়, ভ্যাকসিন উৎপাদনেও বিপ্লব ঘটানোর সুযোগ আছে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, কারণ আমদানি করা ভ্যাকসিন অনেক সময় দেশীয় জীবাণুর স্থানীয় ধরন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। দেশীয় অণুজীবের ভিত্তিতে তৈরি ভ্যাকসিন (হোমগ্রোন ভ্যাকসিন) তুলনামূলক অধিক কার্যকর এবং এটি আমাদের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিকে টেকসই সুরক্ষা দিতে পারে।
অণুজীব প্রযুক্তি: শুধু ওষুধ নয়, অভাবনীয় সম্ভাবনার নাম
মাইক্রোবায়োলজি শুধু রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞান নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য সমস্যার সমাধান দিতে পারে। দেশের তরুণ গবেষকরা এরই মধ্যে দেখিয়েছেন কীভাবে অণুজীব ব্যবহার করে আমরা ভারী ধাতুদূষিত মাটি পুনরুদ্ধার (বায়োরিমেডিয়েশন) করতে পারি, যা কৃষির জন্য অত্যন্ত জরুরি। মাছের জিনোম ম্যাপিং, পরিবেশের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমানো এবং টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহারের জন্য অণুজীব থেকে প্রোটিন তৈরি নিয়েও ফলপ্রসূ কাজ হচ্ছে।
গবেষণাগারগুলোতে শৈবাল থেকে পুষ্টিকর পশুখাদ্য, উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন স্পাইরুলিনা এবং জৈব সার তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে। এছাড়া শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের এগ্রোভেট বিভাগে দেশীয় ওষুধ তৈরি করলেও এখনো অনেক এনজাইম ও সংযোজনী (অ্যাডিটিভস) আমদানি করতে হয়। আধুনিক অণুজীব প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগুলো সহজেই দেশে তৈরি করা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা: ভবিষ্যৎ গড়ার ঠিকানা মাইক্রোবায়োলজি
এত বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগগুলো থেকে তৈরি হওয়া দক্ষ জনবল পুরোপুরি কাজে লাগছে না। সম্প্রতি এ খাতের পেশাজীবীদের বিভিন্ন ফোরামের আলোচনায় উঠে এসেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সিলেবাসকে আরো বেশি শিল্পবান্ধব করা প্রয়োজন।
আমি আজকের শিক্ষার্থীদের বলতে চাই, মাইক্রোবায়োলজি শুধু একটি পাঠ্য বিষয় নয়, এটি একটি অসীম সম্ভাবনার দিগন্ত। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক সিলেবাসে এখন খাদ্য ও ফার্মাসিউটিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি থেকে শুরু করে বায়োইনফরমেটিকস, ভ্যাকসিন উন্নয়ন ও বায়োপ্রসেস টেকনোলজির মতো সমসাময়িক বিষয়গুলো শেখার সুযোগ আছে।
আজ যদি তারা মাইক্রোবায়োলজিকে মূল বিষয় হিসেবে বেছে নেয়, তবে আগামীতে তারাই তৈরি করতে পারবে দেশীয় প্রযুক্তির ভ্যাকসিন, তারাই উদ্ভাবন করবে খরা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব সার, তারাই বানাবে প্লাস্টিক দূষণ রোধকারী অণুজীব। এ খাতে গবেষণা ও উদ্যোগ শুধু বিদেশী পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাবে না, বরং দেশের বিপুল অর্থ সাশ্রয় করবে এবং ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখবে।
সুপারিশ: এখনই সময় কাজ করার
পরিশেষে দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হলো:
- গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি: অণুজীব প্রযুক্তিবিষয়ক ফলিত গবেষণা প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়ন বাড়াতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প-কারখানার মধ্যে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সংযোগ স্থাপন করতে হবে।
- শিল্প-শিক্ষার সমন্বয় (একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবরেশন): বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস এমনভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করেই সরাসরি শিল্প-কারখানার চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়।
- নীতিগত ও বাণিজ্যিক সহায়তা: দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য কাঁচামাল আমদানির শুল্ক যৌক্তিক করা এবং স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনকারীদের বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা যেমন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি এটি আমাদের সামনে এক অনন্য সুযোগও এনে দিয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এবং প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হওয়ার। অণুজীব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ শুধু আমদানিনির্ভরতাই কাটিয়ে উঠবে না, বরং বিশ্বের দরবারে নতুন এক সম্ভাবনাময় টেকসই অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। আসুন আমরা সবাই—গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নীতিনির্ধারক—মিলে এ লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসি।
ড. মো. ফকরুদ্দিন: সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি