গত চার দশকের বেশির ভাগ সময় চীনের অগ্রযাত্রার গতিপথ ছিল স্পষ্ট—সবকিছুই এগিয়ে যাচ্ছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ৩০০ ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই চীনের শহরগুলো আকাশচুম্বী ভবন, মহাসড়ক ও পাতালরেলে ভরে উঠতে থাকে। একসময় যেসব পরিবার পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকত, তারাই অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি ও স্মার্টফোন কিনতে শুরু করে। সন্তানরা এমন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়, যেখানে পড়ার কথা তাদের বাবা-মা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়, অলিম্পিক আয়োজন করে, বিশ্বের বৃহত্তম উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু মানুষের আয়ই বাড়ায়নি, বরং নিজেদের সম্পর্কে এবং ইতিহাসে নিজেদের অবস্থান নিয়েও চীনাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। বিদেশী আধিপত্যের সেই সময়কে চীনারা ‘অপমানের শতাব্দী’ বলে অভিহিত করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৩০-এর দশকে জাপানের আগ্রাসন পর্যন্ত বিস্তৃত এ সময়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সভ্যতা হিসেবে পরিচিত চীনকে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নামতে হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোর ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ জাতীয় পুনরুত্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
মানসিকতার এ পরিবর্তন ছিল স্পষ্ট। চীনারা ক্রমেই আমেরিকান, ইউরোপীয় ও জাপানিদের এমন এক সমৃদ্ধ বিশ্বের বাসিন্দা হিসেবে দেখা বন্ধ করে দেয়, যাদের নাগাল পাওয়া কঠিন; বরং তাদের নিজেদের সমকক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে। প্রশ্নটিও বদলে যায়। চীন অন্যদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যবধান ঘোচাতে পারবে কিনা, সেই প্রশ্নের বদলে সামনে আসে—বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে আর কত সময় লাগবে।
কিন্তু চীনের সেই আত্মবিশ্বাসে আবার পরিবর্তন এসেছে। চীন নিঃসন্দেহে বিশাল অর্থনীতির দেশ, উৎপাদন খাতের পরাশক্তি এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মানসিকতার জায়গায় কিছু একটা বদলে গেছে। অব্যাহত উন্নতির স্বাভাবিক প্রত্যাশা ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, আর যে আবাসন খাতের উত্থান বহু পরিবারকে নিজেদের আগের চেয়ে সচ্ছল মনে করার সুযোগ দিয়েছিল, সেই উত্থানও থমকে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের জন্য চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে, কিংবা অনেকে তা থেকে সরে আসছেন। কঠোর কভিড-১৯ বিধিনিষেধ আরোপ এবং পরে আকস্মিকভাবে তা প্রত্যাহারের ঘটনাও নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করেছে, বিশেষত তরুণ শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
চীনের তরুণ প্রজন্মের বাবা-মায়েদের জীবনে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে মিলেছিল অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক রূপান্তর। কিন্তু আজকের তরুণদের সামনে এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালিয়েও হয়তো একটি সাধারণ জীবন নিশ্চিত করা যাবে না। শৈশব থেকে যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা বেড়ে উঠেছেন, বাস্তবতা প্রায়ই তার চেয়ে অনেক কম প্রাপ্তি এনে দিচ্ছে। এ ব্যবধান তাদের হতাশ করছে।
এ অভিজ্ঞতা শুধু চীনের নয়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি সমন্বিত মধ্যম পারিবারিক আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। লাখ লাখ পরিবারের কাছে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ছিল ক্রমাগত উন্নত জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা—ভালো চাকরি, বেশি মজুরি এবং সন্তানরা একই রকম কিংবা আরো ভালো সুযোগ পাবে, এমন যুক্তিসংগত প্রত্যাশা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রভাবশালী অর্থনীতি গড়ে তোলে, চাঁদে মানুষ পাঠায় এবং মুক্ত বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু সাফল্যের এ ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়তে শুরু করে ১৯৭০-এর দশকে। আয় স্থবির হয়ে পড়ে এবং ১৯৭৫ সালে বেকারত্বের হার বেড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়। কর্মহীন হয়ে পড়ে প্রায় ৮০ লাখ আমেরিকান। জ্বালানি তেলের ধাক্কা, মূল্যস্ফীতি ও একের পর এক অর্থনৈতিক মন্দা মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করে যে যুদ্ধ-পরবর্তী অসাধারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতির যন্ত্রটি আর আগের মতো কাজ করছে না। একই সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং পরে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় করে দেয়।
জাতীয় মানসিকতার এ পরিবর্তন ছিল নাটকীয়। ১৯৬৪ সালে ৭৭ শতাংশ আমেরিকান মনে করত, কেন্দ্রীয় সরকার সব সময় বা অধিকাংশ সময় সঠিক কাজটি করে। মাত্র এক দশক পর এ হার নেমে আসে ৩৬ শতাংশে। সত্তরের দশকের শেষ নাগাদ তা দাঁড়ায় প্রায় ২৫ শতাংশে। যুক্তরাষ্ট্র তখনো অসাধারণ ধনী ও শক্তিশালী দেশ, কিন্তু অব্যাহত অগ্রযাত্রার অনুভূতিটি আর ছিল না। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বিখ্যাত এক ভাষণে দেশটির এ পরিস্থিতিকে ‘আত্মবিশ্বাসের সংকট’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আমেরিকানরা নিজেদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও ইতিহাসের গভীর পার্থক্য সত্ত্বেও, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সাফল্য চীনা ও আমেরিকান—উভয় জনগোষ্ঠীকেই এমন শিক্ষা দিয়েছিল যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি যেন অবশ্যম্ভাবী। পরবর্তী প্রজন্মকে কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখতে হয়েছে, বাস্তবে তা মোটেও অবশ্যম্ভাবী নয়।
আজ চীনের সামনে প্রশ্ন হলো অগ্রগতি যখন মন্থর, অসম ও কম রূপান্তরমূলক হয়ে ওঠে, তখন কী ঘটে? অসাধারণ প্রবৃদ্ধিতে অভ্যস্ত একটি সমাজ কি অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনামূলক সাধারণ গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়, এমন পরিবর্তন মানুষের মানসিকতায় দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে, এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্মের জীবন যে আগের চেয়ে ভালো হবে—এ বিশ্বাস দুর্বল হতে পারে। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের উন্নতি ঘটাতে পারে, সেই আস্থাও কমে যেতে পারে।
বর্তমানে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আমেরিকান মনে করে, আজকের তরুণরা বড় হয়ে তাদের বাবা-মায়ের তুলনায় আর্থিকভাবে খারাপ অবস্থায় থাকবে। ২০১৪ সালে ৩৮ শতাংশ আমেরিকান বলেছিল, কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় সংকল্প সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। এক দশক আগে এ হার ছিল ২৮ শতাংশ। আর ২০২৬ সালে অর্ধেক আমেরিকান মনে করেছে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগের যে ধারণা ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ হিসেবে পরিচিত, তা আর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু বস্তুগত অর্জনের বিষয় নয়, এটি মানুষকে আশা ও জীবনের দিকনির্দেশনাও দেয়। অবশ্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থা এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-পরবর্তী অগ্রযাত্রা যখন থমকে যেতে শুরু করে, তখন দেশটি চীনের বর্তমান অবস্থানের তুলনায় অনেক বেশি ধনী ছিল। তা সত্ত্বেও উভয় দেশই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি—অসাধারণ অগ্রগতির যুগের অবসানের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে বাধাগ্রস্ত অগ্রযাত্রার মানসিক অভিঘাত সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীন কেবল এখনই তার পরিবর্তিত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। অধিকাংশ সমাজই মন্থর প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ব্যাপকভাবে যদি এমন বিশ্বাস জন্ম নেয় যে চেষ্টা করে আর কোনো লাভ নেই, তাহলে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ন্যান্সি কিয়ান: নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির গ্লোবাল পোভার্টি রিসার্চ ল্যাবের সহপরিচালক