ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকি বা রিস্ক–বেজড সুপারভিশন আধুনিক ব্যাংক তদারকির একটি মৌলিক পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের গুরুত্ব কোনো নির্দিষ্ট আইন, বিধান বা সার্কুলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত রয়েছে তদারকির দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন ও কাজের ধরনে পরিবর্তনের মধ্যে। আগে ব্যাংক তদারকি বলতে সাধারণত বোঝানো হতো নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিদর্শন, নিয়ম মানা হয়েছে কিনা— তা যাচাই করা এবং কিছু পূর্বনির্ধারিত আর্থিক অনুপাত ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করা। এ পদ্ধতিতে প্রায় সব ব্যাংককে একই চোখে দেখা হতো, তাদের ঝুঁকি প্রোফাইল বা ব্যবসায়িক জটিলতা যা-ই হোক না কেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সব ব্যাংকের ঝুঁকি এক নয় এবং সব ঝুঁকির প্রভাবও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর সমানভাবে পড়ে না। ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকি এ বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেয় এবং তদারকির নজর সেসব ক্ষেত্রের দিকে সরিয়ে নেয়, যেখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি এবং সম্ভাব্য ক্ষতির প্রভাব বড় ও বিস্তৃত হতে পারে।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির সবচেয়ে বড় সুফল হলো তদারকির কার্যকারিতা, দক্ষতা ও প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি। এ পদ্ধতিতে তদারকি সম্পদ, সময় এবং জনবল নির্বিচারে ব্যবহার করা হয় না। বরং ব্যাংক, ব্যবসায়িক খাত বা নির্দিষ্ট কার্যক্রমের ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে তদারকির গভীরতা ও ঘনত্ব নির্ধারণ করা হয়। ফলে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেও বড় ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়। তদারকি হয়ে ওঠে লক্ষ্যভিত্তিক, ঝুঁকিনির্ভর ও অগ্রাধিকারভিত্তিক। একই সঙ্গে কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক ও কার্যক্রমের ওপর অপ্রয়োজনীয় তদারকি চাপ কমে আসে, যা পুরো ব্যবস্থাকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
এ পদ্ধতির আরেকটি বড় সুফল হলো সমস্যা আগেভাগে শনাক্ত করার সক্ষমতা। কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকিতে অনেক সময় সমস্যা তখনই ধরা পড়ে, যখন ক্ষতি এরই মধ্যে হয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। তখন তদারকির ভূমিকা হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীল, অর্থাৎ ঘটনার পরে ব্যবস্থা নেয়া। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে তদারককারীরা কেবল অতীতের তথ্যের দিকে তাকান না, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির দিকেও নজর দেন। তারা আর্থিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করেন, ঝুঁকির ঘনত্ব ও দিক পরিবর্তন লক্ষ করেন এবং দুর্বল সংকেত চিহ্নিত করেন। প্রয়োজন হলে তারা আগাম তদারকি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ফলে বড় ধরনের সংকট প্রতিরোধ করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা পায়।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন। এ পদ্ধতিতে তদারকি কেবল সংখ্যাভিত্তিক অনুপাত বা রিপোর্টে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং পরিচালনা পর্ষদের কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শক্তি এবং ঝুঁকি সংস্কৃতির বাস্তব প্রয়োগ গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি হয় যেন তারা শুধু নীতিমালা প্রণয়ন বা কাগজে-কলমে দায়িত্ব পালন না করে, বরং বাস্তব সিদ্ধান্ত ও আচরণের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে।
এ তদারকি পদ্ধতি ব্যাংকগুলোকেও ধীরে ধীরে উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকে ঠেলে দেয়। ব্যাংকগুলো বুঝতে শুরু করে যে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ যত শক্তিশালী হবে, তদারকির চাপ তত কম হবে। এর ফলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, তথ্যের মান ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করে, যা আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির কেন্দ্রে রয়েছে সুপারভাইজরি জাজমেন্ট বা তদারকি বিচার। এটি তদারককারীদের পেশাদার, অভিজ্ঞতানির্ভর ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে তারা ব্যাংকের আর্থিক তথ্যের পাশাপাশি অ-আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করেন, শাসন ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মান বিচার করেন এবং কখন, কীভাবে ও কতটা মাত্রায় হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত মতামত বা অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নয়। সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে এটি একটি গঠিত, নথিভুক্ত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যেখানে তথ্য, গুণগত বিশ্লেষণ, পেশাদার অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ধারণা একসঙ্গে কাজ করে।
এ ধারণার জন্ম হয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। একসময় ধারণা ছিল, ব্যাংক নিয়ম মেনে চললেই নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ব্যাংক নিয়ম মেনেও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা, অকার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভুল প্রণোদনা কাঠামোই ছিল এসব সমস্যার মূল কারণ। এসব বিষয় অনেক সময় নিয়ন্ত্রক অনুপাত, নিয়মিত রিপোর্ট বা অডিট প্রতিবেদনে ধরা পড়ে না। তাই তদারকির জন্য কেবল নিয়মভিত্তিক পরীক্ষা নয়, বরং পেশাদার বিচার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তবে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুপারভাইজরি জাজমেন্টের সঠিক, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগ। বিচার যদি ব্যক্তিনির্ভর হয়ে যায়, তবে একই ধরনের ব্যাংকের জন্য ভিন্ন সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে। এতে ব্যাংক খাতে বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। তাই সুপারভাইজরি জাজমেন্টকে ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলাই ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এই চ্যালেঞ্জ আরো গভীরভাবে অনুভূত হয়। ব্যাংক খাত অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কিছু ব্যাংক আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগতভাবে শক্তিশালী, আবার কিছু ব্যাংক কাঠামোগতভাবে দুর্বল। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মান এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে ডাটার মান দুর্বল এবং রিপোর্টিং ব্যবস্থা খণ্ডিত। তদারককারীর সংখ্যা ও দক্ষতা সীমিত। সাইবার ঝুঁকি, ডিজিটাল ব্যাংকিং বা জটিল ঝুঁকি মডেলের মতো ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা ঝুঁকি মূল্যায়নকে জটিল করে তোলে এবং বিচার প্রয়োগে ভুলের সম্ভাবনা বাড়ায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো পক্ষপাতের ঝুঁকি। নিয়মিত যোগাযোগ ও দীর্ঘ সময় ধরে তদারকির কারণে তদারককারী ও ব্যাংকের মধ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে। এতে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। লিড সুপারভাইজার ব্যবস্থা যোগাযোগ সহজ করে, যদি একজন তদারককারীর ওপর বেশি নির্ভর করা হয়, তাহলে ব্যক্তিগত প্রভাব বা পক্ষপাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দায়িত্ব রোটেশন এবং শক্ত অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা না থাকলে এ ঝুঁকি আরো বাড়ে। ফলে তদারকির নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তথ্যের মানও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভুল, অসম্পূর্ণ বা দেরিতে পাওয়া তথ্য ঝুঁকি মূল্যায়নকে দুর্বল করে। এতে তদারককারী হয় অযথা কঠোর হন, নয়তো ভুল নিরাপত্তাবোধে ভোগেন। উভয় ক্ষেত্রেই তদারকির উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাই তথ্যের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দুর্বল হলে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কার্যকর হয় না।
বাংলাদেশের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে রূপান্তর একটি সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে এ রূপান্তরের সফলতা অনেকাংশে প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে।
প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। পুরনো চেকলিস্টভিত্তিক চিন্তা দিয়ে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব নয়। তদারককারীদের ফলাফলভিত্তিক চিন্তা, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদারককারীদের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, তথ্য ব্যাখ্যা, যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়ার দক্ষতা বাড়াতে হবে। শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান যথেষ্ট নয়। বিচারক্ষমতা, পেশাদার আত্মবিশ্বাস এবং নৈতিক দৃঢ়তাও সমানভাবে প্রয়োজন। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাস্তব ঘটনাভিত্তিক বিশ্লেষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে এ সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তদারকি সিদ্ধান্তের মান ও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে সহকর্মী পর্যালোচনা ও সামঞ্জস্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে সিদ্ধান্তের মান, ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে।
একই সঙ্গে ব্যাংক খাতকেও প্রস্তুত হতে হবে। অনেক ব্যাংকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি এখনো দুর্বল। কমপ্লায়েন্সকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিকল্প মনে করা হয়। পরিচালনা পর্ষদ অনেক সময় ঝুঁকির প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝে না। তথ্য সময়মতো ও নির্ভুলভাবে আসে না। ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিতে এসব দুর্বলতা আর আড়ালে থাকবে না; বরং আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য রূপান্তর। সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে এটি ঝুঁকি আগে শনাক্ত করবে, শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। ভুলভাবে প্রয়োগ হলে অসংগত সিদ্ধান্ত, আস্থাহীনতা ও তদারকির বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পাবে। সমস্যা সুপারভাইজরি জাজমেন্ট নয়; সমস্যা হলো অগোছালো ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জাজমেন্ট। শৃঙ্খলাবদ্ধ, নথিভুক্ত ও ধারাবাহিক বিচারই ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকির প্রকৃত শক্তি এবং এ শক্তির ওপরই ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে।
শাহ মো. আহসান হাবীব: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)