এ পরিকল্পনায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রফতানি, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স), দক্ষতা উন্নয়ন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যটির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিজনিত সমস্যার চেয়ে বিনিময় হারজনিত সমস্যাই বেশি। তাই ইস্যুটির মূল বিষয় শুধু অর্থনীতি কত দ্রুত বাড়ছে তা নয়, বরং সে প্রবৃদ্ধির কতটা অর্থনীতিতে ডলারের হিসাবে টিকে থাকছে সেটিই প্রধান। বিএনপির ইশতাহারের মূল আকর্ষণ ছিল ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা। বলা যায়, এ লক্ষ্যমাত্রা ইশতাহারে ঘোষণার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি বিপুল জনসমর্থন আদায় ও জয়ী হয়েছে। সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাই এ লক্ষ্যমাত্রাকে নির্বাচনী সংখ্যা থেকে নীতিগত কাঠামোতে রূপ দিতে হবে। সমস্যা হলো স্লোগানে এ লক্ষ্যমাত্রার গাণিতিক হিসাব যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই ভঙ্গুর।
ডলারের হিসেবে জিডিপি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধি (রিয়েল আউটপুট গ্রোথ), মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার বিনিময়ে ডলারের মূল্য। বর্তমানের দেশের অর্থনীতি ৪৭০ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সাল নাগাদ এ অংককে ট্রিলিয়নে নিতে হলে বার্ষিক প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতই যদি দেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হারে বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ঘরে থাকে, তাহলে স্থানীয় টাকার (নমিনাল টাকা) হিসেবে অর্থনীতি ১২ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু যদি ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রতি বছর ৩ শতাংশ কমে যায়, তবে রূপান্তরের সময় ৩ শতাংশ হারিয়ে যায়। এভাবে ডলারের হিসাবে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ৯ শতাংশ, যা প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশের চেয়ে কম। সুতরাং দেশীয় প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও মুদ্রার মান কমতে থাকলে তা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথেষ্ট নাও হতে পারে। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য এ গাণিতিক হিসাবকে আরো কঠিন করে তুলেছে। তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৭ ডলারে স্পর্শ করেছিল। অবশ্য একটি ভঙ্গুর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে হলেও দাম ৯৪ ডলারের আশপাশে নামিয়ে আনা গেছে। তবু এটি যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এ দামে জ্বালানি আমদানির খরচ এরই মধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং পরিবহন ও বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে অর্থবছর শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। ফলে ফেব্রুয়ারির শুরুতে মোট রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় টাকার মানের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ ছিল এবং বাজারকে নিজের গতিতে চলতে দিলে টাকার মান সম্ভবত বাড়ত। এর পরিবর্তে বিনিময় হার প্রতি ডলারে প্রায় ১২২ টাকার কাছাকাছি স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনা অব্যাহত রাখে। তবে গত ৮ মার্চ থেকে তারা টাকাকে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে দিচ্ছে, কারণ যুদ্ধের ঝুঁকিগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বিনিময় হার ১২৩ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। পরিবর্তনটি ১ ট্রিলিয়ন ডলার পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকা একটি মৌলিক টানাপড়েনকে সামনে এনেছে। রিজার্ভ পুনর্গঠনের দিক থেকে ডলার কেনা যুক্তিযুক্ত। আমরা সবাই জানি ২০২২-২৪ সালের মধ্যে সরকারি রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন থেকে কমে ২৪ বিলিয়নে নেমে এসেছিল। কিন্তু দুর্বল টাকা রফতানিকারকদের সহায়ক হলেও ডলারের হিসেবে ১ ট্রিলিয়নে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্য কথায় যে নীতি রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করছে, সেটিই আমাদের ডলারের লক্ষ্যমাত্রা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সমস্যাটি ত্রিমুখী। কোনো দেশই একসঙ্গে তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। দুর্বল টাকা রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক থাকতে সাহায্য করে এবং রিজার্ভের জন্য ডলার কেনা সহজ করে। অন্যদিকে শক্তিশালী টাকা হলে একই উৎপাদনকে ডলারে রূপান্তর করলে বেশি ডলার পাওয়া যায় এবং কাগজে-কলমে ডলার জিডিপি বাড়ে, কিন্তু এটি রফতানির মুনাফাকে সংকুচিত করে। রিজার্ভ বাড়ানোর অর্থ হলো বাজারে টাকা ছেড়ে ডলার কেনা, যা মুদ্রাকে দুর্বল করে। সুতরাং এ তিনটি উদ্দেশ্য রিজার্ভের পর্যাপ্ততা, রফতানি সক্ষমতা ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা বাংলাদেশ ব্যাংককে তিনটি বিপরীত দিকে টানে। যেকোনো এক সময়ে কেবল দুটির সেবা করা সম্ভব; তৃতীয়টিকে ছাড় দিতেই হবে। এটিই বাংলাদেশের বিনিময় হার নীতির কেন্দ্রে থাকা ‘ত্রয়ী সংকট’ বা ট্রিলেমা। শক্তিশালী উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এ টানাপড়েন কমাতে পারত। কারণ সেক্ষেত্রে মুদ্রা শক্তিশালী থাকলেও রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতামূলক থাকতে পারত। এজন্য প্রয়োজন এমন শিল্পোন্নয়ন, যা বাংলাদেশে এখনো অর্জন হয়নি। তদুপরি বিএনপির ইশতাহারে এ বিনিময়ের (ট্রেড অফ) বিষয়টি সরাসরি মোকাবেলা করা হয়নি। অথচ এতে তিনটি বিষয়ই পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এর মানে এই নয় যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার পরিকল্পনা এখনই করা ভুল। সমস্যা হলো এ ‘ট্রিলেমা’ কিংবা সংকট পরিস্থিতি কেবল পরিকল্পনার ভেতরে থাকা স্ববিরোধিতাকে উন্মোচন করে। বাংলাদেশ যদি গত দশকের প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে এবং সঙ্গে পরিমিত মূল্যস্ফীতি ও নিয়ন্ত্রিত অবমূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। এর এক বা দুই বছর পর ১ ট্রিলিয়নও অতিক্রম করতে পারে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে এ ট্রিলেমা সামাল দেয়, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। টাকাকে ধীরে ধীরে এবং অনুমানযোগ্যভাবে অবমূল্যায়িত হতে দেয়ার বর্তমান নীতিটি সম্ভবত সবচেয়ে নিরাপদ পথ। এটি রফতানিকারকদের রক্ষা করে। এছাড়া রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করে এবং আকস্মিক মুদ্রা সংকট এড়ায়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে অবমূল্যায়নের চক্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডলার জিডিপিকে কমিয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংককে স্পষ্ট হতে হবে তারা এ তিনটি লক্ষ্যের মধ্যে কোনটি ও কখন বিসর্জন দিতে রাজি হবে। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অংকটি নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে চমৎকার, কিন্তু এ সময়ে এটি একটি দুর্বল নীতিগত ভিত্তি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মৌলিক বিষয়গুলো—প্রবৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ ও রিজার্ভের পর্যাপ্ততা। বাংলাদেশ যদি এগুলো ঠিকঠাক করতে পারে, তবে ডলারের হিসাব নিজে থেকেই মিলে যাবে। তা ২০৩৪ সালের বদলে হয়তো ২০৩৫ সালেও হতে পারে। সেটি ব্যর্থতা নয়; সেটিই হলো স্বচ্ছ গাণিতিক বাস্তবতা।
সৈয়দ আবুল বাশার: গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা