শিক্ষা কারিকুলাম ও কারিগরি দক্ষতা শিল্প-সংযুক্ত না হলে উচ্চশিক্ষায় প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বেকার গ্র্যাজুয়েটই তৈরি করবে

ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। তিনি মালয়েশিয়ার আইডিইএএসের সিনিয়র ফেলো এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর।

এক দশকব্যাপী (২০১৩-২৪) মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়া ও মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেছেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন এবং অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০২৫ আইসিটি হোয়াইট পেপার কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আসন্ন বাজেট নিয়ে তার প্রত্যাশার কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আমাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ কি পর্যাপ্ত মনে হয়? বৈশ্বিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে আমাদের কী সংস্কার লাগবে? শিক্ষা ও গবেষণায় বাজেট কীভাবে সহায়তা করতে পারে?

বাজেটের আকার বাড়ানোর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ বরাদ্দ ব্যয়ের গুণগত ব্যবস্থাপনা (কোয়ালিটি অব স্পেন্ডিং) নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণে বরাদ্দ বাড়ালে উচ্চশিক্ষার মান বাড়বে না। দেশে গবেষণা বরাদ্দ সবসময় হতাশাজনক। এমনটি গবেষণালব্ধ মৌলিক সমাধান ও নতুন উদ্ভাবনের পথে বাধা তৈরি করছে। আবার শিক্ষা বরাদ্দের সিংহভাগ (৮০-৯০ শতাংশ) চলে যায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কাজে। এজন্য নতুন করে গবেষণার জন্য বরাদ্দ নগণ্য।

আমাদের তাই শিক্ষা খাতের মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ গবেষক ও শিক্ষকদের বৈশ্বিক পর্যায়ে সক্ষম করে তোলার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি সংস্কারের অধীনে আনতে হবে। এ সংস্কারে আমাদের কর্মক্ষমতাভিত্তিক বিনিয়োগ মডেল নিতে হবে। এ মডেলের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার মান এবং এর সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগ তৈরির সক্ষমতা যাচাই করে অনুদান দেয়া হবে। বাজেটকে শুধু শিক্ষা খাতে ব্যয়ের উৎস হিসেবে ভাবা যাবে না। বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন করা জরুরি। গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয় মূলত জিডিপির জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বলে বিবেচিত। দেশে গবেষণায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা এখনো রয়েছে। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমূল পরিবর্তনে সর্বাগ্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) মতো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার আমূল সংস্কার জরুরি। এখনো উচ্চশিক্ষা খাতে ‘ফ্ল্যাগশিপ রিসার্চ ইউনিভার্সিটি’ অর্থাৎ বিশেষায়িত গবেষণামূলক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেই। এ অবস্থা থেকে বেরোনোর জন্য ইউজিসির নেতৃত্বে বড় আকারের পরিবর্তন আনতে হবে। ইউজিসির মতো সংস্থার নিয়ন্ত্রক, চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে তাই প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনকে বিবেচনায় রাখা জরুরি। আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র ও একাডেমিক অর্জনের মতো নৈর্ব্যক্তিক বিষয়গুলোকে নিয়োগের বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে। এশিয়ার উন্নত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার পেশাদার অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হয়। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘গবেষণাহীন একাডেমিক কার্যক্রম’-এর দীর্ঘ ধারা থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়।

উচ্চশিক্ষা খাতের উন্নয়নে প্রবাসী একাডেমিকদের কী ভূমিকা হতে পারে? আসন্ন বাজেট বরাদ্দ এক্ষেত্রে কি প্রাসঙ্গিক?

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভিজিটিং ফেলো বা একাডেমিক হিসেবে অংশ নিতে পারবেন, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট স্কিম দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নেই। আবার এ ধরনের কার্যক্রমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের উৎসাহ দেয়ার মতো ‘ক্যারিয়ার মবিলিটি’ স্কিমও জাতীয় পর্যায়ে নেই। নেই কোনো ‘ব্রেন গেইন’ কাঠামো। এজন্য ইউজিসির নেতৃত্বে যে ফ্রেমওয়ার্কের কথা বলেছি, সেটির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এ পরিকল্পনাকে বিবেচনা করতে হবে। প্রবাসী একাডেমিকদের মেধাকে দেশের গবেষণা ও জ্ঞান খাতে কাজে লাগানোর কথা ভাবতে হবে। পূর্ব এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ ধরনের সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ রয়েছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে আছে।

একইভাবে অনেক দিন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণা বা শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে যারা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, এমন একাডেমিকদের বিশ্ববিদ্যালয় খাতের সংস্কারের নেতৃত্বে সরাসরি সুযোগ করে দেয়া দরকার। তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও যোগাযোগ শিক্ষা প্রশাসন ও একাডেমিক কাঠামোকে টেকসই করতে ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের কাঠামো তৈরির জন্য আলাদা বরাদ্দ বাজেটে দেয়া যেতে পারে। এ কাঠামোয় বিশ্বখ্যাত ভিজিটিং স্কলাররা এসে পাঠদান করবেন। যথাযথ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে আমাদের যুক্তরাজ্যের সোশ্যাল সায়েন্সেস রিসার্চ কাউন্সিল (ইএসআরসি) ও ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সেস রিসার্চ কাউন্সিলের (ইপিএসআরসি) অনুরূপ একটি গবেষণা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এটি সামাজিক ও প্রকৌশল বিজ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের জন্য একীভূত বিনিয়োগ ও টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করবে।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

প্রাথমিক শিক্ষায় সংখ্যাগত উপস্থিতিতে সফল হলেও শিখন ফলে আমরা পিছিয়ে আছি। ‘শিখনের দারিদ্র্য’ নিরসনের ক্ষেত্রে আমরা অর্থনৈতিক প্রতিযোগী দেশ (যেমন ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া) থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার গুণগত মান এবং এর আওতায় শিক্ষার্থীদের আনা। কয়েক বছরে শিক্ষা খাতে শেখার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, সেগুলোকে সংশোধনের মাধ্যমে দ্রুত সংকট এড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কারিকুলাম পরিবর্তনের চেয়েও জরুরি শিক্ষকদের দক্ষতা ও উৎসাহ। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা এমন স্তরে নিতে হবে, যাতে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হয়। ভিত্তি দুর্বল রেখে উচ্চশিক্ষার সংস্কার বা ইউজিসির আমূল পরিবর্তন করলেও তার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।

অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠান চালু করা হলেও যুগোপযোগী দক্ষতা নিশ্চিতে ব্যর্থ হচ্ছে কেন আমাদের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো?

আমাদের কারিগরি শিক্ষা মূলত ‘সাপ্লাই-ড্রিভেন’। অর্থাৎ বাজারের চাহিদা না বুঝেই পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করা হচ্ছে। অনেক উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের ‘‌গ্লোবাল সার্টিফিকেশন’ ও মূল্যায়নের দিকে নজর দিতে হবে। শুধু ডিপ্লোমাধারী তৈরি না করে নির্দিষ্ট খাতের (যেমন সেমিকন্ডাক্টর ও অন্যান্য হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং, গ্রিন এনার্জি) জন্য ‘নিশ স্কিল’ বা বিশেষায়িত দক্ষতা তৈরিতে নজর দিতে হবে। আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ও কারিগরি দক্ষতা শিল্প-সংযুক্ত না হলে উচ্চশিক্ষায় প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বেকার গ্র্যাজুয়েটই তৈরি করবে।

আইসিটি টাস্কফোর্সে কাজ করার অভিজ্ঞতায়, এফডিআই আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা নতুন সরকার কীভাবে কাজে লাগাতে পারে?

আইসিটি খাতে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমাদের ‘তদারকি অবকাঠামো’ ও কাঠামোগত সহায়তা (যেমন সাশ্রয়ী উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ) নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে কেবল কর সপ্তাহ উদযাপন যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা দেখেন দক্ষ শ্রমশক্তির সহজলভ্যতা। আইসিটি খাতকে কেবল সেবা খাত হিসেবে না দেখে অগ্রাধিকারভিত্তিক কৌশলগত একটি খাত হিসেবে দেখতে হবে। পণ্য ও আইপি ডেভেলপমেন্ট হাব হিসেবে এটিকে গড়ে তোলা জরুরি। এছাড়া তথ্যের নিরাপত্তা ও সাইবার আইনের আধুনিকায়ন জরুরি, যাতে বিদেশী টেক জায়ান্টরা এখানে বিনিয়োগে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এক্ষেত্রে বাস্তবায়ন পর্যায়ের অতীতের ব্যর্থতা মোকাবেলায় প্রয়োজন একটি কার্যকর, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ আইসিটি প্রশাসন এবং আইসিটি বিভাগে বিশ্বমানের নেতৃত্ব।

দেশে তীব্র বেকারত্ব চলছে। স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নতুন সরকারের করণীয় কী?

