মাস্কাটের মঞ্চ, ঢাকার হিসাব: এবার বিশ্ব বসতি দিবসের মূল আয়োজন ওমানের মাস্কাটে, প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। জাতিসংঘ মানববসতি কর্মসূচির (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) হিসাবে বিশ্বে প্রায় ২৮০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের আবাসন অপর্যাপ্ততায় আছে; তাদের প্রায় ১১০ কোটি থাকে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে। এসডিজি ১১.১ ও ২০১৬ সালের নিউ আরবান এজেন্ডায় বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের অঙ্গীকার করেছে। হাতে আছে চার বছরের কিছু বেশি। প্রশ্নটা তাই আনুষ্ঠানিকতার নয়, হিসাবের: এ গতিতে চললে আমরা কি পৌঁছতে পারব?
সংকট ইটের নয়, অধিকারের: না, যদি আবাসনকে কেবল ঘর বানানোর প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়। প্রায় আড়াই দশক ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনায় কাজ করে আমার উপলব্ধি, সমাধান তিন স্তম্ভের সমন্বয়ে: জমিতে থাকার আইনি নিরাপত্তা বা দখলস্বত্ব, নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের অর্থায়ন, আর পরিকল্পনায় আবাসনের বাধ্যতামূলক জায়গা। একটি স্তম্ভ বাদ পড়লে বাকি দুটির বিনিয়োগও উচ্ছেদ বা দামের চাপে হারিয়ে যায়।
প্রবৃদ্ধি আছে, প্রবেশাধিকার নেই: ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২১ সালে ঢাকায় জমির দাম বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৪০ শতাংশ, ফ্ল্যাটের দাম ৭১৬ শতাংশ; অর্থাৎ জমির দাম ২৮ গুণ। আবাসন খাত বড় হচ্ছে, কর্মসংস্থানও দিচ্ছে; কিন্তু জোগানের প্রায় পুরোটাই মধ্য ও উচ্চবিত্তের জন্য। বাজার বাড়ছে ওপরের দিকে, নিচের তলা ফাঁকা।
শুমারির বাইরের শহর: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৪ সালের বস্তিশুমারিতে দেশে বস্তিবাসী ছিল প্রায় ২২ লাখ, বড় অংশ ঢাকায়। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলেই গবেষকদের ধারণা। অথচ এক যুগ পুরনো এ শুমারিই এখনো প্রধান ভরসা। হালনাগাদ তথ্য ছাড়া নীতি হয় অনুমাননির্ভর। এসব বসতিতে পানি, পয়োনিষ্কাশন ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি প্রকট।
আজীবন ভাড়াটে, আইনের বাইরে: শহরের বিপুলসংখ্যক মানুষ কখনো বাড়ির মালিক হবে না। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, নগর দরিদ্র পরিবারের আয়ের ৩০-৪০ শতাংশ যায় ঘরভাড়ায়। ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কাগজে আছে, প্রয়োগে নেই। অথচ আবাসন আলোচনা ঘুরপাক খায় মালিকানাকে ঘিরেই।
উপকূল থেকে বস্তিতে: নদীভাঙন, লবণাক্ততা আর ঘূর্ণিঝড়ে ঘর হারানো উপকূলের মানুষের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের বস্তিতে আশ্রয় নেয়। জলবায়ুজনিত এ অভিবাসনের হিসাব জাতীয় আবাসন পরিকল্পনায় প্রায় অনুপস্থিত। ফলে ধারণক্ষমতা ছাড়ানো বসতিগুলোতেই নতুন চাপ জমছে।
নীতি কাগজে, উচ্ছেদ মাঠে: ২০১৬ সালের জাতীয় গৃহায়ন নীতিতে ‘সবার জন্য আবাসন’ লেখা আছে, কিন্তু এক দশকেও এর স্বাধীন মূল্যায়ন হয়নি। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামাজিক আবাসন উদ্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্প মূলত গ্রামের ভূমিহীনদের জন্য; এর অর্জনের পাশাপাশি তালিকাভুক্তিতে ঘুস দাবির অভিযোগও প্রতিবেদনে এসেছে। শহরের দরিদ্রের জন্য সমমানের কর্মসূচি নেই। উপরন্তু জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ঘর বানায় এবং সরকারি জমি থেকে উচ্ছেদ চালায়। যে হাত ঘর দেয়, সেই হাতই ঘর ভাঙলে আস্থা টেকে না।
দলিলে নারী, নকশায় প্রতিবন্ধী: নারীর নামে জমি বা ঘরের মালিকানা এখনো ব্যতিক্রম; বিধবা বা পরিত্যক্তা নারীর জন্য দখলস্বত্বহীনতা মানে যেকোনো দিন ঘরছাড়া হওয়ার ঝুঁকি। জাতীয় বিল্ডিং কোডে প্রবেশগম্যতার নির্দেশনা থাকলেও অধিকাংশ আবাসন প্রকল্পে র্যাম্প বা বয়স্কবান্ধব নকশা এখনো ব্যতিক্রম। ‘সবার জন্য’ কথাটির মানে এরাও।
ব্যাংকক শেখায়, দিল্লি সতর্ক করে: থাইল্যান্ডের কমিউনিটি অর্গানাইজেশনস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (কোডি) ২০০৩ সাল থেকে ‘বান মানকং’ কর্মসূচিতে নিজে ঘর বানায়নি; বস্তিবাসী সমবায়কে অবকাঠামো অনুদান, স্বল্প সুদের গৃহঋণ আর জমির দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বা ক্রয়ের সুযোগ দিয়েছে। দেশে ইউএনডিপির নগর দারিদ্র্য হ্রাস কর্মসূচির আওতায় কমিউনিটি হাউজিং ডেভেলপমেন্ট ফান্ড নিয়ে আমার নিজের বিশ্লেষণেও দেখেছি, সঞ্চয়-ঋণের সুযোগ পেলে বস্তিবাসী ধাপে ধাপে নিজেরাই ঘর উন্নত করে; কিন্তু জমির আইনি নিশ্চয়তা না থাকলে সেই বিনিয়োগ উচ্ছেদে হারিয়ে যায়। উল্টো শিক্ষা ভারতের: প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বিপুল ঘর তৈরি হলেও শহরের দূরবর্তী অনেক ইউনিট ফাঁকা পড়ে থাকার সমালোচনা আছে। মাপকাঠি ঘরের সংখ্যা নয়, মানুষ সেখানে থাকতে পারছে কিনা।
বাজারই কি যথেষ্ট নয়: বিপক্ষের যুক্তিটি গুরুত্বের দাবি রাখে। রাষ্ট্রের সক্ষমতা সীমিত, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম, আর সরকারি হস্তক্ষেপ অতীতে দুর্নীতি ও অপচয় এনেছে। তাহলে করছাড়, নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস আর স্বল্প সুদের গৃহঋণ দিয়ে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেয়াই কি দক্ষ পথ নয়? জোগান বাড়লে দাম কমবে, সুফল চুইয়ে নিচে নামবে।
চুইয়ে পড়ার অংক মেলে না: মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে যুক্তিটি খাটে। কিন্তু জমির দাম দুই দশকে ২৮ গুণ হলে সুফল ওপরেই আটকে থাকে। আয়ের কাগজহীন অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক ব্যাংক ঋণের যোগ্যই নন। সিঙ্গাপুরের হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ডও বাজারের বিকল্প নয়, পরিপূরক: জমিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে দেশটি প্রায় চার-পঞ্চমাংশ বাসিন্দাকে সরকারি ফ্ল্যাটে এনেছে, বেসরকারি বাজারও সচল রেখেছে। আর এখানে প্রস্তাবিত হস্তক্ষেপ ব্যয়বহুল নির্মাণ নয়; আইনি স্বীকৃতি, নিয়ম ও তহবিলের কাঠামো। দুর্নীতির জবাব হস্তক্ষেপ বন্ধ করা নয়, স্বচ্ছতা।
নতুন আইন, পুরনো ঝুঁকি: এ বছরের এপ্রিলে পাস হওয়া স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬-এর ৭(২) ধারা ভূমি অধিগ্রহণে বাস্তুচ্যুতি এড়াতে পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করেছে। সুযোগটি বড়। কিন্তু আইনের অধীন জাতীয় পরিষদ ও জেলা কমিটি প্রায় পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক, বস্তিবাসীর প্রতিনিধি নেই, গণশুনানির সময় মাত্র ৩০ দিন। বিধিমালা দুর্বল হলে পুনর্বাসন হবে কাগুজে শর্ত।
পাঁচ করণীয়
এক. ১০ বছরের বসতি, ৩০ বছরের ইজারা। সরকারি খাসজমিতে অন্তত ১০ বছরের পুরনো বসতির বাসিন্দা সমবায়কে ৩০ বছর মেয়াদি নবায়নযোগ্য ইজারা; বিক্রয়যোগ্য নয়, উত্তরাধিকারযোগ্য। সনদে নারীর নাম বা যৌথ নাম বাধ্যতামূলক।
দুই. জাতীয় কমিউনিটি হাউজিং তহবিল। কমিউনিটি হাউজিং ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের মডেলকে আইনি কাঠামো দিয়ে বাজেটে আলাদা খাতে বরাদ্দ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যাতে সমবায়ের সঞ্চয় জামানত হিসেবে গণ্য হয়। বার্ষিক ফলাফল সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন বাধ্যতামূলক।
তিন. প্রতি দশে এক সাশ্রয়ী ঘর। ড্যাপ ও স্থানিক পরিকল্পনায় ৫০ ইউনিট বা তার বেশি প্রকল্পে অন্তত ১০ শতাংশ সাশ্রয়ী ইউনিট, অথবা সমমূল্যের অর্থ তহবিলে জমা; লঙ্ঘনে নকশা অনুমোদন স্থগিত।
চার. উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন, টেবিলে বস্তিবাসী। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের হাত থেকে উচ্ছেদের দায়িত্ব সরাতে হবে। ৭(২) ধারার বিধিমালায় লিখিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রকাশ ও ন্যূনতম ৯০ দিনের নোটিস বাধ্যতামূলক করতে হবে; জাতীয় পরিষদ ও জেলা কমিটিতে বস্তিবাসী বা নাগরিক সংগঠনের একটি আসন সংরক্ষিত রাখতে হবে।
পাঁচ. ভাড়া চুক্তি নিবন্ধনে ভাড়াটের ঢাল। সিটি করপোরেশনে অনলাইনে ভাড়া চুক্তি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের অগ্রিম সীমা ও ভাড়া বৃদ্ধির বিধান কার্যকর করতে হবে; প্রতিটি সিটিতে দ্রুত নিষ্পত্তির ভাড়া ট্রাইব্যুনাল।
ছাদ নয়, নিশ্চয়তা: এর কোনোটিই রাতারাতি লাখো ঘর তুলে দেবে না, আর মূল কথা সেটাই। পর্যাপ্ত আবাসন মানে শুধু মাথার ওপর ছাদ নয়; এমন নিশ্চয়তা, যার ভরসায় একটি পরিবার নিজের ঘরে নিজেই বিনিয়োগ করে। দখলস্বত্ব, অর্থায়ন আর পরিকল্পনা একসঙ্গে দাঁড় না করালে ২০৩০ সালের অঙ্গীকার আরেকটি দিবসের স্লোগান হয়েই থাকবে। মাস্কাটের মঞ্চ থেকে কামরাঙ্গীরচরের দূরত্ব কমানোর কাজ শুরু হোক এই অক্টোবরেই।
তৌফিক মহিউদ্দীন: নগর পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষক; চেয়ারম্যান, ভিশন এইড ফাউন্ডেশন (ভিআইএফ)