নীতি আলোচনা

সংখ্যা বাড়ানোর আগে বিমান বাংলাদেশকে বহর পরিকল্পনা স্পষ্ট করতে হবে

বিমান বর্তমানে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। অথচ শিগগিরই আরো ২১টি উড়োজাহাজ—১১টি বোয়িং জেট ও ১০টি এয়ারবাস—কেনার প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।

আমি বিমানের বিভিন্ন উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম—এটিপি থেকে এয়ারবাস, ড্যাস-৮ থেকে বোয়িং পর্যন্ত। বিমানের জন্য কৌশলগত অংশীদার খোঁজার কাজেও সম্পৃক্ত ছিলাম। এসব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিমান কীভাবে পরিচালিত হয় এবং এর মূল সমস্যাগুলো কোথায়—সে বিষয়ে ভালোভাবে জানার সুযোগ হয়েছে। এছাড়া এএনজেড ও সিটিব্যাংক এনএর উড়োজাহাজ অর্থায়ন দলের সঙ্গে এবং পিডব্লিউসির সহকর্মীদের সঙ্গে এয়ারলাইনসের রুট প্ল্যানিং ও পরিচালন ব্যবস্থা কার্যকর করার কাজেও যুক্ত ছিলাম।

আমার মতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বড় আকারে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বাংলাদেশকে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—এতগুলো উড়োজাহাজ দিয়ে বিমান কী করবে?

বিমান বর্তমানে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। অথচ শিগগিরই আরো ২১টি উড়োজাহাজ—১১টি বোয়িং জেট ও ১০টি এয়ারবাস—কেনার প্রক্রিয়ায় যেতে পারে। এর বাইরে গত এপ্রিলে প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও হয়েছে। সব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজের বহরের বিপরীতে বিমানের ক্রয়াদেশে থাকবে ৩৫টি উড়োজাহাজ। এটি হবে বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ।

সম্প্রসারণ কোনো খারাপ বিষয় নয়। বাংলাদেশের লাখ লাখ প্রবাসী কর্মী রয়েছেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণী বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। আধুনিক বহর থাকলে বিমান আরো বেশি গন্তব্যে যাত্রী পরিবহন করতে পারবে, সেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে পারবে এবং বর্তমানে বিদেশী এয়ারলাইনসে ভ্রমণকারী যাত্রীদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারবে।

কিন্তু উড়োজাহাজ কেনা এক বিষয়, আর সেগুলো থেকে লাভ করা আরেক বিষয়।

একটি উড়োজাহাজ তখনই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়, যখন সেটি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি অতিরিক্ত উড়োজাহাজের জন্য প্রয়োজন পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, বীমা ও বিমানবন্দরের স্লট। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টেকসই আয় নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা থাকতে হবে। একটি উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় মাটিতে তথা বিমানবন্দরে পড়ে থাকলে নতুন বলে সেটির খরচ কমে যায় না। বরং সেটি ব্যয়বহুল অব্যবহৃত সম্পদে পরিণত হয়।

তাই আরো সম্প্রসারণের আগে বিমানকে তার বহর পরিকল্পনা স্পষ্ট করতে হবে। এসব উড়োজাহাজ কোন কোন রুটে চলবে? সম্ভাব্য যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা কত ধরা হয়েছে? প্রতিটি উড়োজাহাজ দিনে বা বছরে কত ঘণ্টা উড়বে? বর্তমানে থাকা উড়োজাহাজগুলোর কোনটি কখন অবসরে যাবে? নতুন উড়োজাহাজের কারণে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও অর্থায়নের ব্যয় কতটা বাড়বে?

