বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস

প্রবীণদের দেখভালকে ‘লস প্রজেক্ট’ ভাবা কোনো প্রাজ্ঞ অর্থনৈতিক যুক্তি নয়

যখন একটি রাষ্ট্র বা পরিবার প্রবীণদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষায়িত অবকাঠামো থেকে কৃপণতা করে হাত গুটিয়ে নেয়, তখন অর্থনীতিতে কোনো সাশ্রয় ঘটে না; বরং তা বহুগুণ বড় আকারে ‘সুযোগ ব্যয়’ বা লুক্কায়িত লোকসান হিসেবে সমাজের ওপর গিয়ে পড়ে।

উন্নয়নশীল অর্থনীতির নীতিনির্ধারণী অলিন্দে ও আধুনিক করপোরেট মানসিকতায় প্রায় এক নীরব, নিষ্ঠুর হিসাবনিকাশ কাজ করে: জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বয়োবৃদ্ধদের পেছনে রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ কিংবা পারিবারিক সঞ্চয় ব্যয় করা মানে নিট আর্থিক লোকসান বা ‘লস প্রজেক্ট’। প্রচলিত নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক দর্শনে উৎপাদনশীলতাকে কেবল প্রত্যক্ষ শারীরিক শ্রম, তাৎক্ষণিক বাজারমূল্য এবং দৃশ্যমান উদ্বৃত্ত উৎপাদনের নিক্তিতে মাপা হয়। যেহেতু জীবনের শেষ ভাগে এসে একজন অশীতিপর প্রবীণ মানুষ সরাসরি কারখানায় পণ্য তৈরি করতে পারেন না বা মোট দেশজ উৎপাদনে দৃশ্যমান রাজস্ব যোগ করতে পারেন না, তাই তাদের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় অর্থ ব্যয়কে একশ্রেণীর বিশ্লেষক অনুৎপাদনশীল অপচয় হিসেবে দাগিয়ে দেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি কেবল চরম অমানবিকই নয়; স্বাস্থ্য অর্থনীতি, সামষ্টিক অর্থবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং আধুনিক জেরন্টোলজির প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলোর আলোকেও একটি মারাত্মক তাত্ত্বিক অজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক অন্ধত্ব।

প্রবীণরা বর্তমান অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখছেন না—এমন দাবি তথ্যগতভাবেও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আধুনিক জেরন্টোলজিক্যাল অর্থনীতি যাকে ‘সিলভার ইকোনমি’ বলে, তা দেখায় যে প্রবীণরা পরিবারে যে বিপুল পরিমাণ অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক সেবা প্রদান করেন, তা কোনো সনাতন জিডিপির খাতায় ওঠে না

অর্থনৈতিক বিচারে একজন মানুষের সমগ্র জীবনচক্রকে খণ্ডিত করে দেখার সুযোগ নেই। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ফ্রাঙ্কো মোদিলিয়ানির সুবিখ্যাত ‘লাইফ-সাইকেল হাইপোথিসিস’ বা জীবনচক্র তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবজীবন মূলত তিনটি পর্বের এক অখণ্ড প্রবাহ: শৈশবের প্রাথমিক পরনির্ভরশীলতা, যৌবনের উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সঞ্চয় এবং বার্ধক্যের উপযোগ ভোগ (মোদিলিয়ানি, ১৯৬৬)। আজকের যিনি অশীতিপর প্রবীণ নাগরিক, তিনি তার কর্মক্ষম জীবনের দীর্ঘ চার দশক ধরে রাষ্ট্রকে কর দিয়েছেন, ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণে ঘাম ঝরিয়েছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে দক্ষ করে তুলে বর্তমান সচল অর্থনীতির মূল ভিত্তি প্রস্তুত করেছেন। ফলে বার্ধক্যে এসে রাষ্ট্র বা পরিবারের কাছ থেকে তিনি যে সেবা ও যত্ন গ্রহণ করেন, তা কোনো অনুকম্পা বা দয়া নয়; বরং যৌবনে জমা দেয়া তারই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সঞ্চয় ও শ্রম বিনিয়োগের এক স্থগিত ও ন্যায্য প্রতিদান। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ বা সক্ষমতা তত্ত্ব এ অর্থনৈতিক দর্শনকে আরো মানবিক গভীরতা দেয়। সেন স্পষ্ট করেছেন যে একটি সভ্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চূড়ান্ত পরিমাপ নিছক মোট দেশজ উৎপাদনের স্ফীতি নয়; বরং ব্যক্তির মর্যাদাপূর্ণ, সুস্থ ও স্বস্তিদায়কভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা ও ‘সক্ষমতা’ নিশ্চিত করাই আসল উন্নয়ন (সেন, ১৯৯৯)। প্রবীণকে কেবল তার তাৎক্ষণিক শ্রমমূল্য দিয়ে বিচার করা মূলত মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের মৌলিক দর্শনকেই নির্মমভাবে অস্বীকার করা।

তাছাড়া প্রবীণরা বর্তমান অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখছেন না—এমন দাবি তথ্যগতভাবেও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আধুনিক জেরন্টোলজিক্যাল অর্থনীতি যাকে ‘সিলভার ইকোনমি’ বলে, তা দেখায় যে প্রবীণরা পরিবারে যে বিপুল পরিমাণ অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক সেবা প্রদান করেন, তা কোনো সনাতন জিডিপির খাতায় ওঠে না। ঘরে নাতি-নাতনিদের প্রাথমিক লালন-পালন, পারিবারিক নৈতিক অভিভাবকত্ব এবং সামগ্রিক গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনায় প্রবীণরা যে শ্রম দেন, তার ফলেই মধ্যবয়সী তরুণ দম্পতিরা নিশ্চিন্তে ঘরের বাইরে গিয়ে পূর্ণকালীন পেশাজীবনে নিজেদের শ্রম বিনিয়োগ করতে পারেন। এ অদৃশ্য সেবাকে মুদ্রায় রূপান্তর করলে দেখা যাবে, প্রবীণরা সমাজে এক বিশাল উৎপাদনশীল শ্রমশক্তির পথ সুগম রাখছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘হেলদি এজিং’ রূপরেখা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য ও কার্যকর সক্ষমতায় সরকারি বা পারিবারিক বিনিয়োগ প্রকারান্তরে গোটা সমাজের উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেই দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখে।

যখন একটি রাষ্ট্র বা পরিবার প্রবীণদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষায়িত অবকাঠামো থেকে কৃপণতা করে হাত গুটিয়ে নেয়, তখন অর্থনীতিতে কোনো সাশ্রয় ঘটে না; বরং তা বহুগুণ বড় আকারে ‘সুযোগ ব্যয়’ বা লুক্কায়িত লোকসান হিসেবে সমাজের ওপর গিয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার্স বা স্ট্রোকের মতো জটিল স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত ব্যাধির ক্ষেত্রে যখন ডেডিকেটেড ডে-কেয়ার বা বিশেষায়িত কেয়ার হোম থাকে না, তখন সেই জটিল পরিচর্যার ভার সরাসরি গিয়ে পড়ে পরিবারের ওপর। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার চরম অভাবে পরিবারের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কর্মক্ষম তরুণ সদস্যদের—বিশেষ করে নারীদের—উচ্চ শিক্ষা, ক্যারিয়ার বা চাকরি বিসর্জন দিয়ে ঘরে সার্বক্ষণিক অনানুষ্ঠানিক সেবাদানকারী হিসেবে আটকে থাকতে হয়। এতে জাতীয় অর্থনীতি থেকে প্রতিদিন হাজারো উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা স্থায়ীভাবে মুছে যায়। স্বাস্থ্য অর্থনীতির আন্তর্জাতিক মডেলগুলো নিশ্চিত করেছে যে ডিমেনশিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে বিজ্ঞানসম্মত প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় অর্থ ব্যয় না করার ফলে পারিবারিক শ্রমশক্তি নষ্ট হওয়ার যে পরোক্ষ সামাজিক ক্ষতি, তা সুচিকিৎসার প্রত্যক্ষ খরচের চেয়েও বহুগুণ বেশি (প্রিন্স ও অন্যান্য, ২০১৬)।

চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রবীণদের পেছনে অর্থ বাঁচানোর চেষ্টা এক আত্মঘাতী ট্র্যাজেডি তৈরি করে। বয়স হয়ে গেছে ভেবে তাদের প্রাথমিক রোগ নির্ণয় ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকে এড়িয়ে যাওয়া হয় এবং খিটখিটে আচরণ বা অস্থিরতা দমন করতে চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ছাড়াই কড়া ঘুমের ওষুধ বা ভুল রাসায়নিক সিডেটিভ দেয়া হয়। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে রোগীরা ক্ষতিকর বহুবিধ ওষুধের অপপ্রয়োগ, হঠাৎ পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা এবং ওষুধজনিত তীব্র বিষক্রিয়ার শিকার হন। পরবর্তী সময়ে এ অবহেলার খেসারত দিতে গিয়ে পরিবার ও রাষ্ট্রকে অ্যাকিউট কেয়ার, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের লাখ লাখ টাকার বিপর্যয়মূলক বিল পরিশোধে নিঃস্ব হতে হয় (তালুকদার ও সাহা, ২০২৫)। অর্থাৎ সময়মতো পরিমিত অর্থ দিয়ে বয়োবান্ধব বৈজ্ঞানিক সেবা নিশ্চিত না করার ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত বহুগুণ বেশি জরুরি আর্থিক ক্ষতি ডেকে আনে।

দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক জায়গা থেকেও এ উপযোগিতাবাদী চিন্তা সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরাজয়। জেরন্টোলজির পথিকৃৎ টম কিটউড তার যুগান্তকারী ‘পারসনহুড’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সত্তা তার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বা ব্যাংকের হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না; মানুষের প্রকৃত ব্যক্তিসত্তা টিকে থাকে পারস্পরিক উষ্ণ সম্পর্কের মধ্যে (কিটউড, ১৯৯৭)। একজন নাগরিককে কেবল তার অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার নিরিখে মূল্যায়ন করা একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়।

প্রবীণদের দেখভালকে ‘লস প্রজেক্ট’ মনে করা কোনো প্রাজ্ঞ অর্থনৈতিক যুক্তি নয়; এটি নীতিনির্ধারকদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব। একটি সুস্থ সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পারস্পরিক সংহতি ও অদৃশ্য সামাজিক চুক্তির ওপর। প্রবীণদের দীর্ঘমেয়াদি সেবা, মানসিক স্বস্তি ও জীবনের শেষ প্রান্তের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো অনুৎপাদনশীল লোকসান নয়; বরং তা একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানবিক সভ্যতার সবচেয়ে লাভজনক ও টেকসই সামাজিক বিনিয়োগ।

ইমদাদুল হক তালুকদার: মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

আরও