কভিড-১৯-এর
মারাত্মক ঝড়,
জলবায়ু পরিবর্তন
এবং এর
ফলে সৃষ্ট
অর্থনৈতিক ক্ষতি
অনেক বেশি
সামাজিক ও
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা
সৃষ্টি করবে
বলে আশঙ্কা
রয়েছে। তবে
উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা
বৃদ্ধির মাধ্যমে
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো
দুঃসহ পরিস্থিতি
এড়াতে পারে।
তাছাড়া বিশ্বরাজনীতির
বিদ্যমান অবস্থাও
আমাদের ইতিবাচক
বার্তা দেয়।
এটাই চরম
বিপর্যস্ত পরিস্থিতি।
কভিড-১৯-এর
ঝড় আর
জলবায়ু পরিবর্তনের
ভয়ানক প্রভাবগুলো
আমাদের দরজায়
এসে কড়া
নাড়ছে। এ
বছর কিংবা
পরের কয়েক
বছরের মধ্যে
মহামারীমুক্ত হওয়ার
সম্ভাবনাও নেই।
নভেল করোনাভাইরাসের
একের পর
এক বদলে
যাওয়া ধরন
সংক্রমণের মাত্রা
বাড়িয়ে দিচ্ছে,
ক্রমেই তা
টিকা প্রতিরোধী
হয়ে উঠছে।
তাই জলবায়ু
বিপর্যয় আর
‘ভবিষ্যৎ’-এর
কোনো বিষয়
নয়, চলমান
বাস্তবতা।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক
আন্তঃসরকারীয় প্যানেলের
সর্বশেষ প্রতিবেদন,
যা বিগত
বছরগুলোর জলবায়ু
পরিস্থিতির মূল্যায়ন
করে—আমাদের
জানাচ্ছে যে
জলবায়ু পরিবর্তনের
তীব্র প্রভাবগুলো
আজ আর
পরিবর্তনযোগ্য নয়;
যা প্রতিটি
অঞ্চলকে প্রভাবিত
করবে, যার
প্রমাণ বিশ্বের
বিভিন্ন অঞ্চলে
তাপপ্রবাহ, দাবানল
ও ভয়াবহ
বন্যা পরিস্থিতি।
এ ধরনের
বিপর্যয় প্রকৃতি
ও প্রাণিকুলের
বিভিন্ন প্রজাতির
মারাত্মক ক্ষতি
করছে এবং
মানুষের জীবনের
সম্ভাবনা ও
অবস্থার ওপর
বিরূপ প্রভাব
ফেলছে।
আমরা যদি
বৈশ্বিক তাপমাত্রা
বৃদ্ধির পরিমাণকে
একটি শোভন
মাত্রায় রাখতে
চাই (এমনকি
২০১৫ সালের
প্যারিস চুক্তি
অনুযায়ী ১
দশমিক ৫
ডিগ্রি সেলসিয়াস),
সেক্ষেত্রে আমাদের
ব্যাপক প্রচেষ্টার
প্রয়োজন পড়বে।
এর মধ্যে
একটি যেমন
যথাসম্ভব দ্রুততার
সঙ্গে প্রায়
প্রতিটি দেশের
অর্থনৈতিক নীতির
পরিবর্তন। সবচেয়ে
বড় যে
পরিবর্তনের মধ্য
দিয়ে যেতে
হবে, তা
হচ্ছে বৈশ্বিক
আইনি ও
অর্থনৈতিক কাঠামোর
বড় ধরনের
পরিবর্তন সাধন।
মহামারীর কারণে
কর্মসংস্থান ও
জনজীবন ভীষণভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ
করে উন্নয়নশীল
দেশের লাখো
মানুষকে ক্ষুধা
ও দারিদ্র্যের
দিকে ঠেলে
দিয়েছে এ
মহামারী। আন্তর্জাতিক
শ্রম সংস্থার
ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট
অ্যান্ড সোস্যাল
আউটলুক ট্রেন্ডস
২০২১-এ
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি
বিস্তৃতভাবে তুলে
ধরেছে। ২০২০
সালে মহামারীটি
বৈশ্বিক কর্মঘণ্টার
প্রায় ৯
শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত
করে, যা
২৫৫ মিলিয়ন
পূর্ণকালীন চাকরির
সমতুল্য। ২০২১
সালেও এ
প্রবণতা বিরাজমান,
বছরের প্রথম
ও দ্বিতীয়
প্রান্তিকে যে
পরিমাণ কর্মঘণ্টা
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,
তা যথাক্রমে
১৪০
ও ১২৭
মিলিয়ন পূর্ণকালীন
চাকরির সমান।
বর্তমান কর্মসংস্থান
বৃদ্ধির যে
ধরনের প্রবণতা
আমরা দেখতে
পাচ্ছি, তা
এসব ক্ষতি
কাটিয়ে ওঠার
জন্য একেবারেই
যথেষ্ট নয়।
এমনকি ২০২২
সালেও মোট
কর্মসংস্থান ২০১৯
সালের তুলনায়
কম হবে,
যা ২৩
মিলিয়ন পূর্ণকালীন
চাকরির সমান।
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের
প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও
এমনটা হচ্ছে,
এর মানে
দাঁড়ায় পিছিয়ে
পড়া অঞ্চলগুলোয়
শ্রমবাজারের মন্দাবস্থা
আরো তীব্র
ও প্রগাঢ়
হবে। তাছাড়া
মহামারী থেকে
পুনরুদ্ধারের সঙ্গে
যুক্ত ‘নতুন’
কাজগুলো সাধারণত
কম মজুরির
ও নিম্নমানের
হবে। এর
মধ্যে আবার
দেশগুলোর মধ্যে
অর্থনৈতিক বৈষম্য
এমন একটি
পর্যায়ে পৌঁছেছে,
যা প্রাক-মহামারীর
আগের অসম
বিশ্বের জন্য
কল্পনা করা
কঠিন ছিল।
অনেকে উল্লেখযোগ্য
পরিমাণে আয়
হারিয়েছেন, ফলে
তারা নিজেদের
ও পরিবারের
মৌলিক চাহিদা
পূরণে হিমশিম
খাচ্ছেন। বিভিন্ন
ধরনের বঞ্চনা
বাড়ছে। বিশ্বের
বেশির ভাগ
সম্পদ অল্প
কিছু মানুষের
হাতে কুক্ষিগত।
এর চেয়েও
বেশি সম্পদ
ও আয়
দখল করে
আছে হাতেগোনা
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
কভিড পরিস্থিতির
মধ্যেও তাদের
সম্পদের পরিমাণ
কয়েক গুণ
বেড়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয়
ধনী (কয়েক
দিন আগেও
তিনি শীর্ষ
ধনী ছিলেন)
জেফ বেজোস
সম্প্রতি মহাকাশে
কয়েক মিনিটের
ভ্রমণ বাবদ
৫ দশমিক
৫ বিলিয়ন
ডলার ব্যয়
করেছেন; ভোগের
নতুন প্রবণতা
আক্ষরিক অর্থে
পৃথিবীর সীমা
ছাড়িয়ে গেছে।
কয়েক মিনিটের
মহাকাশ দর্শন
না করে
তিনি বরং
ওই অর্থটা
বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯
টিকাবিষয়ক উদ্যোগ
কোভ্যাক্সকে দান
করতে পারতেন।
উল্লিখিত অর্থে
বিশ্বের দরিদ্র
দেশগুলোর দুই
বিলিয়ন লোককে
করোনার টিকা
দেয়া যেত,
বর্তমান অবস্থায়
এ টিকা
পেতে তাদের
এখনো দুই
বছরের মতো
সময় লাগবে।
তাছাড়া বড়
ধরনের সামাজিক
অসন্তোষ কিংবা
নাগরিক বিশৃঙ্খলা
ছাড়াই রাষ্ট্রগুলো
স্বাভাবিকভাবে তাদের
কার্যক্রম চালিয়ে
নিতে পারবে—এমনটা
ভেবে নেয়াটাও
বড় ধরনের
বোকামি হবে।
স্বাভাবিকভাবেই করোনার
প্রভাব দেশগুলোর
রাজনীতি, অর্থনীতি
ও জনজীবনে
পড়বে। তাছাড়া
বর্তমানে আমরা
যে ধরনের
অভিজ্ঞতার মুখোমুখি
হচ্ছি, অচিরেই
তা আরো
সামাজিক ও
রাজনৈতিক অস্থিরতা
তৈরি করবে।
আমরা যদি
খুবই দ্রুততার
সঙ্গে প্রগতিশীল
ও রূপান্তরিত
কর্মসূচি গ্রহণ
করতে অপারগ
হই, তাহলে
তা জাতিগত,
সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব,
সহিংসতা ও
বিশৃঙ্খলার দিকে
মোড় নিতে
পারে।
কয়েকটি মূল
বিষয়কে গুরুত্ব
দিয়ে টেকসই
আন্তর্জাতিক সহায়তা
বৃদ্ধির মাধ্যমে
আমরা ভয়াবহ
ভবিষ্যেক এড়াতে
পারি। সেক্ষেত্রে
জলবায়ু পরিবর্তনের
প্রভাবের বিপরীতে
সরকারগুলোকে এক
জোট হয়ে
ঘোষণা করতে
হবে তারা
অবশ্যই কার্বন
ডাই-অক্সাইড
নিঃসরণের পরিমাণ
কমাবে, এবং
আগামী কয়েক
দশক নয়,
মাত্র এক
দশকের মধ্যে
অন্যান্য গ্রিনহাউজ
গ্যাস নির্গমনের
মাত্রা কমিয়ে
দ্রুত শূন্য
কার্বন নিঃসরণের
লক্ষ্য অর্জন
করবে।
উচ্চমাত্রায় কার্বন
নিঃসরণকারী ধনী
দেশগুলোকে অবশ্যই
কোনো ধরনের
শর্ত ছাড়া
উন্নয়নশীল দেশে
সবুজ প্রযুক্তি
সরবরাহ করতে
হবে, এতে
আমরা দ্রুত
কার্বন নিঃসরণের
পরিমাণ কমাতে
পারবো। জলবায়ু
অভিযোজনবিষয়ক সহায়তা
তহবিল এক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখতে পারে।
তাছাড়া প্রস্তাবিত
বৈশ্বিক সরকারি
বিনিয়োগের মাধ্যমে
এক্ষেত্রে দ্রুত
পদক্ষেপ গ্রহণ
করা সম্ভব।
এ মহামারী
নিয়ন্ত্রণ করতে
আমাদের যত
দ্রুত সম্ভব
উৎপাদিত টিকা
মজুদ না
করে পুনর্বণ্টনের
ব্যবস্থা করতে
হবে। পাশাপাশি
লাইসেন্স বিকেন্দ্রীকরণের
মাধ্যমে ব্যাপক
পরিসরে টিকা
উৎপাদনের আইনি
বাধাগুলো দূর
করতে হবে।
এছাড়া যেসব
ওষুধ কোম্পানি
কভিড-১৯
টিকা উন্নয়নের
ভর্তুকি থেকে
লাভবান হয়েছে,
তাদের অবশ্যই
টিকার প্রযুক্তি
অন্যান্য উৎপাদকারী
প্রতিষ্ঠানের কাছে
সরবরাহ করতে
হবে, যেমনটা
বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার ‘সবার
জন্য স্বাস্থ্য’
লক্ষ্যমাত্রায় বলা
হয়েছে। ভবিষ্যতের
মহামারী ও
অন্যান্য স্বাস্থ্য
সংকট কার্যকরভাবে
মোকাবেলা করার
জন্য সরকারি
খাতসহ অন্যান্য
ক্ষেত্রে স্থিতিস্থাপক
এবং বিকেন্দ্রীভূত
উৎপাদন সক্ষমতা
তৈরি করা
জরুরি।
অর্থনৈতিক নীতি
বাস্তবায়নের জন্য
প্রয়োজন বৈশ্বিক
কর সহযোগিতা।
নিয়মটা কিন্তু
সহজ। আর
তা হচ্ছে,
বহুজাতিক কোম্পানিগুলো
সম্পূর্ণরূপে দেশীয়
প্রতিষ্ঠানগুলোর সমান
কর প্রদান
করবে। পাশাপাশি
তারা দেশগুলোর
মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে
মুনাফার পরিমাণ
ভাগ করে
নেয়ার বিষয়টি
নিশ্চিত করবে।
এতে বৈষম্য
কমবে এবং
আর্থিকভাবে পিছিয়ে
থাকা উন্নয়নশীল
অর্থনীতি প্রয়োজনীয়
সম্পদ পাবে।
আন্তর্জাতিক সার্বভৌম
ঋণ নিষ্পত্তি
প্রক্রিয়া উন্নয়নশীল
অনেক দেশের
আর্থিক বোঝা
কমাবে এবং
জরুরি ব্যয়ের
জন্য সুযোগ
তৈরি করবে।
তবে এর
জন্য ক্রস-বর্ডার
ফাইন্যান্স ও
ক্রেডিট রেটিং
এজেন্সিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের
পাশাপাশি কিছু
শর্ত জুড়ে
দিতে হবে।
এছাড়া এমন
অবস্থার প্রবর্তন
করতে হবে
যেন সামাজিক
প্রয়োজনে আর্থিক
প্রতিষ্ঠানগুলো সাড়া
দেয়। আর
তা নিশ্চিত
করতে আন্তর্জাতিক
নিয়ন্ত্রক সংস্থার
প্রয়োজন হবে।
দুর্ভাগ্যবশত, বৈশ্বিক
রাজনীতির বর্তমান
অবস্থা আমাদের
ইঙ্গিত দেয়
যে গুরুত্বপূর্ণ
ও জরুরি
এ এজেন্ডাগুলো
বাস্তবায়ন হওয়ার
খুব একটা
সম্ভাবনা নেই।
বিশ্বের বড়
বড় দেশের
দেশগুলোর নেতাদের
কর্মকাণ্ড দেখলে
আমরা যদিও
কোনোভাবে আশাবাদী
হতে পারি
না। তারা
বরং কথার
ফুলঝুরি সাজাতে
ব্যতিব্যস্ত, মহামারীর
মতো সংকটকেও
তারা কাজ
নয়, কথা
দিয়ে নিয়ন্ত্রণ
করতে চান।
তাছাড়া ব্যক্তি
মূলধন আর
কায়েমি স্বার্থের
কাছে বশ্যতা
স্বীকার করে
তারা এখন
স্থানীয় আর
জাতীয় পরিসর
ঘিরেই ঘুরপাক
খাচ্ছে।
বর্তমান নাজুক
বিশ্ব পরিস্থিতি
সামলানোর পরিবর্তে
জি৭ রাষ্ট্রগুলো
চীনের উত্থান
ঘিরে বেশি
মনোযোগী, যা
আরো বেশি
হতাশাজনক। তাছাড়া
কভিড-১৯
টিকাকে জাতীয়তাবাদী
দৃষ্টিকোণ থেকে
দেখার বিষয়টি
আরো বেশি
সংকীর্ণ মানসিকতার
প্রমাণ। এদিকে
মেধাস্বত্ব আইন
বিষয়ে তাদের
অবস্থান ব্যক্তিমালিকানাধীন
প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুনাফা
নিশ্চিতের জন্য
টিকা প্রযুক্তি
সরবরাহ না
করা ও
উৎপাদন সীমিত
করার পক্ষে।
তাদের এ
অবস্থান আস্থা
হ্রাস এবং
মহামারী মোকাবেলায়
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ব্যাহত করছে।
বিশ্বমানবতার সামনে
পতনের প্রান্ত
থেকে সরে
আসার সুযোগ
এখনো আছে।
আমরা কি
তা করব
নাকি ভবিষ্যৎ
কোনো প্রজাতিকে
ভাবার সুযোগ
করে দেব
যে আমরা
মানুষেরা কেন
নিজেদের ধ্বংসযজ্ঞে
সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ
করাটাই বেছে
নিলাম?
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জয়তী ঘোষ: ভারতের
জওহরলাল নেহরু
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক;
ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট
ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের
এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি
এবং ইনডিপেনডেন্ট
কমিশন ফর
দ্য রিফর্ম
অব ইন্টারন্যাশনাল
করপোরেট ট্যাক্সেশনের
সদস্য
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস