অভিমত

খেলার মাঠের অধিকার নাগরিক অধিকার

‘খেলার মাঠ’ এক জীবন্ত সত্তা। মানুষের প্রতিদিনের ক্রীড়া, কসরত কী যত্নেই খেলার মাঠ ‘খেলার মাঠ’ হিসেবে জীবন্ত থাকে! মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী এ খেলার মাঠের গুরুত্ব নিয়ে আলাদা আলাপের দরকার আছে কি? উনিশ শতকে উন্নয়ন মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রেডরিক ফ্রোবেল শিশুদের মনঃসামাজিক বিকাশ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ‘খেলার মাঠের’ গুরুত্ব তুলে ধরেন। ২০২২ সালের ১১ মে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার বিতরণ

খেলার মাঠএক জীবন্ত সত্তা। মানুষের প্রতিদিনের ক্রীড়া, কসরত কী যত্নেই খেলার মাঠখেলার মাঠহিসেবে জীবন্ত থাকে! মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী খেলার মাঠের গুরুত্ব নিয়ে আলাদা আলাপের দরকার আছে কি? উনিশ শতকে উন্নয়ন মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রেডরিক ফ্রোবেল শিশুদের মনঃসামাজিক বিকাশ সুস্বাস্থ্যের জন্যখেলার মাঠেরগুরুত্ব তুলে ধরেন। ২০২২ সালের ১১ মে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শিশুদের মানসিক শারীরিক বিকাশের জন্য প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকার যেখানেই খালি জায়গা পাচ্ছে সেখানেই খেলার মাঠ করে দিচ্ছে। দেশ-দুনিয়াজুড়ে সবাই খেলার মাঠের গুরুত্ব বুঝলেও কিছু মানুষ প্রকল্প বাংলাদেশের সব খেলার মাঠ চুরমার করে দিচ্ছে। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দখল কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে আমাদের স্মৃতিময় খেলার মাঠগুলো আজ বিপদে। খেলার মাঠ বাঁচাতে দেশজুড়ে আজ লড়ছে মানুষ। যদিও খেলার মাঠ রক্ষায় জনআন্দোলন নতুন ঘটনা নয়। ১৯০৬ সালে কানাডার নোভা স্কশিয়াতে গড়ে ওঠা খেলার মাঠ রক্ষা আন্দোলন কিংবা বাংলাদেশের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলন এক গর্বিত উদাহরণ। বলাইশিমূল মাঠ রক্ষায় আজ জাগছে আরেক জনআন্দোলন। নেত্রকোনার কেন্দুয়ার শতবর্ষী মাঠের ঐতিহ্য বিনষ্ট করে গড়ে তোলা হয়েছে ভূমিহীন গরিব মানুষের জন্য সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প। চলতি আলাপখানি বলাইশিমূল মাঠ রক্ষার আন্দোলনে একাত্ম হয়ে দেশের সব খেলার মাঠ সুরক্ষার দাবি তুলছে।

বলাইশিমূল মাঠ, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা: নেত্রকোনার কেন্দুয়ার বলাইশিমূল ইউনিয়নে এক শতবর্ষী খেলার মাঠের নাম বলাইশিমূল মাঠ। ওই মাঠে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ১০০টি গৃহ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প গৃহীত হয়। বলাইশিমূল মৌজায় ৮৫ একর খাসজমির ভেতর আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য ১০ একর জমি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন খেলার মাঠের একর ৮০ শতাংশ ভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করছে। শুরু থেকেই খেলার মাঠ রক্ষায় এলাকাবাসী আন্দোলনে নামে এবং স্থানীয় প্রশাসন এলাকাবাসীর দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে ২৩টি ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করে। ২০২২ সালের ১২ আগস্ট রাতে বলাইশিমূল মাঠে নির্মাণাধীন আশ্রয়ণ প্রকল্পের নম্বর ঘরে আগুন লাগে। পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আন্দোলনকারীদের হুমকি দেন। নির্মাণকাজ বন্ধ না হওয়ায় আন্দোলনকারীদের পক্ষে হাবিবুর রহমান মণ্ডলসহ আটজন বাদী হয়ে ২০২২ সালের ৩০ মে জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আসামি করে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা বিচারাধীন থাকলেও প্রশাসন পুলিশি পাহারায় নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে। ২০২২ সালের জুন রাতে নির্মাণাধীন ঘরের গাঁথুনি কারা যেন ভেঙে দেয়। জুন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী বাদী হয়ে বলাইশিমূলের ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় বলাইশিমূল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর তালুকদার নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য হায়দার আলী তালুকদারেক গ্রেফতার করা হয়, বর্তমানে তারা জামিনে আছেন। মাঠরক্ষা গণকমিটির আহ্বায়ক আবুল কালাম আল আজাদ, আবদুল আওয়াল মাস্টার, মামুনুর রহমান খান হলিসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাই বলাইশিমূল মাঠ রক্ষায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন হয়। ১২ জুলাই কেন্দুয়ায় সহস্র মানুষ মানববন্ধন বিক্ষোভ মিছিল করে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ আগস্ট হাইকোর্ট বলাইশিমূল মাঠে নির্মাণকাজের ওপর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু খেলার মাঠের শ্রেণী জোর করে পরিবর্তন করে এখন এটিকেকান্দা জমিহিসেবে দেখানো হচ্ছে। সাংবাদিককে মামলার হুমকি দেয়ায় কেন্দুয়ার ইউএনওকে সতর্ক করেছেন জেলা প্রশাসক। ১৯ আগস্ট বলাইশিমূল ইউনিয়নের ২৮ গ্রামের মানুষ এক গণবৈঠকে কেন্দুয়ার ইউএনও মাহমুদা বেগমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে, ২৪ আগস্ট তাকে মদনে বদলি করা হয়। পরে চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়। বলাইশিমূল ঈদগাহ ময়দানে মাঠরক্ষা গণকমিটি সেপ্টেম্বর এক সমাবেশের আয়োজন করে। তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষাকর্মী, পরিবেশবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, মানবাধিকারকর্মীরা এতে সংহতি জানান।

