জনস্বাস্থ্য

বাংলাদেশে হাম যেভাবে প্রবল বেগে ফিরে এল

বিশ্বের অনেক অঞ্চল থেকে হাম একসময় প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি গোটা বিশ্বেই এটি আবার উদ্বেগজনক হারে ফিরছে।

২০২৩ সালে হামের প্রকোপ ছিল ১ কোটি ৩০ লাখের মতো, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। এ প্রাদুর্ভাব মূলত আফ্রিকা, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেশি দেখা গেছে। তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোয়ও এটি মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। শুধু চলতি বছরেই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৯৮৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। এ অভিজ্ঞতাগুলো জনস্বাস্থ্যের বেদনাদায়ক এক সত্য সামনে দাঁড় করায়। সেটি হলো সবচেয়ে সফল টিকাদান কর্মসূচিও যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের চেয়ে বড় উদাহরণ এক্ষেত্রে আর কোথাও নেই। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সীমিত আয়ের দেশগুলোও মানব উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্য কীভাবে অর্জন করতে পারে সে শিক্ষা দিয়েছে বাংলাদেশ। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও ছিল। সীমিত আর্থিক সংস্থান ও দুর্বল অবকাঠামো থাকার পরও কমিউনিটিভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থা এবং এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ার মাধ্যমে দেশটিতে নিয়মিতভাবে টিকা কর্মসূচির আওতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়। ১৯৮৬ সালে যেখানে টিকার কাভারেজ ছিল মাত্র ২ শতাংশ, ঠিক ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। টিকাদানের ‘অলৌকিক সাফল্যের’ কারণে বাংলাদেশে পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকারের মতো রোগ নির্মূল হয়। এমনকি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হারও ৮০ শতাংশ হ্রাস পায়।

অথচ যে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা এ অসামান্য সাফল্য এনে দিয়েছিল, সেটিই এখন নড়বড়ে অবস্থায়। ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশে ৬২ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মৃত্যু ঘটেছে। অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। অনেকেই এ ব্যর্থতার জন্য তৎকালীন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করছেন। ২০২৪ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এর পরই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সমালোচকরা বলছেন, ভ্যাকসিন বা অন্যান্য টিকা কেনার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার জন্য সংস্কারমূলক কিছু পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এ পদক্ষেপগুলোই টিকাদান কর্মসূচির সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

কিন্তু এ ধরনের মূল্যায়ন বৃহত্তর দৃশ্যপটটুকু এড়িয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান সংকটকে কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। সমস্যাটি ইউনূস সরকারের আমলেও শুরু হয়নি। বরং এটি বহু বছর ধরে নীরবে দানা বাঁধতে থাকা একাধিক এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বমানের তুলনায় বাংলাদেশের টিকাদানের হার বেশি হলেও হামের বিরুদ্ধে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (বা সামষ্টিক প্রতিরোধ ক্ষমতা) গড়ে তোলার জন্য যে ৯৫ শতাংশ রোগতাত্ত্বিক সীমার প্রয়োজন, তা সম্ভবত কখনই অর্জিত হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ যেখানে অনুমান করছে ২০১৯-২৩ সালে জনসংখ্যার ৯৩-৯৭ শতাংশ মানুষ হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার উভয় ডোজই পেয়েছে, সেখানে ‘কাভারেজ ইভালুয়েশন সার্ভে’ (টিকাদান মূল্যায়ন জরিপ) অনুসারে এ হার ছিল মাত্র ৮০-৮৬ শতাংশ।

যা-ই হোক না কেন, এ গড় বা সামগ্রিক পরিসংখ্যানটি জনসংখ্যার অভ্যন্তরীণ বড় ধরনের বৈষম্যকে আড়াল করে রাখে। শহরের বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতির শিশু, যাযাবর বা ভাসমান জনগোষ্ঠী, ভৌগোলিকভাবে দুর্গম জেলার বাসিন্দা এবং শরণার্থী শিবিরের মতো সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলো প্রতিনিয়তই টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে। আবার অনেকে কেবল আংশিক টিকা পেয়েছে: হামের টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের মাঝখানে বিপুলসংখ্যক শিশুর ঝরে পড়ার হার সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে সৃষ্ট দুর্বলতাগুলো মূলত অদৃশ্যই রয়ে গিয়েছিল, যতক্ষণ না বাহ্যিক কোনো ধাক্কা এসে সেগুলোকে উন্মোচিত করে দেয়। কভিড-১৯ মহামারী ছিল তেমনই একটি ধাক্কা। এ সংকট কেবল নিয়মিত টিকাদান সেবাকেই ব্যাহত করেনি; বরং ভ্যাকসিন ফ্যাটিগ (বার বার টিকাদানের ফলে তৈরি অনীহা) এবং নানা ভুল তথ্যের কারণে ভ্যাকসিনের প্রতি সংশয় তৈরি হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার ওপর থেকে আস্থা কমিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের টিকাদান সমস্যাটি সরবরাহজনিত সংকটের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং এটি সমপরিমাণে চাহিদাজনিত একটি সমস্যা।