তরুণদের একদিকে যেমন কর্মোপযোগী ও নিয়োগযোগ্য চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে, অন্যদিকে তাদের কর্মসংস্থান তৈরি করার মতো দক্ষ হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। স্টার্টআপদের জন্য প্রধান বাধা অর্থায়ন। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো জামানতনির্ভর। নতুন সরকারের উচিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল উৎসাহিত করা এবং একটি ‘অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর নেটওয়ার্ক’ তৈরি করা। এছাড়া স্টার্টআপদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) করা এবং ব্যর্থ হওয়া উদ্যোক্তাদের জন্য ‘‌সহজ এক্সিট’ বা দেউলিয়া আইন সংস্কার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর ইন্ডাস্ট্রি মেন্টরশিপ স্কিম।

এশিয়ার সফল দেশগুলো (কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন) থেকে আমরা কী শিখতে পারি?

এ দেশগুলোর সাফল্যের মূল সূত্র ছিল ‘‌শিক্ষা ও শিল্পনীতির গভীর সমন্বয়’। তারা তাদের শ্রমবাজার-পরবর্তী ২০ বছরের গতিপ্রকৃতি বুঝে শিক্ষানীতি সাজিয়েছে। তারা ভোকেশনাল ও কারিগরি শিক্ষাকে ‘‌সেকেন্ড ক্লাস’ শিক্ষা হিসেবে না দেখে মূলধারার শিক্ষার সমান মর্যাদা দিয়েছে। মালয়েশিয়া তাদের ন্যাশনাল সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন পলিসি (এনএসটিআইপি) ২০২১-৩০ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তারা এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি হাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইউজিসি বা প্রাথমিক শিক্ষার যে সংস্কারের কথা আমি বলেছি, তা এ দেশগুলোর মডেল অনুসরণ করেই করা উচিত, যাতে শিক্ষা ও শিল্প উন্নয়নের ভঙ্গুর যোগসূত্রটি সবল হয়।

আমাদের শিক্ষা ও গবেষণা শিল্প খাতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারছে না কেন?

এর মূল কারণ শিল্প খাত ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘‌আস্থার অভাব’ এবং কার্যকর যোগাযোগের প্লাটফর্ম না থাকা। একাডেমিয়া মনে করে শিল্প খাত কেবল স্বল্পমেয়াদি লাভ চায়, আর শিল্প খাত মনে করে স্নাতক পর্যায়ে যা পড়ানো হয় তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। এ দূরত্ব ঘোচাতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘‌ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ থাকা উচিত। পাঠ্যক্রম প্রণয়ন থেকে শুরু করে জয়েন্ট রিসার্চ—সবক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির অগ্রসরতার কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?

এআই বিপ্লবের কারণে অনেক প্রথাগত কাজ হারিয়ে গেলেও ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি ও রোবোটিকসের মতো খাতে বিশাল সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি হতে হবে দ্বিমুখী—অর্থাৎ শিক্ষার ‘‌ফ্লোর’ ও ‘‌সিলিং’ উভয় ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, ‘‌ফ্লোর’ বা ভিত্তি পর্যায়ে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে ইউনেস্কো নির্ধারিত একবিংশ শতাব্দীর মৌলিক দক্ষতাগুলো। প্রাথমিক স্তর থেকেই বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সমন্বয় সাধনের মতো দক্ষতাগুলোর পরিচিতি বাড়াতে হবে, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেকোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এটি হবে আমাদের সাধারণ শ্রমবাজারের জন্য একটি মজবুত সুরক্ষা কবচ।

দ্বিতীয়ত, ‘‌সিলিং’ বা উচ্চতর পর্যায়ে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের শীর্ষে পৌঁছানো। এজন্য ক্রমান্বয়ে প্রয়োজন হাই-অ্যান্ড আরঅ্যান্ডডি ও বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব। সস্তা শ্রমের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চ মানের ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা তৈরিতে আমাদের এখনই এগোতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে উচ্চশিক্ষার শীর্ষে সেই ‘‌ফ্ল্যাগশিপ রিসার্চ ইউনিভার্সিটি’ ও একটি ‘‌গবেষণামুখী ইউজিসি’র কোনো বিকল্প নেই। যোগ্য নেতৃত্বে এ প্রতিষ্ঠানগুলোই হতে পারে আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগের মূল চালিকাশক্তি।

আরও