১৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে ‘তিন তারকা’ এয়ারলাইনস বিমান

অদক্ষতা ও বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তন বিমানকে এগোতে দিচ্ছে না

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈশ্বিক রÅাংকিং সংস্থা স্কাইট্র্যাক্স বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে ‘তিন তারকা’ রেটিং দিয়েছে।

এ সংস্থার রÅাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ১০০ এয়ারলাইনসের তালিকাতেও নেই বিমান। দক্ষিণ এশিয়ায়ও এয়ারলাইনসটির অবস্থান নবম। ব্যাপক সরকারি অবকাঠামোগত সুবিধা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একচেটিয়া অধিকার এবং বহরে বোয়িং ৭৮৭-এর মতো আধুনিক উড়োজাহাজ রয়েছে। তবু সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহারের অভাবে, ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন, অপ্রস্তুত ব্যবস্থাপনা আর বহরের অদক্ষ সমন্বয় বিমান এগোতে পারছে না।

একই সম্পদ বা তার চেয়ে কম বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর এয়ারলাইনস ‘ফোর স্টার’ স্ট্যাটাস পেলে আমাদের এ সিদ্ধান্তেই আসতে হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্রুনাইয়ে মাত্র ১২ উড়োজাহাজ নিয়ে রয়্যাল ব্রুনাই এয়ারলাইনস ‘ফোর স্টার’ রেটিং ধরে রেখেছে। তাদের সম্পদ বিমান এয়ারলাইনসের অর্ধেক। অথচ ২০২৫ অর্থবছরে এয়ারলাইনসটি ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা লাভ করেছে। একই সময়ে বিমানের লাভ ৭৮৫ কোটি টাকা। কিন্তু এ লাভের তুলনায় দেনা বেশি হওয়ায় বিমানকে লাভজনক বলা যাচ্ছে না। ব্যাংকক এয়ারওয়েজের বহরে ২৩ উড়োজাহাজ, সম্পদও বিমানের প্রায় সমান; তবু এটি ‘ফোর স্টার’ এয়ারলাইনস। লুক্সেমবার্গের লাক্সএয়ার একই পরিমাণ সম্পদ নিয়ে ‘ফোর-স্টার’ রেটিং বজায় রাখছে। পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সুসংগত রুট পরিকল্পনা, দক্ষ পরিচালনা আর যাত্রীসেবার প্রতি অঙ্গীকার এগুলোই যে সফলতার মূল তা বোঝায় এয়ারলাইনসগুলো সফল হচ্ছে। বিমানের কাছেও সব আছে, নেই পেশাদারত্বের ধারাবাহিকতা।

বিমান এয়ারলাইনসের প্রকৃত সমস্যার অনেক কারণ চিহ্নিত করেছে বণিক বার্তার প্রতিবেদন। প্রথমেই আসে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। বিমান গত অর্থবছর লাভ দেখালেও এর দেনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বর্তমানে বিমানের দেনা ১৩ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য ঋণ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও পদ্মা অয়েলের কাছে বকেয়া রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। তাই বিমানের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ বিশাল দেনা পরিশোধ করা। বর্তমান পরিচালন ব্যয়, ক্যাপাসিটির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করতে না পারা এবং অদক্ষ রুট পরিকল্পনা নিয়মিত আয়প্রবাহ সংকুচিত করছে। বিমান একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। কিন্তু সরকারি মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের কারণে এটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক কোম্পানির মতো স্বাধীন নয়। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। বিশ্বের বড় এয়ারলাইনসগুলো অনেক বেশি স্বাধীনভাবে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দ্রুত বাজার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু বিমান করতে পারে না।

আমলাতান্ত্রিক ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতাও বিমানকে পিছিয়ে রাখার বড় কারণ। গত পাঁচ দশকে বিমান বাংলাদেশে ৪৪ জন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এসেছেন। সরকারি মালিকানা থাকায় বিমানে আমলানির্ভর ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এয়ারলাইনসটিতে বাণিজ্যিক মনোভাবের চেয়ে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক মানসিকতা বেশি। বণিক বার্তার প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, স্থায়ী ও দক্ষ পেশাদারদের বদলে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বারবার শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় না। প্রতিবারই নতুন দিকনির্দেশনা ও আবার প্রথম থেকে শুরু করার কারণে অসম্পূর্ণ প্রকল্প ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ব্যতীত বিমানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

