ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য জানাচ্ছে যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় গত ১১ বছরে সম্পূর্ণ একক দরপত্রে মোট ৬০ হাজার ৬৯ কোটি টাকার অর্থাৎ প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন কার্যক্রমের অস্বচ্ছতাজনিত আর্থিক অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য ঘটনা ঘটার আগেই যেভাবে অগ্রিম দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) আইন পাস করিয়ে নেয়া হয়েছে, তেমনি দরপত্র কার্যক্রমের অস্বচ্ছতা ঢাকার জন্য এক্ষেত্রেও অগ্রিম বিধান করে নেয়া হয়েছে যে কোনো কাজের জন্য অনলাইনে একটি মাত্র দরপত্র জমা পড়লেও আগ্রহী দরদাতাকে কার্যাদেশ দেয়া যাবে। আর এটি কে না জানে যে একটি মাত্র দরপত্র মানেই হচ্ছে অস্বচ্ছতা, যার আয়োজন ঘটে পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সাজিয়ে গুছিয়ে দরপত্রের টেবিলে এনে হাজির করার মাধ্যমে। সেই অস্বচ্ছতাপূর্ণ প্রক্রিয়াতেই গত ১১ বছরে প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার কাজের দরপত্রের নিষ্পত্তি হয়েছে।
সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যে কাজের সূচনা বা জন্ম, সেটির বাস্তবায়ন পর্যায় যে আরো অধিক অস্বচ্ছতাকে আশ্রয় করেই এগোবে, সেটাই স্বাভাবিক এবং সেই ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় ৬১ হাজার কোটি টাকার কাজের কতটুকু সাধারণ মানুষের উপকারে লেগেছে আর কতটা নেপথ্য কারিগরদের পকেটস্থ হয়েছে, সেটিই প্রশ্ন। ধারণা করা য়ায়, এর খুব সামান্য অংশই সাধারণ জনগণের উপকারে এসেছে এবং এর বড় অংশই দায়মুক্তির জন্য আইন প্রণয়নকারী থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের টাউট পর্যন্ত স্তরে স্তরে ভাগ হয়ে গেছে। একই কথা প্রযোজ্য উন্নয়নের নাম করে যেখানে সেখানে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর উড়ালসেতু, ভবনাদি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেও। এ জাতীয় কাজের ক্ষেত্রে আগে ঠিকাদাররা নিজস্ব মুনাফার অংশ থেকে প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্টদের কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করতেন বলে শোনা যায়। কিন্তু এখন আর তাদের মুনাফার অংশ ছাড়তে হয় না। বরং এসব পূর্ত ও অন্যান্য কাজের ব্যয় প্রাক্কলনই এমনভাবে করা হয় যে ঠিকাদারকে তার মুনাফার অংশ থেকে অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন তো হয়ই না, উল্টো বরং তার মুনাফার হার এখন আরো বেড়ে গেছে। আর এটা তো এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে উন্নয়নের নাম করে নির্মাণকাজগুলোর একটা বড় অংশই মূলত কমিশন ভাগাভাগির মচ্ছব। যত নির্মাণ, তত কমিশন—‘উন্নয়ন’ সেখানে শিখণ্ডি মাত্র।
একক দরপত্রে ৬১ হাজার কোটি টাকার কার্যাদেশসংক্রান্ত সংবাদটি যেদিন পত্রিকায় প্রকাশ হয়, সেই একই দিনের পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি খবর—বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) পদ্মা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা অয়েল কোম্পানির ডিপো থেকে তাদের নৌযান পর্যন্ত ১ টাকায় এক টন জ্বালানি তেল পরিবহনের চুক্তি করেছে বিসমিল্লাহ অয়েল সাপ্লায়ার্সের সঙ্গে (প্রথম আলো, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উল্লিখিত দূরত্বে মাত্র ১ টাকায় এক টন তেল পরিবহন কি বাস্তবে কোনোদিন সম্ভব? যদি সম্ভব না হয়, তাহলে এর রহস্যটা কী? রহস্য আর কিছুই নয়—ডিপো থেকে বন্দরে তেল পরিবহনের সময় পথিমধ্যে এর কিছু অংশ বাইরে বিক্রি করে দেয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এ রহস্যের চাবিকাঠি, যার উল্লেখ ওই সংবাদ প্রতিবেদনেই রয়েছে। আর এ রহস্যগল্পের পাত্রপাত্রীদের মধ্যে অন্যতম চরিত্র হচ্ছেন দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদাররা, যারা আসলে ভিন্ন ভিন্ন নামে ও পরিচয়ে আসলে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতিপূর্ণ কাগজপত্র বানিয়ে দরপত্রের কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এরাই হয়ে গেছেন রহস্যময় অবাস্তব সর্বনিম্ন দরদাতা। আর এ কাজ তারা শুধু এ বছরই করেননি, একই প্রক্রিয়ায় একই দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে কয়েক বছর ধরেই তারা তা করে আসছেন। তাহলে বুঝুন, বন্দোবস্ত কতটা চিরস্থায়ী!