১ দশমিক ১ শতাংশ শিশু কোনো ধরনের নিয়মিত টিকাই পায়নি (যাদের বলা হয় ‘জিরো-ডোজ’)। ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মধ্যে টিকাদানের ব্যবধান আরো বাড়ে এবং হামের মতো একটি অতিসংক্রামক ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া স্বাস্থ্যের অন্যান্য অন্তর্নিহিত দুর্বলতা—যেমন শিশুদের পুষ্টির ধারাবাহিক অভাব, বিশেষ করে ভিটামিন ‘‌এ’-এর ঘাটতি অন্যতম। পুষ্টিহীনতা সংক্রমণ ছড়াতে সাহায্য করেছে এবং পরিস্থিতিকে আরো মারাত্মক করে তুলেছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এখন একটি জরুরি হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইন সম্পন্ন করেছে। কিন্তু ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় ১২ লাখের বেশি শিশুকে লক্ষ্য করে নেয়া এ উদ্যোগের বিশালত্বই প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থাকে দুর্বল করার পেছনে যে ব্যর্থতাগুলো রয়েছে, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক। প্রথমত, সরকার দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্য খাতে কম বিনিয়োগ করে আসছে। ২০১০ সালে জিডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ১ দশমিক ১ শতাংশ ছিল। এমনিতেই কম এ বরাদ্দ ২০১৭ সালে দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় দীর্ঘস্থায়ী জনবল সংকট দেখা দিয়েছে এবং মানুষের নিজ পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা ২০২৩ সালে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। স্বাস্থ্য খাতে কম ব্যয় মূলত সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক আত্মতুষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ, যা বিশেষ করে হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে তীব্র ছিল। ২০০৩ সালে প্রবর্তিত ‘হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম’কে (এইচপিএনএসপি) সরকারের মূল কার্যক্রমের সঙ্গে একীভূত করতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এজন্য সেবাপ্রদান ব্যাহত হয়। (পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মার্চে প্রোগ্রামটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়)। ২০২০-২৫ সালের মধ্যে দেশব্যাপী কোনো সম্পূরক এমআর টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়নি। এছাড়া ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএইড) মাধ্যমে হঠাৎ অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়া স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যবস্থাকে আরো বেশি দুর্বল করে দেয়।

নিশ্চিতভাবেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। হাসিনার শাসনামলের জেঁকে বসা দুর্নীতির প্রেক্ষাপটে ভ্যাকসিন ক্রয়সহ সরকারি খাতগুলোয় সততা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাটি প্রয়োজনীয় এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া ছিল। সবক্ষেত্রে ঢালাওভাবে এ এজেন্ডা বা সংস্কার চাপিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল একটি ভুল রোগ নির্ণয়ের মতো; কারণ গণটিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করা এবং ভ্যাকসিনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেয়ে কেনাকাটার সংস্কারটি ওই মুহূর্তে ততটা জরুরি ছিল না। এ ব্যর্থতা এড়ানো সম্ভব ছিল। দুই বছরের অস্থিরতা ও বিক্ষোভের পর ২০২৪ সালে শ্রীলংকা একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তা সত্ত্বেও তারা ২০২৩ সালের হামের প্রাদুর্ভাবকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল। অন্যদিকে নেপালে যুবকদের নেতৃত্বাধীন গণবিক্ষোভের কারণে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পতনের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা হাম নির্মূলের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করলেও সেখানকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকাদানের ঘাটতি পূরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো টিকাদানের হারে যে ধস নেমেছে, তা তারা অন্তত সাময়িকভাবে হলেও এড়াতে পেরেছে।

এখান থেকে শিক্ষাটি পরিষ্কার। একটি টিকাদান কর্মসূচি সফল হওয়ার অর্থ এই নয় যে কাজ শেষ হয়ে গেছে। হামের মতো রোগের বিরুদ্ধে সামষ্টিক প্রতিরোধ বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ ধরে রাখতে হলে টিকার সরবরাহ ও চাহিদা—উভয় দিকেই সার্বক্ষণিক নজর দিতে হয়। একই সঙ্গে সুদৃঢ় করতে হবে জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। বাংলাদেশ আজ কোনো একটি বিচ্ছিন্ন বা স্থানীয় ভুলের মাশুল দিচ্ছে না, বরং দিচ্ছে দীর্ঘদিনের ধীরগতির পদ্ধতিগত ক্ষয়ের। জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলো প্রায়ই সে বিষয়গুলো থেকেই তৈরি হয়, যেগুলোকে আমরা সুরক্ষিত মনে করে অবহেলা করি।

[স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট-২০২৬]

এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ক্লাস্টার প্রধান, গ্লোবাল লেবার অর্গানাইজেশন; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভিজিটিং অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব রিডিং

জিয়া সাদিক: সহযোগী অধ্যাপক, হেলথ ইকোনমিকস, লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন

আরও