এয়ারবাস কেনার প্রস্তাবটিও একটি যৌক্তিক বাণিজ্যিক প্রশ্ন তৈরি করে। বিমানের বর্তমান জেট বহরের সব সুপরিসর উড়োজাহাজই বোয়িংয়ের। এয়ারবাস যুক্ত করা যে ভুল হবে, তা নয়। বিশ্বের অনেক সফল এয়ারলাইনস মিশ্র বহর পরিচালনা করে। তবে তুলনামূলকভাবে ছোট একটি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে বহরে বৈচিত্র্য আনার সুবিধার সঙ্গে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং পরিচালনগত জটিলতার বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে। তাই সিদ্ধান্তটি প্রতীকী কোনো বিবেচনায় নয়, অর্থনৈতিক হিসাবের ভিত্তিতে নেয়া উচিত।

উড়োজাহাজ সরবরাহের সময় নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বিমান বলছে, বর্তমানে তাদের উড়োজাহাজের ঘাটতি আছে। অথচ এপ্রিলে বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ সালে এবং চলবে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। আজ ক্রয়াদেশ দেয়া উড়োজাহাজ আজকের সক্ষমতার ঘাটতি দূর করতে পারবে না। স্বল্পমেয়াদে বিমানের সত্যিই বাড়তি সক্ষমতা প্রয়োজন হলে সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে—উড়োজাহাজ লিজ নেয়া, স্বল্পমেয়াদে কেনা কিংবা বর্তমান বহরের আরো কার্যকর ব্যবহার করে এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব কিনা।

এরপর আসে সেই প্রশ্নটি, যা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: এসবের মোট ব্যয় কত হবে?

প্রস্তাবিত অতিরিক্ত উড়োজাহাজগুলোর মূল্য ও অর্থায়নের ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। কোনো চূড়ান্ত অঙ্গীকার করার আগেই এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। উড়োজাহাজগুলো বাণিজ্যিক ঋণ, লিজ বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় অর্থায়ন করা হোক না কেন, সেই দায় পরিশোধ করা যাবে কিনা, তা নির্ভর করবে বিমানের আর্থিক সক্ষমতার ওপর। বিমান যদি সেই দায় পরিশোধ করতে না পারে, শেষ পর্যন্ত এর বোঝা জনগণের ওপর পড়তে পারে।

কয়েকটি চুক্তির বিষয় যেভাবে সামনে এসেছে, তাতেও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে। বিমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত অতিরিক্ত বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত  প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। পরে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক যৌক্তিকতার গুরুত্বের কথা বলেছেন। অবশ্য শুধু এসব ঘটনা থেকে এটা প্রমাণ হয় না যে রাজনৈতিক বিবেচনায় উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। তবে এগুলো স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বাধীনভাবে মূল্যায়িত একটি ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরো জোরালো করে।

বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী জাতীয় বিমান সংস্থার প্রয়োজন হতে পারে (যদিও ভারতের  নিজস্ব কোনো রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনস নেই)। শুধু একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বিকল্প হিসেবে জাতীয় গর্বকে ব্যবহার করা যায় না। তেমনি বুঝতে হবে, রিজিওনাল হাব হিসেবে বিবেচনার জন্য শুধু থার্ড টার্মিনাল নয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় রানওয়ে, অন্য বিমান সংস্থার সঙ্গে কোড শেয়ারিং এমনকি লয়্যালটি প্রোগ্রাম।

নতুন চুক্তি সই করার আগে বিমানের একটি সমন্বিত বহর ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রকাশ করা উচিত। এতে রুট, যাত্রী ও পণ্যের চাহিদা, উড়োজাহাজের ব্যবহার, অর্থায়ন, পরিচালন ব্যয়, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুরনো উড়োজাহাজ অবসরে নেয়ার সময়সূচি থাকতে হবে। পরিকল্পনায় ব্যবহৃত অনুমানগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বিমানের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি এটি নয় যে প্রতিষ্ঠানটির কতটি উড়োজাহাজ আছে বা কতটি কেনার আদেশ দিয়েছে। বরং দেখতে হবে, বিনিয়োগ করা অর্থের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য উড়োজাহাজগুলো পর্যাপ্ত সময় উড়ছে কিনা, যথেষ্ট আয় করছে কিনা এবং যাত্রীদের দক্ষতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছে কিনা।

বিমান কতটি উড়োজাহাজ কিনবে, সেই প্রশ্ন তোলার আগে আরো মৌলিক একটি প্রশ্ন করা উচিত: বিমান লাভজনকভাবে কতটি উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে সক্ষম?

মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও