বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক হওয়া উচিত

ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক। ব্যাংকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু। সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি অধ্যাপনাও করেছেন। মিলিটারি একাডেমি থেকে নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। অধ্যাপনা ও গবেষণায় পর্যটন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন। উপাচার্য হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট, শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল আবেদিন ও আবু ছালেহ শোয়েব

উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর কোন চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে বড় মনে হয়েছে? এখনো কী কী চ্যালেঞ্জ আছে মনে করেন?

আমি দায়িত্ব নেয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল। শিক্ষার্থীদের আবার পড়ালেখায় মনোনিবেশ করানো, শিক্ষকদের পাঠদানের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে দেয়া ও গবেষণা কার্যক্রমে মনোযোগ বাড়ানোর উৎসাহ দেয়াটার ক্ষেত্রে অস্থিরতা ছিল। শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্বিক অস্থিরতা ও অস্বস্তি রেখে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না, সেটা সহজেই অনুমেয়। আবার পুরনো কিছু সমস্যাও ছিল। কিছু বিভাগে সেশনজট আছে। এ বিষয়ে আমরা শুরু থেকেই কোনো ধরনের শিথিলতা মেনে নিতে চাইনি। কোনো শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েশনে যেন নির্ধারিত সময়ের একদিনও দেরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চাই। যেসব বিভাগে এ সমস্যা আছে সেগুলোয় আমরা মনোযোগ বাড়িয়েছি।

আবার চব্বিশে স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের লুটপাটের খেসারত গোটা দেশকেই দিতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি। সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি অবকাঠামো নির্মাণ সহায়তার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি। এদিকে যেন গুরুত্বের সঙ্গে মনোযোগ বাড়ে সেজন্য জোর প্রচেষ্টা চলছে। এসব বাদে শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ শুরুতে মুখোমুখি হয়েছি। সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশনের জন্য পানি সরবরাহ নিয়ে অনেকগুলো বাধা ছিল। সেগুলোয় হাত দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সংকট কাটিয়ে মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নের দিকটাতে গুরুত্ব দিচ্ছি। আবার হলকেন্দ্রিক সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে। রিডিং রুমের মানোন্নয়ন, বিনোদনের ব্যবস্থা ও ডাইনিং পদ্ধতির মানোন্নয়নে নজর দিচ্ছি। সমস্যা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবলের সংকট রয়েছে। অনেক বিভাগে শিক্ষক নেই। বলতে গেলে চ্যালেঞ্জ অনেক। এগুলো একে একে সমাধান করাই উপাচার্যের নেতৃত্বের প্রকাশ।

নিজ মেয়াদকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে আপনার মূল লক্ষ্য কী? আগামী চার বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন পথে নেতৃত্ব দিতে চান?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমাকে সরকার মনোনীত করেছে বলে দায়িত্বের চাপ বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য বিবেচনায় শিক্ষার্থীদেরও আমার প্রতি প্রত্যাশা রয়েছে। একজন উপাচার্য মূলত চার বছর মেয়াদের জন্য দায়িত্ব পান। ফলে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন আনা কঠিন। কিন্তু নির্ধারিত কিছু লক্ষ্যের মাধ্যমে একটি নতুন পরিবর্তনের সূচনার সুযোগ ঠিকই রয়ে যায়। আমি আমার মেয়াদকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা পৃথিবীতেই পরিচিত করার জন্য নেতৃত্ব দিতে চাই। এখন বিশ্ব অনেক এগিয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি আর বৈজ্ঞানিক নানা আবিষ্কার নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ চলছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও গবেষণা কার্যক্রমকে এগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করে বিশ্বমানের গবেষণা সংস্কৃতি গড়ার লক্ষ্যকেই আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। শুরু থেকেই এটি নিয়ে কাজ করে চলেছি।

গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলক ভালো করছে। তবে এ খাতে পরিকল্পনা, বরাদ্দ নিয়ে সমস্যা লেগেই আছে। এ সার্বিক বিষয় মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান আর পদক্ষেপ কী?

গোটা বিশ্বেই গবেষণা প্রসঙ্গে ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। অতীতে এখানে যে গবেষণা হতো বা আমরা যে ধরনের উল্লেখযোগ্য গবেষণা কাজ দেখি তার অধিকাংশই ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এর অর্থ আমি গবেষণার মাধ্যমে নিজের স্কলারলি উন্নয়ন নিশ্চিত করব এবং শিগগিরই পদোন্নতি বা পরবর্তী অধ্যাপনার পদে নিযুক্ত হবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক বা অন্য পদগুলো এমন না যে পদোন্নতি হলে পাওয়া যায়। অনেকে গবেষণা প্রকাশ ও পিএইচডি করে বড় পদে যাওয়ার আবেদনের সুযোগ নিতে চান। তাই গবেষণা তাদের কাছে গৎবাঁধা কিছুই থাকে। গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও এর প্রয়োগ সমাজকেন্দ্রিক হওয়া দরকার। গবেষণাটি আমাদের সমাজে কীভাবে উপকার করবে আর কীভাবে কাজে আসবে সেটি বোঝা জরুরি। যারা গবেষণায় আগ্রহী বা যারা গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন তাদের আমরা এ বার্তাটাই দেয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ মিলে না। আর গবেষণার সুযোগও সংকুচিত। তরুণ গবেষকরা যে দেশের বাইরে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ও টেকসই গবেষণা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবেন, সে সুযোগও কমতে শুরু করেছে। তবে আমাদের ভাবনা ভিন্ন। এখানে যতটুকু গবেষণাই হোক না কেন, তা যেন পূর্ণাঙ্গ হয় এবং গবেষণা কার্যক্রম স্থবির হয়ে একেবারে বন্ধ হয়ে না যায়। এ গবেষণার ফল যেন সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বিদ্যায়তনিক খ্যাতি অর্জনেও অবদান রাখে সেটাকে উৎসাহিত করার চেষ্টা চলছে। দেশ, দেশের মানুষ এমনকি রাষ্ট্রের উপকারে যেন গবেষণালব্ধ জ্ঞানটি ব্যবহার করা যায়। এমন একটা গবেষণা সংস্কৃতির রূপান্তর আমরা চাচ্ছি। এর জন্য প্রশাসনিক পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। গবেষকদের এখানে দায়িত্বশীলতা ও সততার পরিচয় আবশ্যক। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিজস্ব সমাধান জরুরি। সেটা আসবে গবেষণার মাধ্যমে। যদি আমরা সেটা করতে না পারি তাহলে সামনে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে অথবা জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে সেটা শিক্ষা খাতের মাধ্যমে পূরণ করা যাবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এ লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রশ্নে যেমনটি বললেন, গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা এবারই যে অগ্রগতি করেছি এমন নয়। বহু আগে থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলছে। এখন কিছু গবেষণা মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের। এসব গবেষণার ক্ষেত্রে সচরাচর ইংরেজি প্রকাশনা মিলে না। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব গবেষণার মূল্যায়ন নেই। আর বিজ্ঞান অনুষদের গবেষণায় উপকরণ, পরীক্ষার ব্যয়সহ অন্যান্য বরাদ্দ লাগে। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত নয়। এত সীমাবদ্ধতার পরও কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের একটা পরিচয় গড়তে শুরু করেছে। উপাচার্য হিসেবে আমি এ গবেষণা কার্যক্রম যেন বাধা-বিপত্তিতে না পড়ে সে চেষ্টা করছি।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ ইউজিসির মাধ্যমে বিতরণের কথা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

অনেকে এ বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবেই ব্যাখ্যা করছেন। কারণ ইউজিসির মাধ্যমে বরাদ্দ আসার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হবে। সেটি একটি দিক। কিন্তু অনেকে যেমনটি বলেন এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বয়াদ্দ দেয়া হয়নি, এ কথাটি সঠিক নয়। গবেষণার জন্য অবশ্যই বরাদ্দ দেয়া হবে এবং সামনে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। বরাদ্দ বাড়ার পর তা বণ্টনের বিষয়টি থাকে। আমি নিশ্চিত যে এ বরাদ্দ অবশ্যই বাড়বে।

অতীতে গবেষণায় বরাদ্দ দেয়ার যে প্রক্রিয়া ছিল সেটার মধ্যে আসলে পরিবর্তন আসছে। সেটা কেন আসছে বোঝা দরকার। আমাদের রিসোর্স সীমিত। তাই সব ধরনের গবেষণা করা সম্ভব নয়। এজন্যই শুরুতে যেমনটি বলেছি, আগে গবেষণা প্রস্তাবটি আমাদের সমাজের ও রাষ্ট্রের উপকারে কীভাবে আসবে সেটা নিশ্চিত হতে হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গবেষণা বরাদ্দ ব্যবহারও করা যাচ্ছে না এমন সংবাদও মিলছে। এখানের নতুন প্রক্রিয়ায় গবেষণা বরাদ্দটার প্রায়োগিক দিক বিবেচনা করার জন্যই বরাদ্দ পেতে বিলম্ব হচ্ছে। আমার কাছে এটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া। কারণ এভাবে অন্তত জ্ঞান উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তদারকি বা গেটকিপিং বাড়বে। তাতে অন্তত যতটুকুই বরাদ্দ পাওয়া যায় তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হবে। উদ্ভাবনের উপকার আমরা পাব। একদিনে এর প্রভাব আমরা দেখতে পাব না। আজ থেকে দুই-চার বছর পর দৃশ্যমান হতে শুরু করবে। তাই বরাদ্দ একেবারে শূন্য হয়ে গেছে এমনটা ঢালাওভাবে বলা ঠিক হবে না। সঠিকভাবে বরাদ্দ বণ্টন ও ব্যবহারের পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় না হলেও এখানের হল ও আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আছে। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু নিশ্চিত করছে?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী দেশের প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসে। তাদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নন, এটি সত্য। এজন্য সব শিক্ষার্থীকে আবাসিক সুবিধা দেয়া একটি যৌক্তিক দাবি। আর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একটা ভাবনা থাকে, আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি তাই শিক্ষাজীবন উপভোগের জন্য হলে থাকব। সমস্যা হলো আমাদের যে কয়টা হল আছে আর সেখানে যতগুলো আসন আছে তার তুলনায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এজন্য যাদের একান্ত প্রয়োজন ওই শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিকেই আমাদের মনোযোগটা থাকে বেশি। আর অল্প সময়ে এ সমস্যার সমাধান করাটা বড় চ্যালেঞ্জের কাজ।

আমরা আসলে কয়েকটি স্তরে সমস্যা সমাধানে কাজ করছি। আপাতত আনুমানিক ৩৫-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনতে পেরেছি। সামনে আমরা ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে তা ৭০-৮০ শতাংশে নিয়ে আসার জন্যও পরিকল্পনা করব। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা। কারণ এজন্য নতুন কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। এখানেও একটা সমস্যা রয়েছে। এসব প্রকল্প অনেক আগেই চালু হয়। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতি আর প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যায়নি। নির্মাণাধীন দুটি হলের কাজ চলছে। আমরা এগুলো দ্রুত নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার উপযোগী করার বিষয়ে জোর দিচ্ছি। আশা করি দ্রুতই কাজ শেষ হবে। এ হলগুলো হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত অর্ধেক শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধার আওতায় আনা যাবে। প্রতিনিয়ত হল পরিদর্শন করার পাশাপাশি যেখানে সমস্যা বা অভিযোগ মিলছে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। যাহোক, আমাদের দ্বিতীয় পরিকল্পনাটিও বাস্তবায়ন হবে। এরই মধ্যে একনেকে আমাদের সাতটি হলের নাম অর্থ পরিকল্পনার সবুজপত্রে (গ্রিন লিফ) উত্থাপিত হয়েছে। এবার এটি একনেকে যাবে এবং সেখানে অনুমোদন পেলে আমরা আরো কয়েকটি হল গড়তে পারব। সেটা হলে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধায় আনা যাবে।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অবশেষে বহুল কাঙ্ক্ষিত রাকসু নির্বাচন হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে ভাবনা কী?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্যই চাইবে রাকসু নির্বাচন নিয়মিত হোক। এখন পরবর্তী নির্বাচন আয়োজন সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকুক এটা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবেই তারা কাজ করেন। তাও এখনই আমরা কিছু বলতে পারছি না। আগামী রাকসু নির্বাচনের সময় এলে এর কার্যক্রম দৃশ্যমান তো হবে।

বিগত প্রশাসনে শিক্ষক ও প্রশাসনিক নানা পদে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বড় অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও এটিকে মেধাভিত্তিক রাখার বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে?

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নিয়োগে স্বচ্ছতা জরুরি। যেমনটি বলেছি, আমাদের জনবল সংকট আছে। তাই প্রশাসনে দক্ষ অফিসার ও মানবসম্পদও লাগবে। এটা মনে রাখতে হবে, চব্বিশের জুলাইয়ের পর আমরা এক নতুন ভাবনার বাংলাদেশ পেয়েছি। প্রত্যেক তরুণ ও শিক্ষার্থী তার মেধার যথার্থ মূল্যায়ন হোক এমনটাই প্রত্যাশা করেন। তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নির্মোহভাবে নির্বাচিত হবেন। সমতা নিশ্চিত হবে। যিনি যোগ্য তাকেই নিয়োগ দেয়া হবে। আমরা এভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সাজিয়ে নিচ্ছি। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেবা দেয়ার জন্য অর্থাৎ পরিবহন, পরিচ্ছন্ন কর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে। এটার প্রক্রিয়া আলাদা।

আপনি অধ্যাপনার ক্ষেত্রে পর্যটন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন। উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ডিং ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ জ্ঞানকে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন বা লাগাতে চান?

রাজশাহীকে শিক্ষার শহর বলা হয়। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখানকার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কেউ বলুক বা না বলুক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পর্যটকের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। অনেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে আসেন। এটাকে সামনে রেখেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের কিছু প্রকল্প সামনে নেয়া হবে।

ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই তা করা হবে। অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের জন্য এটি হবে অভিজ্ঞতা। তবে যারা পর্যটক হিসেবে আসেন তাদের জন্যও আমরা কিছু করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ অংশ বা ছোট বনাঞ্চল এবং জলাশয় নিয়ে পরিকল্পনা আছে। পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য রক্ষায়ও আমাদের মনোযোগ থাকবে। আগামী ৫০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে যে পরিকল্পনা আছে তা আস্তে আস্তে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় একটি জায়গাতে পরিণত করব।

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেয়ায় আপনি সার্বিক দিকগুলোই পর্যবেক্ষণ করেন। এ অভিজ্ঞতার নিরিখে শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার কোনো বার্তা রয়েছে কি?

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কথা একটিই, নিজেকে আরো দক্ষ করে তোলা। প্রথাগত নোট বা চাকরির বই মুখস্থ করে সরকারি চাকরিতে ঢোকা বা চাকরির জন্য লাগাতার চেষ্টা করার মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্যই বিনষ্ট হয়। এখন আর উচ্চ শিক্ষা ওই পর্যায়ে নেই। এরই মধ্যে উচ্চ শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। আধুনিক বিশ্বে শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের সম্পর্ক জুড়ে গেছে। তাই শিক্ষার জ্ঞান শিল্পসংযুক্ত না হলে পুঁথিগত বিদ্যার ওপর ভরসা বিপর্যয় আনবে। এজন্য সব শিক্ষার্থীকেও বলব, গোটা বিশ্বের পরিবর্তন, ডেভেলপমেন্টগুলোর দিকে মনোযোগ দিন। তত্ত্বজ্ঞানের ওপর ভর করে নিশ্চিত থাকবেন না।

এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। মানুষের পুঁথিগত জ্ঞান এমনকি নির্দিষ্ট একটি দক্ষতার ওপর নির্ভরতা তার কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অধ্যয়নের নানা ক্ষেত্রই কমিয়ে দিতে পারে। তাই সবসময়ই গ্রহণযোগ্য থাকবে এমন কিছু সফট স্কিল বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। আর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে সময় অনেক মূল্যবান। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার-পাঁচ বছরের এ শিক্ষাজীবনে যতটুকু সময় মিলে তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতায় নামার আগেই নিজেকে এ সময়ে প্রস্তুত করতে হবে। কারণ এ সুযোগ দ্বিতীয়বার আর মিলবে না।

আরও