আজ বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। ২০২৪ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘Health Equity, Gender and Human Rights’ ‘স্বাস্থ্য ও লিঙ্গসমতা এবং মানবাধিকার’। বিশ্বের মানুষকে ম্যালেরিয়ার বাহক ও ম্যালেরিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতন করা এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য প্রতি বছর এ দিবস পালন হয়ে থাকে।
ম্যালেরিয়া রোগের পাশাপাশি পৃথিবীতে অনেক সংক্রামক রোগ পুনরায় আবির্ভূত হচ্ছে এবং হবে। আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংক্রামক রোগ মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে আসছে। প্রাচীনকালে বাইবেলের প্লেগ এবং এথেন্সের প্লেগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ব্ল্যাক ডেথ, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী এবং অতিসম্প্রতি ডায়রিয়া ও এইচআইভি/এইডস, ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া মহামারী, সংক্রামক রোগগুলো ক্রমাগতভাবে উত্থিত এবং পুনরুত্থিত হয়েছে। এগুলোর পুনরুত্থান রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সব অনুমানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বেশকিছু রোগ জনস্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা। কিছু কিছু রোগ সাম্প্রতিক সময়ে বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি কিছু রোগের বিস্তার এবং সংক্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ । দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রোগের প্যাথোফিজিওলজি ভালোভাবে না জানার কারণে কিছু কিছু রোগ পুনরায় ফিরে আসছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া, নাগরিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং জীবনযাত্রার মান নিম্ন হওয়ায় বাংলাদেশের মতো মধ্যম এবং নিম্নআয়ের দেশগুলোয় সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে চলেছে।
লেশম্যানিয়াসিস, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি রোগ বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের প্রধান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বহু মানুষের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণে হুমকির হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লেগ পুনরায় আবির্ভূত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এটি ভারতীয় উপমহাদেশে হয়েছিল যা মানুষের অসুস্থতা, মৃত্যু এবং বাণিজ্য ঘাটতিতে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। আমাদের দেশে লেপ্টোস্পাইরোসিস ধরা পড়েনি শুধু সচেতনতার অভাবে।
নতুন ও পুনরুত্থিত জীবাণু হুমকি বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য এবং সংক্রামক রোগ গবেষণা সম্প্রদায়কে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে, নতুন উদীয়মান প্যাথোজেন, যেমন গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সিন্ড্রোম সম্পর্কিত করোনাভাইরাস (SARS-CoV), হেনিপাভাইরাস (হেন্দ্রা এবং নিপা), এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এবং অতিসম্প্রতি সোয়াইন ফ্লু মহামারীতে বিবর্তনের হুমকির সঙ্গে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এক দশক ধরে মাইকোব্যাকটেরিয়াম যক্ষ্মা রোগের মতো সাধারণ জীবাণুর স্ট্রেনগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, যা একসময় এর বিরুদ্ধে কার্যকর ছিল। এ ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল-প্রতিরোধী অণুজীব, প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে যেটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। নতুন উদ্ভাবনী চিকিৎসা পদ্ধতি, ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্টগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন।
ম্যালেরিয়া সমস্যাকে সমাধান করতে পারবে এমন কোনো একক হাতিয়ার বর্তমানে নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই এ বিষয়ে বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের আহ্বান জানাচ্ছে, যা ম্যালেরিয়া সমস্যা সমাধানে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। এ বছরের প্রতিপাদ্যে ম্যালেরিয়া বাহক মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
২০০৭ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের (ডব্লিউএইচওর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা) ৬০তম অধিবেশনে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এর পরের বছর থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে। বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস প্রতিষ্ঠার আগে, আফ্রিকা ম্যালেরিয়া দিবস ২৫ এপ্রিল পালিত হতো। আফ্রিকা ম্যালেরিয়া দিবস ২০০১ সালে শুরু হয়েছিল। ম্যালেরিয়া সম্পর্কিত আফ্রিকান শীর্ষ সম্মেলনে ৪৪টি ম্যালেরিয়া-এন্ডেমিক দেশ দ্বারা ঐতিহাসিক আবুজা ঘোষণার স্বাক্ষরের এক বছর পর।
দিবসটি ম্যালেরিয়া সম্পর্কে শিক্ষা ও বোঝাপড়া প্রদান এবং স্থানীয় এলাকায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমসহ জাতীয় ম্যালেরিয়া-নিয়ন্ত্রণ কৌশলগুলোর বছরব্যাপী সঠিকভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য চালু হয়েছিল।
ম্যালেরিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য রোগ যা সারা বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবিকার ওপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলে চলেছে। ২০২২ সালে বিশ্বের ৮৫টি দেশে ম্যালেরিয়ায় আনুমানিক ২৪৯ মিলিয়ন নতুন রোগী এবং আনুমানিক ৬ লাখ ৮ হাজার ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ১৩টি জেলার ৭৭টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে তিনটি পার্বত্য জেলায়—বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজার। ২০০০ সালের পর ২০০৮ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। এ বছর ৮৪ হাজার ৬৯০ জন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ১৫৪ জন মারা যায়।
প্রোটোজোয়া পর্বের ক্ষুদ্র প্রাণী ‘প্লাসমোডিয়াম’ ম্যালেরিয়ার পরজীবী, যেটি অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে মানবদেহে সংক্রমিত হয়। বাংলাদেশে অ্যানোফিলিস মশার চারটি প্রজাতি ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করে, তার মধ্যে অ্যানোফিলিস ভাইরাস অন্যতম। এপিডেমিক বাহক হিসেবে আরো তিনটি অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া ছড়ায়।
পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল। কারণ সে সময়ে মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ডিডিটির ব্যবহার করা হতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ম্যালেরিয়া বেড়ে যায়। এর মূল কারণ ১৯৮১ সালে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের তহবিলের অভাব।
ম্যালেরিয়ায় প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার কারণে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার ম্যালেরিয়াকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির অধীনে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম ও এর সহযোগী সংস্থা ব্র্যাকের কার্যক্রমের কারণে ২০০৮ সালের পর দেশে ম্যালেরিয়া কমতে শুরু করে। গত বছর (২০২৩ সালে) দেশে প্রায় ১৫ হাজার ৫৬৫ জন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এবং ছয়জন মারা গেছে।
ম্যালেরিয়া যেহেতু মশার মাধ্যমে ছড়ায়, তাই এটির বিরুদ্ধে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জন্য ম্যালেরিয়া বাহক মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক যুগোপযোগী পদ্ধতি, ডায়াগনস্টিকস, ম্যালেরিয়ারোধী ওষুধ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে আসার জন্য আক্রান্ত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর একযোগে কাজ করা জরুরি। ম্যালেরিয়া বাহকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণা এবং গবেষণার জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য মাঝারি এবং উচ্চ ম্যালেরিয়া সংক্রমণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে ম্যালেরিয়া টিকার ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। ব্যাপকভাবে এটির প্রয়োগ প্রতি বছর হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে পারে বলে তারা বলছে।
বাংলাদেশ সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূলের ঘোষণাকে বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং গবেষকদের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া নির্মূলে মশারি বিতরণের পাশাপাশি অন্যান্য নতুন কৌশল, বিশেষ করে মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিনামূল্যে রেপেলেন্ট ক্রিম বিতরণ করা যায় কিনা সেই বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।
গবেষক বিজ্ঞানী এবং ওষুধ তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই ম্যালেরিয়াসহ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ভ্যাকসিন আবিষ্কার। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন এ অগ্রগতির আরেকটি কারণ। তবে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। মিউটেশন এবং বিবর্তনের মাধ্যমে ভাইরাস পরিবর্তিত হয়ে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।
আমরা ধরে নিতে পারি, জীবাণুর অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা কখনো শেষ হবে না। সফলভাবে এ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের জোরালোভাবে মৌলিক গবেষণা জোরদার করতে হবে। গবেষণার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রস্তুতি রাখতে হবে যেন যেকোনো ধরনের রোগ আক্রমণ মোকাবেলা করা যায়।
ড. কবিরুল বাশার: অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়