দেশজুড়ে মাঠ রক্ষা আন্দোলন: ঢাকার তেঁতুলতলা মাঠ, ধূপখোলা বকশিবাজার মাঠ, লক্ষ্মীপুরের মান্দারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ, রাঙামাটির লংগদুর বাইট্টাপাড়া মাঠ, সিলেটের এমসি কলেজ মাঠ, সিরাজগঞ্জের হলদিঘর মাঠ, নারায়ণগঞ্জের আলিগঞ্জ পঞ্চমীঘাট মাঠ, সুনামগঞ্জের বড়গোপটিলা মাঠ, রাজশাহীর নামোভদ্রা মাঠ, নীলফামারীর ভেড়ভেড়ী মাঠ, ঝালকাঠির তারুলী মাঠ, ফেনীর শমসেরগাজী দীঘি মাঠ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা স্কুল মাঠ, কক্সবাজারের শামলাপুর মাঠ, দিনাজপুরের চাঁদপাড়া মাঠ, খুলনার আইচগাতি-দেয়াড়া অগ্রদূত মাঠ, নাটোরের বিয়াঘাট মাঠ, বরিশালের কাউনিয়া স্কুল মাঠ কিংবা পটুয়াখালীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ রক্ষায় তৈরি হয়েছে জনআন্দোলন। শিশু-কিশোর-যুব, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকাবাসীসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ মাঠ রক্ষার আন্দোলনে শামিল হচ্ছে। শারীরিক মানসিকভাবে সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে উন্মুক্ত পাবলিক মাঠের কোনো বিকল্প নেই। আর তাই মাঠ রক্ষায় জাগছে দেশ। 

কী আছে আইনে?

খেলার মাঠ উন্মুক্ত স্থান সুরক্ষায় দেশে একটি আইন আছে।মহানগরী, বিভাগীয় শহর জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ বেশ দীর্ঘ নামের এই আইনটি কার্যকরেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। আইন বলা হয়েছে, ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাদার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাইবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনভাবে ব্যবহার করা যাইবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনভাবে হস্তান্তর করা যাইবে না।কিন্তু দেশে নগর কি গ্রাম সর্বত্র খেলার মাঠ দখল করে মূলত কী করা হয়েছে? হয়তো নতুন কোনো অবকাঠামো বা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে কিংবা সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে কোনো অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক প্রকল্প। ফলে সেই খেলার মাঠের বৈশিষ্ট্য শ্রেণী অবশ্যই পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। কারণ প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক, বাস্তুসংস্থান, পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক সামাজিকভাবে সেটি এখন আরখেলার মাঠহিসেবে নেই। কিন্তু দেশে কতগুলো খেলার মাঠ হত্যা বিনষ্টের বিরুদ্ধে মামলা ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে? এমনকি আইনে দেশের গ্রাম ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলার মাঠ রক্ষার কোনো বিধান নেই। অবশ্যই গ্রাম কি শহর, পৌর এলাকা-সিটি করপোরেশন কি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার খেলার মাঠের আইনি নিরাপত্তা আইনে যুক্ত করা জরুরি।

খেলার মাঠ চাই: খেলার মাঠের অধিকার নাগরিক অধিকার। এটি মন-শরীর সংস্কৃতির সুস্থ বিকাশের এক অন্যতম শর্ত। কিন্তু দেশজুড়ে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য প্রতিবেশের মতোই খুন হচ্ছে খেলার মাঠ। উন্নয়ন বাহাদুরিতে উধাও হচ্ছে শত শত টুকরো টুকরো ছোট-বড় খেলার মাঠ। নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলেন, একটি শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটারে একটি করে খেলার মাঠ প্রয়োজন। ৩০৫.৪৭ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিবেচনায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে খেলার মাঠ দরকার অন্তত ৬১০টি, কিন্তু মাঠ রয়েছে ২৫৬টি, ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো মাঠ নেই। ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলায় নির্মিত হচ্ছে বিপণিবিতান, শ্যামলী ক্লাব মাঠ দখল করে চলে তাঁত বস্ত্র মেলা। রাজধানীর জন্য করা ড্যাপের খসড়ায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঢাকায় মাঠ দরকার ১৪৬৬টি। নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠনবাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)’ ২০১৯ সালেঢাকা শহরে বিদ্যমান খেলার মাঠের ঘাটতি চহিদা পর্যালোচনাবিষয়ক এক গবেষণা করে। তাদের গবেষণায় ঢাকায় ২৩৫টি মাঠের উল্লেখ আছে। কেবল ঢাকা নয়, খুন হয়ে গেছে দেশের সব এলাকার খেলার মাঠ। সিলেটের বিখ্যাত কালাপাথার মাঠ, কয়েদির মাঠ, গাছতলা মাঠ, মজুমদারবাড়ি মাঠ, বাগবাড়ি মাঠ, বাদামবাগিচা মাঠ, রাজবাড়ি মাঠ, ছড়ারপাড় মাঠ চোখের নিমিষে উধাও হয়ে গেল। কেবল খেলা নয়, পাবলিক মাঠগুলো জনসংস্কৃতির এক দেশীয় মঞ্চ। এখানে পালাগান হয়, সার্কাস, ষাঁড়ের লড়াই, বারুণী, আড়ং, মৌসুমি মেলা, ঘোড়দৌড়, যাত্রাপালা, বার্ষিক প্রতিযোগিতা, মাহফিল, কীর্তন কতকিছুর আয়োজন ঘটে। নওগাঁর মহাদেবপুরের নাটশাল মাঠে ওরাওঁ-সাঁওতাল-মুন্ডাদের ঐতিহ্যবাহী কারাম পরব আয়োজিত হয় প্রতি বছর। এভাবে একের পর এক খেলার মাঠ খুন হয়ে যাওয়ার পরিণতি কী? এর শারীরিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিক্রিয়া কী? বিষয়ে আমরা কি জোরদার আওয়াজ তুলেছি? নীতিনির্ধারক কি জাতীয় সংসদ দেশের খেলার মাঠের সুরক্ষায় জোরদার কোনো তর্ক তুলেছে কখনো? হয়তো সব পাবলিক মাঠ সবার জন্য এখনো সমানভাবেউন্মুক্তনয়। সমাজে বিদ্যমান শ্রেণী-বর্গ বিভাজন কাঠামোগত বৈষম্য খেলার মাঠ ঘিরেও জারি রাখে নানা বঞ্চনার উদাহরণ। বিশেষ করে সব বয়েসী মেয়েদের সব মাঠে প্রবেশ নিজের মতো করে মাঠ ব্যবহারের সামাজিক পরিস্থিতি থাকে না। অনেক এলাকায় বাঙালি জাত্যভিমান আদিবাসীদের মাঠে প্রবেশাধিকার সংকুচিত করে রাখে। সামাজিকভাবেঅস্পৃশ্যঅনেকে একেই মাঠে খেলতে পারে না। খেলার মাঠ নিয়ে জারি থাকা এমনতর সামাজিক বঞ্চনা শ্রেণীদ্বন্দ্বকেও প্রশ্ন করা জরুরি। অবশ্যই দেশের সব খেলার মাঠের পাবলিক নথিভুক্তকরণ জরুরি। নামকরণ, ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, সংকটের কারণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এসব বিবরণ সম্মিলিত একটা জাতীয় তথ্যভাণ্ডার। পাশাপাশি খেলার মাঠ সুরক্ষায় আইন আইনি তৎপরতা জোরালো সক্রিয় হওয়া জরুরি। আবারো কেন্দুয়ার বলাইশিমূল মাঠের সুরক্ষা ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে চলতি আলাপখানি মাঠ রক্ষার আন্দোলনে সবাইকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানাই।

 

পাভেল পার্থ: লেখক গবেষক

প্রতিবেশ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ

 

আরও