সম্মানিত প্যানেল আলোচকবৃন্দ, ভদ্র মহিলা ও মহোদয়গণ, আমাদের সবাইকে একত্র করার জন্য দৈনিক বণিক বার্তাকে ধন্যবাদ। সম্মানিত প্যানেল আলোচকরা ধন্যবাদ জানাই। তারা এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাই আমি মূলত জলবায়ু সহনশীলতার বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই।
বাংলাদেশের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু সহনশীলতার অর্থ হলো কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতি সুরক্ষিত রাখা এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিম্ন ভূমিবেষ্টিত বদ্বীপ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান, ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীলতা দেশটিকে বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকির প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে।
ছোট একটি ভূখণ্ডে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাসের কারণে এসব ঝুঁকি একই সঙ্গে খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে জমি ও নগরসেবার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, দারিদ্র্য আরো গভীর হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১০০ কোটি ডলার। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এসব পরিসংখ্যান আমাদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জলবায়ু সহনশীলতাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে কী অর্জন করা সম্ভব, বাংলাদেশ এরই মধ্যে তার প্রমাণ দিয়েছে। ১৯৭০ সালের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়জনিত প্রাণহানি শতগুণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এখন একটি জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও আমাদের একই ধরনের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
এ লক্ষ্য অর্জনে আমি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চাই। প্রথমত, সমন্বিত ও সহনশীল অবকাঠামো এবং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে। তৃতীয়ত, নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব বিনিয়োগ ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপান্তর করতে হবে।
প্রথমত, আমাদের সমন্বিত ও সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এডিবি এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে আগ্রহী। আমাদের বৃহত্তর উদ্যোগের আওতায় আগামী ২০ বছরে ৮ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের মূল বার্তা হলো অবকাঠামোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একটি ব্যবস্থার সঙ্গে অন্যটির সংযোগ ও নির্ভরশীলতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
সড়ক নির্মাণের সঙ্গে কার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের খালগুলো সচল রাখতে হবে, পয়ঃবর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষির জন্য প্রয়োজন উর্বর মাটি ও নিরবচ্ছিন্ন পানির সরবরাহ। অন্যদিকে নদী পুনরুদ্ধার করতে হলে দূষণের উৎসেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য নদী অববাহিকা, নগর অঞ্চল ও উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা ধরে রাখার ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
গত মে মাসে এডিবির প্রেসিডেন্টের কানাডা সফরের সময় এ উদ্যোগের অনুঘটক বিনিয়োগ হিসেবে ৫০০ কোটি ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমাদের চলমান উদ্যোগের একটি উদাহরণ হলো এডিবির ২৫ কোটি ডলারের ‘উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্প’। বিশ্বের ২২টি শহরে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প বন্যা ব্যবস্থাপনা, জলাশয় পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এ বিনিয়োগ দেখায়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার উদ্যোগ এবং পরিবেশগত সেবার উন্নয়ন কীভাবে পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে। আলোচনায় অনেকেই ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছেন। আমিও মনে করি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি অর্থায়ন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এ বাস্তবতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে হলে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এডিবি বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্থায়ন করতে প্রস্তুত। তবে শুধু সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলেই হবে না। এর সঙ্গে শক্তিশালী বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং গ্যাসের অপচয় ও সিস্টেম লস কমাতে হবে। এর ফলে একদিকে কার্বন নিঃসরণ কমবে, অন্যদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও শক্তিশালী হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি। বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সুস্পষ্ট নীতিমালা, নির্ভরযোগ্য অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের উপযোগী প্রকল্প প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো এবং প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে আরো বেশি মূলধন আসবে।
এ রূপান্তরে এডিবি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি। একই সঙ্গে গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি-সংক্রান্ত ২০ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
তৃতীয়ত, নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব বিনিয়োগ ও দৃশ্যমান ফলাফলে রূপান্তর করতে হবে। নীতিমালা প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন সম্ভব নয়।
এ লক্ষ্যে এডিবি ‘জলবায়ু সহনশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি’র প্রথম দুই উপকর্মসূচির আওতায় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সহায়তার জন্য ১০০ কোটি ডলার অনুমোদন করেছে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সক্ষম প্রতিষ্ঠান, যথাযথ প্রকল্প প্রস্তুতি, স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া এবং কার্যকর পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর।
নীতিমালা ও আইনের সুস্পষ্ট, পূর্বানুমানযোগ্য এবং ধারাবাহিক প্রয়োগ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরির পাশাপাশি পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনেও এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের নেতৃত্বাধীন ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ’-এর মাধ্যমে আমরা উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে এবং বিনিয়োগের উপযোগী প্রকল্প তৈরি করতে পারি। সরকারি ও সহজ শর্তের অর্থায়ন যেন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এ অর্থায়নকে বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
এডিবি বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তর উন্নয়ন উদ্যোগে ৫০০ কোটি ডলারের অনুঘটক বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করছে। অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে জলবায়ু সহনশীলতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরিসর বাড়াতে আমরা আগ্রহী।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে সীমিত সরকারি সম্পদ দিয়েও বৃহত্তর বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশ যখন কপ৩১ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন জলবায়ু অর্থায়ন সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার দাবি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে থাকতে হবে সুস্পষ্ট বিনিয়োগ অগ্রাধিকার, বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জনের পরিকল্পনা।
জলবায়ু কার্যক্রমের সাফল্য শুধু কর্মশালা বা সম্মেলনের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়, বরং তা পরিমাপ করতে হবে নির্মল বাতাস, বিশুদ্ধ পানি, উর্বর মাটি, নিরাপদ জনপদ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং অধিক উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে। এসব অর্জনই দেখাবে, জলবায়ু সহনশীলতার জন্য নেয়া উদ্যোগ মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পেরেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি কয়েক দশকের উন্নয়ন অগ্রগতি রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলার প্রশ্ন। এ লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সঠিক বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের একটি জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশটির সরকার, উন্নয়ন সহযোগী এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে এডিবি প্রস্তুত।
চিংফেং ঝাং: কান্ট্রি ডিরেক্টর, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ‘গ্রিন ডায়ালগ’-এ সম্মানিত অতিথির বক্তৃতায়]