এ খবরের ঠিক একদিন আগের (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩) বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে মেঘনা নদীতে বালি উত্তোলনকারী হায়েনাদের পেছনে রয়েছেন চাঁদপুরের একজন নারী মন্ত্রী। অন্যদিকে ২৬ সেপ্টেম্বরের আরেকটি খবর, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এই বলে কষ্ট ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন যে পরিবেশ নিয়ে কথা বলতে যাওয়ায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র তাদেরকে ধোলাইখালে চুবানোর কথা বলেছেন। একই দিনের পত্রিকার আরেকটি খবর: ডিএসসিসির দুই কীটতত্ত্ববিদ বলেছেন, মশার ওষুধ ঠিক করে কাগুজে অনুমোদনের জন্য তাদের কাছে পাঠানো হয়। ...তাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ নেয়া হয় না। ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রথম আলোর খবর, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদী দখল করে তৈরি হচ্ছে বেসরকারি ড্রাই ডক। এদিকে ২৭ সেপ্টেম্বরের দৈনিক যুগান্তর জানাচ্ছে যে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই চীন থেকে ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান ক্রয় করা হয়েছে, যেগুলোর ভবিষ্যৎও এর আগে একই দেশ থেকে ৬৫৪ কোটি টাকায় ক্রয়কৃত ২০টি ডেমো ট্রেনের দশা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে কেনা ওই ডেমো ট্রেনগুলোকে কেনার বছরখানেকের মধ্যেই ট্রেনলাইন ছেড়ে স্থায়ীভাবে ওয়ার্কশপে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
উল্লিখিত খবরগুলো ২৪-২৭ সেপ্টেম্বর এ চারদিনে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলোর কয়েকটি মাত্র। সব শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার উল্লিখিত তিনদিনের এ জাতীয় সব খবর একসঙ্গে করা হলে সে তালিকা যে অনেক দীর্ঘ হবে, তাতে মোটেও কোনো সন্দেহ নেই। তবে সে তালিকার দৈর্ঘ্য নিয়ে আলোচনা করার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটি উপলব্ধি করা যে এ জাতীয় খবরের তালিকা প্রতিদিনই কেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে? কারা এর জন্য দায়ী? এ জাতীয় অন্যায়, দুর্নীতিপূর্ণ ও ভয়ংকর ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে রাষ্ট্রের কি কোনো দায় নেই? রাষ্ট্রের পক্ষে এসব দেখার দায়িত্ব কি কারো ওপর বর্তায় না বা এসব দেখে সে ব্যাপারে প্রতিকার বা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো ব্যবস্থাই কি বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোতে নেই? অবশ্যই আছে। এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মতো আইন ও বিধি দেশে যথেষ্টই রয়েছে। নেই শুধু সেসব আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ ও তৎপরতা। কেন নেই সে জবাবও অত্যন্ত সহজ, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সেটি চান কিনা?
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অসংখ্য অভিযোগের মধ্যে কতিপয় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এই যে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজেই বাজার সিন্ডিকেটের অংশীদার অথবা পৃষ্ঠপোষক, শুধু নারীমন্ত্রী নন, অন্যান্য মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যও ভূমির অবৈধ দখলদার, মন্ত্রীপুত্র পিতাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিপরায়ণ ঠিকাদার, ধান-চালের মজুদ ও মূল্যনির্ধারক দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজেই চাতালমালিক, পরিবহন সমিতির নেতাই গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারক, প্রকল্প মানেই মেগা প্রকল্পের আওতায় ভয়ংকর সব ব্যয় প্রস্তাব (মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী নিজেই প্রকল্পের এসব অস্বাভাবিক ব্যয়কে ‘ভয়ংকর’ বলে অভিহিত করেছেন), ব্যাংক মানেই ঋণখেলাপ ও অর্থ পাচারে সহযোগিতাদান, প্রকল্প সাহায্য মানেই কনসালট্যান্সি, গাড়ি ক্রয় ও বিদেশ ভ্রমণ ইত্যাদি। কিন্তু এতসব অভিযোগ প্রকাশ্যে উত্থাপিত হওয়ার পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যদি সত্যি সত্যি চাইতেন যে এসব অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিকার হোক, তাহলে কার সাধ্য যে তা ঠেকিয়ে রাখে?
কিন্তু উল্লিখিত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা যদি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা না হয়, তাহলে বর্তমানে যারা এসব অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, নিকট ভবিষ্যতে তাদের দৌরাত্ম্য আরো বেড়ে যাবে না কি? সরল মনে বলছি, সত্যি বুঝতে পারি না এসব অনাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অসুবিধাটা কোথায়? তাহলে কি সিদ্ধান্তপ্রণেতারা কোনো কারণে দুর্নীতিবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন? নাকি যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হচ্ছে, ব্যবস্থা নিলে তাদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থেকে তা করা হচ্ছে না? নীতিনির্ধারকদের প্রশ্রয় ও সমর্থনে দুর্নীতির রাহুগ্রাস রাষ্ট্র ও সমাজকে যেভাবে চতুর্দিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, সে অবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থের কথা ভেবে দুর্নীতিবাজদের ওপর নির্ভর করা, তাদের ভয় পাওয়া ও তাদের হাতে জিম্মি হওয়ার সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। নইলে যে লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার অনেকটাই ক্রমান্বয়ে ফিকে হয়ে যাবে। কিন্তু সেটি কি আমাদের কারো কাম্য হতে পারে?
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত