পতিত স্বৈরাচার দাঁড়িয়ে ছিল দানবীয় সর্বগ্রাসী দুর্নীতির অবাধ চর্চার ওপর। বিগত সরকারের সঙ্গে যাদের (রাজনীতিবিদ ও সরকারি চাকরিজীবী) সম্পর্ক ছিল, তারা সব আইনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রায় সবাই ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মহানায়কে পরিণত হয়েছিলেন। দুর্নীতি স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ক্যান্সার। রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে জনগণ ও গর্বিত জাতি স্বৈরাচারের দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে না।
বর্তমানে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় পার করছে। বিবিধ দুর্নীতির করালগ্রাসে ক্ষত-বিক্ষত এ জাতি সর্বাত্মক দুর্নীতিগ্রস্ত দুঃশাসন পেরিয়ে সবার জন্য ঐক্য, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষায় উত্তরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছে স্বৈরাচারী দুঃশাসক। একটি বৈষম্যহীন দেশ ও জাতি গঠনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল এ দেশের সর্বস্তরের জনগণের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলমান নিপীড়ন, সব ধরনের বৈষম্য ও প্রতারণামূলক চক্রান্ত দূর করা। একটি ন্যায়নিষ্ঠ, বৈষম্যহীন, কল্যাণকামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ কাজ মোটেও সহজ নয়।
বাংলাদেশ গত দেড় দশক যে ভয়াবহ দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে গেছে, তার ভিত্তি কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে দুঃশাসক ও তার সহযোগীরা একেকটা দানবে পরিণত হয়েছে। কে সৃষ্টি করেছে এসব দানব? কারা সৃষ্টি করেছে স্বৈরাচার? যাদের মূল কাজই ছিল বিরোধীদের হত্যা ও নিপীড়ন। যারা দেশের কল্যাণ বাদ দিয়ে দিন-রাত ব্যস্ত ছিল বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ উপার্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। একে একে ধসে পড়েছে দেশের আর্থিক খাতসহ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। তারা অবাধ লুটপাট ও অর্থ পাচার চালিয়ে গেছে। সরকারের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এ দানবরা ক্ষমতার আধিপত্য ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে দেশে দাপটের সঙ্গে সর্বত্র সরব ছিল। ক্ষমতায় থাকা রাজনীতিবিদদের অশুভ জোট এবং পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসক, ব্যাংকার, সাংবাদিক ইত্যাদির একাংশের সীমাহীন ও আত্মবিধ্বংসী লোভ দেশ ও দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ব্যাপক দুর্নীতি ও আর্থিক অপচয় ছিল এ দানবীয় শাসনের কেন্দ্রবিন্দু। ক্ষমতাচ্যুত শাসনামলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে সৎ ও নির্বিবাদী মানুষ। ভিন্ন মতের ওপর এমন কোনো নিপীড়ন নেই যা চালায়নি তারা।
দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের বিরুদ্ধে যে অপূর্ব গণজোয়ারের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো মুক্তির স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ, তা টেকসই করতে হলে দেশের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতিকে এখনই উৎখাত করতে হবে চিরতরে। দুর্নীতির পাগলা ঘোড়া যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয় তাহলে দুর্নীতিই সদ্য অর্জিত মুক্তিকে ধ্বংস করতে ও শহীদদের আত্মত্যাগকে প্রহসনে পরিণত করতে যথেষ্ট। মাফিয়ারা সরকার চালায় এবং তারা দুর্নীতি ছাড়া চলতে পারে না। এটাই ছিল তাদের ক্ষমতা ও নিপীড়নের প্রধান বাহন। অথচ একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে চাকরি পাওয়া বা কোনো ব্যবসা করা বা কোনো সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য কোনো অর্থের বিনিময় হওয়া উচিত নয়। যারা দুর্নীতিতে জড়িত তাদের জন্য সরকারকে কঠোর শাস্তির বন্দোবস্ত করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সামাজিকভাবে হেয় করার সংস্কৃতি চালু করতে হবে দুর্নীতিবাজ নেতা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।
বিগত সরকারের জঘন্যতম গণবিরোধী কর্মকাণ্ড জাতি অনুভব করেছে হাড়ে হাড়ে। বিগত সরকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে সীমাহীন দুঃশাসন, ভিন্ন মত দমনে অমানবিক নির্যাতন ও পাশবিক আচরণ করেছে তা স্বাধীনতাপূর্বে এ দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেনি। পিলখানায় ৫৭ জন নিরপরাধ সেনা কর্মকর্তাকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা, শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে অসংখ্য মানুষকে হত্যা, শেয়ারবাজার ধ্বংস, ব্যাংক খাত থেকে অর্থ লুটপাট, বাংলাদেশ ব্যাংকের নজিরবিহীন রিজার্ভ চুরি জাতি কখনো ভুলবে না। পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ সাধারণ মানুষ ও বিরোধী মতের যে কাউকে অবমাননাকর শব্দের ট্যাগ দিয়ে কোনো অপরাধ ছাড়াই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্যাতন ও হত্যা করার উন্মুক্ত লাইসেন্স নিয়েছিল।
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ চোখ। এ চোখকে একেবারে অন্ধ করে রেখেছিল বিগত সরকার। গণমাধ্যমগুলোর গলা চেপে ধরা হয়েছিল। সরকারি প্রচারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বাধ্য করা হয়েছিল। অকেজো গ্র্যাজুয়েট তৈরির মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। নিরপরাধ মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আয়নাঘরে বছরের পর বছর নির্যাতন করেছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী। স্বৈরাচারী সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতীয় শাসকদের কাছে সমর্পণ করেছিল। ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পুরো জাতির কাছে উপহাসে পরিণত করেছিল। তাদের জনগণের ভোটের দরকার হয়নি। বরং নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করেছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও নির্লজ্জ আজ্ঞাবহ কর্মকর্তা। এসবই দুর্নীতির ডিজিটাল রূপ।
তারা বিচার বিভাগকে দলীয় শাখায় পরিণত করেছিল। পুলিশ বিরোধী নেতাকর্মী দমনে ব্যাপকভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতন করেছে। বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া একটি নিয়মে পরিণত হয়েছিল। জনগণের দুঃখ-কষ্ট ও মতামত প্রকাশের কোনো অধিকার ছিল না। পশ্চিমাদের পাশে রাখার জন্য সন্ত্রাসের নাটক তৈরি করেছিল। সরকারঘনিষ্ঠরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি করেছিল, যার কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এখনো। সরকারঘনিষ্ঠ ব্যতীত কারো সম্মান ও মর্যাদা ছিল না এ রাষ্ট্রে।
বাংলাদেশ একজন ব্যক্তি ও একটি পরিবার স্বাধীন করেছিল—সেটি বিগত সরকার সব সময় প্রচারে ব্যস্ত ছিল। তাদের আচরণ এমন ছিল যে ক্ষমতাসীন দল ও ক্ষমতাঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন এ দেশের প্রকৃত মালিক। আর সাধারণ নাগরিকরা তাদের প্রজা। সেখানে কোনো মানবাধিকার ছিল না, ন্যায়বিচার ছিল না। আর দলীয় আনুগত্যের বাইরের লোকদের কোনো সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করার সুযোগ ছিল না। ফ্যাসিবাদী সরকারের অত্যাচার ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে দেশের মানুষ মরিয়া ছিল। তরুণরা, বিশেষ করে ছাত্ররা, জেনারেশন জেড আর নিতে পারেনি। তাই তারা হারানো স্বাধীনতাকে উদ্ধারে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভোগের মূল কারণ দেশের শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতিবাজ চরিত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অপব্যবহার। দেশের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শাসক ও তাদের সহযোগীরা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলেন দুর্নীতি একটি অন্যায় ও অপরাধ। অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করেছে তারা। জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তির বিনিময়ে তারা পুরো সরকারি ব্যবস্থাকেই পরিণত করেছিল একটি অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে।
ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে ও দীর্ঘকাল আঁকড়ে রাখতে কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে নানা অনৈতিক সুবিধা দিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। সরকারের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ সরিয়ে রাখতে শিক্ষা ব্যবস্থায় আনা হয়েছে বারবার পরিবর্তন। নৈতিক বোধসম্পন্ন মানুষ তৈরিতে মূল্যবোধ অর্জনের কোনো শিক্ষা দেয়া হয়নি। তাদের ফেলে দেয়া হয়েছিল এক ধরনের গোলক ধাঁধায়।
দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নীতি-আদর্শ অনুসরণের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাইলে অবশ্যই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ও অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যদিও এটি সহজ কাজ নয়, কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের চারপাশ থেকেই দুর্নীতির উৎপত্তি। অতএব আমাদের চারপাশ যদি দুর্নীতিমুক্ত থাকে তাহলে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। মানবিক মর্যাদাবোধ, শান্তিপূর্ণ, উন্নত এবং ন্যায়বিচারসম্পন্ন সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে প্রত্যেককেই দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে হবে। দেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয় জনগণের করের টাকায়। এজন্য তাদের কোনো ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ছাড়াই জনগণকে সেবা দেয়ার সংস্কৃতি ও মানসিকতা চালু করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সেবক ভাবতে শিখতে হবে। এজন্য যা করণীয় তা করতে হবে রাষ্ট্রকে।
১৯৭২ সালে কম্বল চুরি হয়ে যাওয়া থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দুর্নীতির এ ক্যান্সার থেকে জনগণ কখনই রেহাই পায়নি। ফ্যাসিবাদী শাসককে অপসারণের ফলে দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যাবে—এমন ভাবা আহাম্মকি হবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দুর্নীতিবাজ মানসিকতা এখনো অটুট রয়েছে। রাষ্ট্রের যেকোনো স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ থাকতে হবে। প্রশাসনের দুর্নীতিবাজদের সরিয়ে সৎ ও যোগ্য লোকদের পদোন্নতি ও পদায়ন দিতে হবে। প্রশাসনের যেকোনো দুর্নীতিকে অবশ্যই নিষিদ্ধ করতে হবে এবং দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ব্যক্তি পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ না করলে এবং বর্তমান দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থায় প্রশাসন পরিচালিত হলে আমরা কখনই দুর্নীতিমুক্ত হতে পারব না। অন্যদের দোষারোপ করার আগে আমাদের অবশ্যই নিজেকে দোষারোপ করতে হবে যদি আমরা একই পাপের অনুশীলন করি। সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত সেবার উদাহরণ স্থাপন করতে হবে এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য জনগণকে অবশ্যই দুর্নীতির লেনদেন থেকে দূরে থাকতে হবে।
যুক্তিসংগতভাবে ভালো জীবনযাপনের জন্য আমাদের কত টাকা দরকার? আগের সরকারের কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার মতো হাজার কোটি টাকা? নাকি কর কর্মকর্তা বা মেয়র বা এমপিদের মতো টাকার পাহাড়? এ লোকদের প্রচুর টাকা আছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা সব হারিয়েছে। তাদের ‘শুদ্ধাচার’ পুরস্কার কি তাদের সুনাম বাঁচাতে সাহায্য করেছে? অর্থ তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। তাদের এ কলঙ্কজনক পরিণতির পেছনে রয়েছে দানবীয় দুর্নীতি।
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সমাজ ব্যবস্থা তথাকথিত ‘আলোকিত মানুষ’ তৈরি করেছে যারা আমাদের কয়েক দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, টেকনোক্র্যাট, পুলিশ, আমলা, প্রশাসক, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক প্রভৃতি এ সমাজের সেরা সন্তান। বর্তমান ব্যবস্থা যা তৈরি করতে সক্ষম তার ক্রিম তারাই। আমরা কি এ ধরনের বিখ্যাত ব্যক্তিদের আরো চাই যারা মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে? যদি তা না হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষা, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে হবে যা এ ‘দুর্নীতির চ্যাম্পিয়নদের’ প্রতিস্থাপন করবে নিবেদিতপ্রাণ সেবকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে।
শিক্ষার্থীদের অবশ্যই শেখানো উচিত ভুল-সঠিকের ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য। তাদেরকে নৈতিকতা চর্চা করে ভালো মানুষ হতে হবে। শিক্ষকদের অবশ্যই জ্ঞানের রোল মডেল এবং সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। তাদেরকে ছাত্র সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে হবে।
দুর্নীতিগ্রস্ত জাতি হিসেবে পরিচিত দেশে বসবাস করা ও কাজ করা অবশ্যই একজন নীতিপরায়ণ মানুষের জন্য অপমানজনক। সারা বিশ্ব দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অবজ্ঞা করে। যে দেশ এত শহীদের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল, সেখানে দুর্নীতি করার সাহস করি কী করে? দুর্নীতি কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এসব শহীদের প্রতি লোক দেখানো সম্মান প্রদর্শন কেবল তামাশা হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশীদের একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশে বসবাসের অধিকার রয়েছে। কঠোরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা মূলোৎপাটন করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব সৎ ও আদর্শবান নেতা ও প্রশাসককে নিতে হবে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণের মাধ্যমে শহীদদের রক্ত ও জীবনকে আমরা সম্মান করতে পারি। এ সুযোগকে আমাদের জনকল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। এটা আমাদের তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন। আমরা যদি এখনই পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর না হই এবং দুর্নীতিকে পরিত্যাগ না করি তাহলে এটি হবে শহীদদের প্রতি অসম্মানের আরেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে নিম্নোক্ত সুপারিশ করা যেতে পারে—
১. বিগত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয়বহির্ভূত সম্পদের তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২. দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা এবং ওইসব অপরাধ বন্ধের জন্য রাষ্ট্রকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. প্রতিটি সরকারি অফিসের কর্মকর্তাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে যাতে অধস্তন কেউ দুর্নীতির সাহস না পায়।
৪. প্রতিটি সরকারি অফিসের সামনে একটা সাইনবোর্ড থাকবে এবং সেখানে দুর্নীতির অভিযোগ করার একটি যোগাযোগ নম্বর থাকবে। সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে ‘এ অফিসে সব ধরনের দুর্নীতি নিষিদ্ধ। কেউ ঘুস চাইলে উপরোক্ত ফোন নম্বরে সরাসরি কল করে অভিযোগ করুন।’
ড. শাহজাহান খান: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; প্রবাসী ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি (বিএএস)