বিশ্ব খাদ্য দিবস

সবার জন্য নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। বিশ্বব্যাপী সচেতনতা, ক্ষুধার মোকাবেলা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করার সংকল্পকে উদ্দেশ্য করে দিনটি পালিত হয়।

আমার দুই সন্তান। বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর। আর ছেলের দুই বছর। বড় মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের স্কুলে টিফিন থেকে শুরু করে খাবার নিয়ে আমার চিন্তা বাড়ছেই। কী খেলে তাদের শরীর ভালো থাকবে, খরচ কম হবে, খেতে ভালো লাগবে, এসব নিয়েই আমার মতো অনেক বাবার চিন্তা। সেটা স্বাভাবিকও বটে। কারণ হচ্ছে শিশুর খাদ্যাভ্যাস। আজ আমরা আমাদের শিশুদের যা খাওয়াচ্ছি তা কতটা মনুষ্য খাদ্য হিসেবে গ্রহণীয় তা-ই বিরাট প্রশ্ন। খাবার যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে তা শরীরের সুস্থতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে পড়ে। কারণ খাবারে সামান্য গরমিল হলেই সেখান থেকে পেটের পীড়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এটি সত্য, সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে শিশুকে আমরা নানা ধরনের খাবারের প্রতি অভ্যস্ত করে তুলছি, যা পুষ্টিকর তো নয়ই, বরং অনেক ক্ষেত্রে শিশুর স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। তাছাড়া আমরা কী খাচ্ছি? কী খাওয়াচ্ছি? আপনি আদর করে আমার পাতে কী তুলে দিচ্ছেন? এক কথায় উত্তর হচ্ছে ভেজালযুক্ত খাবার। ভেজালযুক্ত খাদ্য থেকে আমি-আপনি মুক্তি চাইলেও যেন কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছি না। তবে একদিনে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, অসাধু ও অতি মুনাফালোভী ব্যক্তিদের ফলে মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। বিশ্বব্যাপী সচেতনতা, ক্ষুধার মোকাবেলা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করার সংকল্পকে উদ্দেশ্য করে দিনটি পালিত হয়। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০তম সাধারণ সভায় হাঙ্গেরির তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. প্যাল রোমানি বিশ্বব্যাপী দিনটি উদযাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তার প্রস্তাবের পর ১৯৮১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকতা আর প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্ব খাদ্য দিবস উদযাপন শুরু হয়। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। সে তারিখ অনুযায়ী বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য খাদ্যের অধিকার’। অবশ্যই বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এ বছর দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা খাদ্যের অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। শুধু তা-ই নয় বরং অন্যান্য মানবাধিকার পূরণের জন্যও খাদ্য অধিকার নিশ্চিতকরণ অপরিহার্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে সব নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা। আবার সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে জনগণের ‘পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জন স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে’। সেই হিসেবে এমন একটি দিনে বাংলাদেশ নতুন করে প্রতিজ্ঞা নিতে পারে, যেন আগামী দিনগুলোয় সবার মুখে নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য তুলে দেয়ার সংস্থান করতে পারে।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুস্থ-সবল জাতি গঠন এবং সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই। শিশুরা যদি স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার না খায়, তাহলে তারা ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে না, বরং কোনো রকমে বেঁচে থাকে। এ কারণেই ‘কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড’ বা শিশুর অধিকারবিষয়ক সনদে ঘোষণা করা হয়েছে, প্রতিটি শিশুরই স্বাস্থ্যকর খাবার ও পুষ্টি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। প্রকৃতি থেকে আহরিত খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের খুব বেশি চিন্তা করতে হয় না। কিন্তু অধিক মুনাফার আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের বিবেক বিসর্জন দিয়ে খাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে, মাছ থেকে শুরু করে ফলমূল, চিপস, শিশুখাদ্য, জুস সব খানেই ভেজালের ছড়াছড়ি। নিরাপদ খাবার যেন কোথাও নেই।

শিশুর বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, শিশুকে নিয়ে বাইরে গেলে পরিচিত কোনো একজন তার হাতে একটা চিপস কিংবা চকোলেট ধরিয়ে দিচ্ছে। আবার আমরাও অনেকে দীর্ঘ সময় পর বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে শিশুর জন্য চকোলেট বা এ-জাতীয় খাবার নিয়ে আসি। এমনকি আত্মীয়-স্বজনও শিশুর জন্য বিস্কুট, চানাচুর, চকোলেট, আইসক্রিম আনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে শিশু মহাখুশি হচ্ছে। কিন্তু এভাবে তার স্বাস্থ্যগত কী পরিমাণ ক্ষতি করছি, তা বলা বাহুল্য। শুধু কী চকোলেট, চিপসের সমস্যা। সমস্যা রয়েছে সব জায়গায়। শহর কিংবা গ্রামের স্কুলের গেটে অনিরাপদ খাদ্যের সমারোহ থাকে। এসব খাদ্য খোলা থাকে। খাবারে ধুলাবালি পড়ে এবং মাছিসহ নানা ধরনের জীবাণুর সংমিশ্রণ ঘটে এসব খাবারের সঙ্গে। দুঃখজনকভাবে শিশুদের কাছে এটি প্রিয় খাবার। কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় না খাবারগুলো শিশুদের জন্য খাদ্যোপযোগী করে পরিবেশন করতে।

এসব আমাদের জানা-বোঝার বাইরে নয়। কিন্তু তার পরও এসব খাবার কিনতে ও খেতে হয়। স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে ও অন্যের বিনা প্ররোচনায় আমরা ধীরে ধীরে আত্মঘাতী পথ বেছে নিই। আমাদের খাদ্য আদালত আছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আছে, খাদ্য পরীক্ষাগার আছে, খাদ্য বিশ্লেষক আছে, খাদ্য পরিদর্শক ও পরিষদ আছে, আছে ফৌজদারি কার্যবিধি এমনকি দণ্ডবিধিও। কিন্তু সবার ওপরে যা আছে তা হলো খাদ্য ব্যবসা ও ভেজাল খাদ্য—এসবই ওই আইনের শব্দযুগল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সবকিছুর ওপর খাদ্য ব্যবসায়ীদের নকল ও ভেজাল খাদ্যের ব্যবসাই বুঝি জয়ী হচ্ছে।

সম্প্রতি বনানী স্টার কাবাবে কাচ্চি বিরিয়ানির সঙ্গে পচা ও বাসি টিক্কা দেয়ায় প্রতিবাদ করায় গ্রাহককে ব্যাপক মারধর করেছিল হোটেলটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। পরবর্তী সময়ে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ ও স্টার কাবাব পরিবার নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। সব দোষ কিন্তু কেবল ব্যবসায়ীদের একা নয়। আমাদেরও রয়েছে। ভোক্তা অধিকার আইনের অধীনে আমরা ক’জন অভিযোগ করেছি? আদালত পর্যন্ত না-ই গেলাম। সেই সঙ্গে জেনে-শুনে পচা-বাসি খাবার কি না খেলেই নয়? নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের কথা একবার ভাবুন। আর যারা এসব ভেজালের সঙ্গে জড়িত তারাও একটু ভাবুন। কারণ সবাই ভোক্তা। ভুক্তভোগীও সবাই। এভাবে ভেজাল ও পচা-বাসি খাওয়ানো ও তার বাণিজ্য গুরুতর নৈতিকতার খেলাপ, অমানবিক ও দণ্ডনীয় তো বটেই।

আসলে খাদ্যপণ্যে ভেজাল আমাদের জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় ঢাকা শহরের ৭০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৫০ শতাংশ খাদ্যে রাসায়নিক ও ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।৷ সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের ৩৩ শতাংশ রোগের মূল কারণ ভেজাল খাদ্য৷ মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া। এ সমস্যা শুধু মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করছে না বরং জাতীয় উন্নতিও বাধাগ্রস্ত করছে। কারণ খাদ্যে ভেজাল অসংখ্য জীবনঘাতী ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করছে। ভেজাল খাদ্যের কারণে ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের অসুখ, হাঁপানি ইত্যাদি জটিল রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উপরন্তু ভেজাল খাদ্যের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে খাদ্যের কারণে সৃষ্ট গণ্ডগোলের পর নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা ওঠে। জনগণও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু প্রশাসন একেবারে বসেও থাকে না। বিভিন্ন দোকান, হোটেল, সুপারশপে অভিযান চালায়। কয়েক ঘণ্টায় কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গণমাধ্যমে সে খবর নিয়ে আমরা জনতা একটু কথাবার্তা বলি। তারপর আবার যা তা-ই। মাঝখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কিছু অর্থকড়ি জমা হয়, কিন্তু আমজনতার পোড়া তেলের মতোই ‘পোড়া কপাল’। এত পোড়ে তা-ও শেষ হয় না। ২০১৩ সালে সরকার নিরাপদ খাদ্য আইন পাস করে। এরপর ২০১৫ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সংস্থাটি পুরোদমে কাজ শুরু করতে পেরেছে ২০২০ সাল থেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ খাবারের ব্যাপারে সর্বপ্রথম সচেতনতা শুরু হওয়া উচিত নিজেদের ঘর থেকে। কারণ রান্না করা বা কাঁচা খাবার কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, খাবারের বিষক্রিয়া এড়াতে করণীয় কী, একই খাবার বারবার রান্না করলে খাবারের গুণমান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিনা—এ রকম নানা বিষয়ে যদি মানুষ শুরু থেকেই সচেতন থাকে, তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়ানো সম্ভব।

খাবার নিরাপদ রাখতে যেসব পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, তার মধ্যে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, খাবার ভালোভাবে রান্না করা, খাবারকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখা এবং রান্নার সময় নিরাপদ পানি ও নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার করা।

সরকারের যেসব সংস্থা বিভিন্ন অনুমতি দিয়ে থাকে, তাদের ঠিকমতো কাজ করতে হবে। যদি কোনো ক্রেতার কোনো খাবারকে অনিরাপদ মনে হয়, তবে তারা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অফিসে সরাসরি এসে কিংবা ই-মেইলে অভিযোগ জানাতে পারে। তাছাড়া সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেয়া বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাদের ফোনেও অভিযোগ জানাতে পারবে। এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার আমাদের সচেতনতা।

এবার খাদ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। পর্যাপ্ত খাদ্য জোগানের প্রচেষ্টায় দেশ অনেকটা দূর এগিয়েছে। জমিতে কীটনাশকের প্রয়োগ কমিয়ে সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই আগামী লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ভোক্তাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা সচেতন না হলে শুধু আইন করেও খাদ্যপণ্য ভেজালমুক্ত করা সম্ভব নয়। ভেজাল রুখতে হলে মনে রাখতে হবে যে আমরা সবাই ভোক্তা। উৎপাদক-ব্যবসায়ী থেকে ভোক্তা সবার সচেতনতার বিকল্প নেই।

মো. বশিরুল ইসলাম: কৃষিবিদ ও উপপরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও