ব্যবহার উপযোগিতা ফিরে আসুক নগরের ফুটপাতে

নাগরিকদের নির্বিঘ্নে পথচলার সুবিধার্থে রাষ্ট্র ঢাকা শহরের মূল সড়কের পাশে সীমানা চিহ্নিত করে ফুটপাত নির্মাণ করেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ও স্বার্থান্বেষী মহলের দখল কার্যক্রমের কারণে নাগরিকরা ফুটপাতের সুবিধা ভোগ করতে পারছে না। ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও সেটা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

ফুটপাতে রিকশার স্ট্যান্ড, চায়ের দোকানসহ অস্থায়ী খাবারের দোকান, হকার, নির্মাণসামগ্রী রেখে ও অস্থায়ী শেড নির্মাণ করে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের দখলে চলে যাওয়ায় পথচারীরা ফুটপাতের বদলে রাস্তায় নেমে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে দুর্ঘটনা ছাড়াও রাস্তায় যানজটসহ নানা ধরনের বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছেন পথচারীরা। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগী পথচারীরা এবং বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ প্রিন্ট মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখির মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

শহরের নাগরিক হিসেবে আমিও একজন ভুক্তভোগী। আমার বাসা কলাবাগান এবং অফিস ধানমন্ডি ৩ নং রোডে। প্রতিদিন সকালে গ্রিন রোড দিয়ে হেঁটে অফিসে যাই এবং যাওয়ার সময় গ্রিন লাইফ হসপিটালের উল্টো পাশ থেকে শুরু করে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত প্রায় পুরোটা রাস্তার ফুটপাত দখলের কবলে দেখতে পাই। দূরত্ব অনুযায়ী বাসা থেকে অফিসে হেঁটে যেতে ১৫-১৬ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু ফুটপাতগুলো দখলের কারণে হাঁটার সময় ফুটপাতে বারবার বাধাগ্রস্ত হতে হয়, এতে সময় বেশি লেগে যায়। এছাড়া এ ফুটপাতে যখন মানুষ চা, নাশতা, সিগারেট খায় তখন তারা ফুটপাত দখল করে দাঁড়িয়ে সেগুলো সেবন করে এবং সেগুলোর উচ্ছিষ্ট ফুটপাতসহ রাস্তাঘাটে ফেলে পরিবেশ দূষণ করছে। যারা ধূমপান করছে তাদের ধূমপানের ধোঁয়ার কারণে পথচারীদের পথ চলায় বিঘ্ন ঘটছে। একদিন বৃষ্টির দিনে আমি গ্রিন রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন ফুটপাতে বসানো একটি চায়ের দোকানের ওপর টাঙানো ত্রিপাল থেকে আচমকা অনেকগুলো পানি এসে আমিসহ আরো অনেক পথচারীর ওপর পড়ে এবং আমিসহ সবার কাপড় নোংরা হয়ে যায়।

এসব ফুটপাতকে দখলমুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও নগরবাসীর কাছে তার সুফল প্রতীয়মান হয়নি। গত ২৭ এপ্রিল তারিখের ইনকিলাব পত্রিকা থেকে জানা যায় যে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ফুটপাত ও অবৈধ দখল উচ্ছেদে ১ হাজার ৬৩৯টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে স্থায়ী-অস্থায়ী হাজার হাজার অবৈধ অবকাঠামো ভেঙে উচ্ছেদ করা হয়েছে, কয়েক হাজার মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কয়েক কোটি টাকার জরিমানা ও শতাধিক মানুষকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও ৭৯টি এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চলালেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় পৌনে দুইশ কিলোমিটার ফুটপাতের মধ্যে শতাধিক কিলোমিটার এলাকা প্রভাবশালীদের দ্বারা অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সময়ে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবারই দখলমুক্ত করার কিছুদিন পরই আবার সেগুলো দখলে চলে যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের যোগসাজশে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই এর জন্য দায়ী বলে ভুক্তভোগীরা মনে করেন।

প্রায় ছয় বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের সভায় দখলমুক্ত করার বিষয়ে ২০টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছিল। সেসব সুপারিশমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হলে ফুটপাত দখলমুক্ত ও নাগরিকদের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব।

এরই মধ্যে ঢাকার ফুটপাত দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নামের তালিকা দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দখলদারদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. বজলুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বছর এ আদেশ দেন। স্বরাষ্ট্র সচিব অথবা স্থানীয় সরকার সচিবকে নামের তালিকা হলফনামা আকারে গত ১৩ মে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। এ আদেশের দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হলেও আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি।

মো. মুজাফফর ফয়সাল: অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড ক্যাম্পেইন অফিসার, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)

আরও