বাংলাদেশ-ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জুলাইয়ের মধ্যভাগ থেকে দুই দেশ তাদের নিজস্ব মুদ্রা টাকা ও রুপিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাওনাগুলো মেটাবে। এর ফলে দুপক্ষের নীতিনির্ধারকদের মতে, রিজার্ভ মুদ্রা মার্কিন ডলারের ওপর চাপ কমবে।
বাংলাদেশ এক বছর থেকে বড় রকমের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন থেকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে চলতি হিসাবে ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই বাংলাদেশকে আমদানির ক্ষেত্রে রক্ষণশীল অবস্থান নিতে হয়েছে।
কিন্তু আমদানি কমানো সমস্যার কোনো সমাধান নয়। বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি বাড়াতে হলে বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে বেশি করে বিদেশ থেকে আয় করতে হবে। আর আয়ের উৎস হলো আমাদের রফতানি আয়, আমাদের দেশের মানুষ যারা বিদেশে আছে তাদের দ্বারা দেশে আয় প্রেরণ, অন্য উৎস হলো বৈদেশিক বিনিয়োগ।
বৈদেশিক ঋণ থেকে প্রাপ্য অর্থ থেকেও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি বাড়তে পারে। তবে সবকিছু বিবেচনায় নিলেও যে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল বড় করতে পারবে তা মনে হয় না। এর মূল কারণ হলো, গত দুই বছরে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে আমাদের দেনা বেড়ে গেছে। বৈদেশিক ঋণ ফেরত দিতে হয় রিজার্ভ মুদ্রায়, সেই মুদ্রা হতে পারে ইউএস ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরোপের কমন মুদ্রা ইউরো, জাপানি মুদ্রা ইয়েনে বা চাইনিজ মুদ্রা ইউয়ানে। আগে ১ ডলার পাওয়া যেত ৮৬ টাকায়, এখন সরকারকে সেই ডলার ১০৭ টাকায় কিনে ঋণ শোধ করতে হবে।
আমাদের বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত এরই মধ্যে আমাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন এখানেই। বাংলাদেশের জন্য ডলার সংকট যতটা প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে, ভারতের জন্য তেমনটা নয়।
বাংলাদেশ ডলার সংকট কাটানোর কৌশল হিসেবে ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য করতে সম্মত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ভারত কেন টাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করবে। এর মোটামুটি উত্তর হলো, ভারত তার মুদ্রা রুপিকে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে চায়। ভারতীয় মুদ্রা রুপি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো রিজার্ভ মুদ্রা নয়। তবে ভারত চাইছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ মুদ্রার ব্যবহার বাড়লে ভারতীয় মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। হয়তো একদিন ভারত তার রিজার্ভ মুদ্রার মান দিতে চেষ্টা শুরু করবে।
টাকা-রুপিতে বাণিজ্য করতে দুই দেশ সম্মত হলেও এ দুই মুদ্রার ব্যবহার সীমিত থাকবে বলেই আমাদের ধারণা। বাংলাদেশ ভারত থেকে রুপিতে পণ্য কিনতে রুপি কোথায় পাবে? পাওয়ার একমাত্র উৎস হলো বাংলাদেশের ভারতে রফতানির মূল্য, যা বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। রুপির অন্য উৎস হলো, যদি ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দেয় রুপিতে এবং বাংলাদেশ যদি রুপিতে ঋণ নিতে রাজি হয়। এর পরও বাংলাদেশের হিসাবে রুপির প্রবাহ অনেক কম থাকবে।
অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে বছরে ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ভারত যদি এ রফতানির বিপরীতে বাংলাদেশী মুদ্রা টাকাকে নিতে সম্মত হয়, তাহলে ভারতের বৈদেশিক উৎস থেকে আয়ে ১১ বিলিয়ন সমপরিমাণের টাকা যোগ হবে। এ অংক বিশাল। ভারত কি বাংলাদেশের এত টাকা ধারণ করতে রাজি হবে? সংগত কারণেই রাজি না হওয়ারই কথা। কারণ তাদের কাছে টাকার ব্যবহার কোথায়? সেই একমাত্র বাংলাদেশের বাজারে। এর অর্থ হলো, ভারত যদি তার হিসাবে থাকা টাকাকে বেশি করে ব্যবহার করতে চায় তাহলে বাংলাদেশ থেকে তাকে বেশি করে পণ্য আমদানি করতে হবে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে। এ অনুকূলতা ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। সে অবস্থায় ভারত আমাদের আমদানির বিপরীতে পুরো পাওনা টাকায় গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত ওই বাণিজ্যে পাওনার বিপরীতে বাংলাদেশকে একটা বড় অংশ ডলারেই পরিশোধ করতে হবে।
তাহলে মোদ্দা কথা দাঁড়ায়, টাকা-রুপিতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লেনদেন হতে পারবে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের। বাকিটা অন্য রিজার্ভ মুদ্রায় বাংলাদেশকে তৈরি থাকতে হবে ভারতকে পরিশোধ করার জন্য।
বাণিজ্যের ভারসাম্য যার অনুকূলে থাকবে সে দেশের হাতে অন্য দেশের মুদ্রা বেশি জমা হতে থাকবে। সেই জমায়িত মুদ্রার ব্যবহার চাই। সেই দেশ যদি ওই মুদ্রা আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহার করতে না পারে তাহলে একপর্যায়ে সেই মুদ্রা আর গ্রহণ করবে না। যেমনটি হয়েছে ভারত-রাশিয়ার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। ভারত যেহেতু রাশিয়া থেকে বেশি অর্থের পণ্য (এক্ষেত্রে তেল) কেনে, সেজন্য অনেক বেশি ভারতীয় মুদ্রা রাশিয়ার হিসাবে জমা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ভারতীয় রুপি ভারত ছাড়া অন্য দেশের পণ্য কেনার জন্য রাশিয়া ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে না।
ভারতীয় মুদ্রা স্বীকৃত রিজার্ভ কারেন্সি হলে এ সমস্যা হতো না। ভারত যখন রুপির বস্তা নিয়ে বসে থাকল তখন রাশিয়া ভারতীয় মুদ্রায় তেল বিক্রিতে অস্বীকার করল। ফলে ভারত অন্য রিজার্ভ মুদ্রা চাইনিজ ইউয়ানে রাশিয়াকে পরিশোধ করতে বাধ্য হলো। একই অবস্থা বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও হতে পারে। ভারত যেহেতু বাংলাদেশের কাছে বেশি মূল্যের পণ্য বেচে, তারাও একপর্যায়ে বাংলাদেশের মুদ্রা টাকাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করবে। তারা তখন চাইবে বাংলাদেশ তাদের হয় ডলার বা ইউয়ানে পরিশোধ করুক।
টাকা-রুপিতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্য সমস্যা হলো, এ দুই মুদ্রার মধ্যে বিনিময় হার কী হবে? এ কারণেও অন্য রিজার্ভ মুদ্রাকে রেফারেন্স কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্য রেফার্ড রিজার্ভ মুদ্রা হবে ইউএস ডলার। ডলারের বিপরীতে এ দুই মুদ্রার ওঠানামার ভিত্তিতে টাকা-রুপির বিনিময় হার নির্ধারণ হবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাবে, এ দুই মুদ্রা পূর্ণাঙ্গভাবে বাজার ভিত্তিতে ডলারের বিপরীতে বিনিময়যোগ্য কিনা? বিনিময় হার যদি দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে দেয় সেটা বাজারভিত্তিক বিনিময়যোগ্য বলা যাবে না। বিনিময়টা হতে হবে বাজারের চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে। সুতরাং টাকা-রুপিতে বাণিজ্য করার আগে দেখতে হবে কোনো দেশ কৃত্রিমভাবে তাদের মুদ্রার মান ধরে রাখছে কিনা।
আবু আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক