খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক

সুষ্ঠু নিবন্ধন বাস্তবায়ন করা গেলে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বাড়বে

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কী ধরনের খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত, তার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে অনানুষ্ঠানিক খাতের একটি বড় অংশকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।

নতুন ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, প্যাকেটজাত খাদ্য উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী ও নির্দিষ্ট শ্রেণীর আমদানিকারকদের নিবন্ধন নিতে হবে। রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবার বিক্রি করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও এর আওতায় এনেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। সংস্থাটির মতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনার এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উদ্যোগটি সময়োপযোগী।

দেশে ক্রমেই খাদ্য পরিবেশনকারী অবকাঠামোর আকার বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর মধ্যে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও চা-স্টলও আছে। ফার্স্ট ফুডের দোকান আছে প্রায় ৬৭ হাজার।

চাহিদা ও মানুষের নির্ভরতার কারণে এগুলোর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক ব্যবসা এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে রয়েছে। এসব ব্যবসার পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার না থাকায় একদিকে খাদ্যনিরাপত্তা তদারকি কঠিন হয়, অন্যদিকে অর্থনীতির একটি বড় অংশও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকে যায়। নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে হলে নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ, সাশ্রয়ী ও হয়রানিমুক্ত রাখার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কী ধরনের খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত, তার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে অনানুষ্ঠানিক খাতের একটি বড় অংশকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে। ব্যবসার ধরন ও পরিসর সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য থাকলে নীতি প্রণয়ন ও বাজার তদারকিও সহজ হবে। একই সঙ্গে ব্যবসাগুলো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে কর-রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও সরকারের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নিবন্ধনের উদ্দেশ্য যেন কেবল ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করা বা ভবিষ্যৎ রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি তৈরি করা না হয়। এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত খাদ্যনিরাপত্তা ও ভোক্তা সুরক্ষা। কোনো খাদ্যপণ্যে ভেজাল, দূষণ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট উৎপাদক, সরবরাহকারী বা বিক্রেতাকে দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন। নিবন্ধিত ব্যবসার তথ্যভাণ্ডার থাকলে এ কাজ অনেক বেশি কার্যকরভাবে করা সম্ভব। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার ওপর ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি চালানোও সহজ হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে? বিশেষ করে রাস্তার পাশে বা ছোট পরিসরে খাদ্য বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বড় প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। তাদের ওপর জটিল আবেদন প্রক্রিয়া, অতিরিক্ত কাগজপত্র, ফি কিংবা নিয়মিত দাপ্তরিক যোগাযোগের চাপ তৈরি হলে নিবন্ধন উৎসাহিত করার বদলে অনীহা সৃষ্টি হতে পারে। আরো উদ্বেগের বিষয়, তদারকির নামে যেন কোনো ব্যবসায়ী হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক চাপের শিকার না হন।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হলো দেশে ব্যবসার পরিবেশ এমনিতেই তুলনামূলক কঠিন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বেশি। তাই নিবন্ধন প্রক্রিয়া যেন আবার নতুন করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার নতুন ক্ষেত্র না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তাই ব্যবসার আকার, ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নিবন্ধন ও তদারকির ব্যবস্থা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও অস্থায়ী খাদ্য ব্যবসার জন্য সহজ শর্তে নিবন্ধনের সুযোগ দিতে হবে। যেসব শ্রেণীর ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রথমবার নিবন্ধনে কোনো ফি নেই, সেই সুবিধার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা দরকার। আর অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে যারা ডিজিটাল ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নন, তাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা কেন্দ্রের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।

নিবন্ধন কার্যক্রমকে সফল করতে ব্যবসায়ীদের কেবল নিয়মের আওতায় আনলেই হবে না, নিয়ম মানার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ, প্রস্তুত ও পরিবেশনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে। পরিদর্শন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে, যাতে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের বিবেচনানির্ভর আচরণের সুযোগ কমে এবং ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার না হন।

নতুন বিধানের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসার একটি বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, খাদ্য বিপণন ব্যবস্থার তদারকি জোরদার এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে ভবিষ্যতে কর-রাজস্ব আহরণের পরিসরও বাড়তে পারে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরনটির ওপর। নিবন্ধন হতে হবে সহজ, ব্যয় হতে হবে সামর্থ্যের মধ্যে এবং তদারকি হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। খাদ্যনিরাপত্তার নামে যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন হয়রানির দ্বার না খোলে, সেটি নিশ্চিত করেই এ উদ্যোগ এগিয়ে নেয়া হোক।

আরও