বিমানের বহরে আছে ১৯টি উড়োজাহাজ, যার মধ্যে রয়েছে আধুনিক বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৭৭ সিরিজের বিমান। এ বিমানগুলো আন্তর্জাতিক দীর্ঘ রুটের জন্য ডিজাইন করা। কিন্তু বিমান এ উড়োজাহাজগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করতে পারছে না। কারণ রুট নেটওয়ার্ক সংগঠিত নয়। আসন খালি থাকে অনেক ফ্লাইটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের কার্যকর ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ ব্যবস্থা নেই। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে একটি কেন্দ্রীয় বিমানবন্দরকে ঘিরে অন্যান্য রুট সংযুক্ত থাকায় যাত্রীরা সহজে ফ্লাইট পরিবর্তন করতে পারেন। ঢাকার বিমানবন্দরে এ ধরনের কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। পরিচালন ব্যয় আরেক বোঝা। একই ধরনের এয়ারলাইনসের তুলনায় বিমান বেশি খরচ করে জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণে। এ ব্যয় সম্পূর্ণ দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবেই ঘটে।

বিমান সেবার মান উন্নত করলে এভিয়েশন বাজারকে সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করতে পারে। যেখানে প্রবাসী বাঙালি বেশি সেখানে নতুন রুট খুলতে পারে। কিন্তু এজন্য স্পষ্ট কৌশল ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন দরকার, যা বর্তমান বিমানের নেতৃত্ব কাঠামোতে সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশী বিমানের জন্য প্রস্তুত বাজার। তারা বিভিন্ন কারণে দুর্ভোগ ছাড়া স্বদেশে ফিরতে চায়। কিন্তু বিমানের ডিজিটালাইজেশন ও গ্রাউন্ড সার্ভিস দুর্বলতা, টিকিট বুকিং ব্যবস্থায় অনিয়ম, বিলম্বিত লাগেজ ডেলিভারি, ফ্লাইট শিডিউল বিপর্যয় ও ঘন ঘন ফ্লাইট বাতিলের অভিযোগ বেশি। আবার অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন লাভজনক রুটে পাঁচ তারকা এয়ারলাইনস থেকেও বেশি ভাড়া নির্ধারণ করায় বিমানের প্রতি যাত্রীদের অসন্তোষ অনেক। গ্রাহকসেবায় অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব এয়ারলাইনস ব্যবসায় রিফান্ড প্রক্রিয়া, সময়মতো তথ্য জানানো এবং কাস্টমার কেয়ার সাপোর্টের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। এসব কারণে সেবার মান নিয়ে সন্দেহ থাকায় যাত্রীরা অন্য এয়ারলাইনস বেছে নেয়।

বর্তমান সংকটে বিমানের আয়প্রবাহ বাড়াতে অপ্রস্তুত নেতৃত্ব স্থিতিশীল করা জরুরি। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ব্যবস্থাপক নিয়োগ করতে হবে। আগামী পাঁচ বছর বিমানের নেতৃত্বে বদল আনা যাবে না। এ নেতৃত্বের অধীনে একটি সঠিক ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ কাঠামো তৈরি করতে হবে। তাতে বড় উড়োজাহাজ সবসময় পূর্ণ থাকবে। আঞ্চলিক রুটে ছোট উড়োজাহাজগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। বিমানের ওপর বড় দেনা রয়েছে। এজন্য নিট আয় বাড়ানোর সুযোগ খোঁজা জরুরি। এটা সম্ভব পরিচালন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে। প্রতিটি রুটের লাভজনকতা বিশ্লেষণ করে অপ্রয়োজনীয় ফ্লাইট কমাতে হবে। এছাড়া প্রবাসী বাজারকে লক্ষ্য করে জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো শহরগুলোয় নতুন রুট খুলে সরাসরি ফ্লাইট সংযোগ স্থাপন করলে প্রচুর যাত্রী মিলবে।

দেনা শোধের পাশাপাশি বিমানের বড় চ্যালেঞ্জ সেবার মান উন্নত করা। স্কাইট্র্যাক্স যেসব দিক নিয়ে সমালোচনা করেছে, অর্থাৎ বিমানবন্দরের সেবা, কেবিন পরিচ্ছন্নতা, কর্মীদের আচরণ, খাবারের মান ও ডিজিটালাইজেশন; এগুলোতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উন্নতি করতে হবে। বিমানের কাছে সব আছে; পুঁজি, বিমান, বাজার। শুধু নেই দক্ষ ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা। এ ঘাটতি পূরণ করতে পারলে বিমান শুধু আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি শক্তিশালী এয়ারলাইনস হয়ে উঠতে পারে।

আরও