আমদানি পণ্যের দাম কি সত্যিই বাড়ছে

একই টাকায় যদি বেশি সেবা পাওয়া যায়, তাহলে প্রকৃত দাম আসলে কমেছে। কিন্তু আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরো যখন ভোক্তা মূল্যসূচক তৈরি করে, তখন কেবল নামমাত্র দামের দিকে তাকায়—ফোনের দাম ১৫ হাজার ছিল, এখনো ১৫ হাজার, অতএব মূল্যস্ফীতি শূন্য। এ যে হিসাবের গলদ, অর্থনীতিবিদরা একে বলেন মান-বিচ্যুতি বা কোয়ালিটি বায়াস। আর এ সমস্যা শুধু ইলেকট্রনিকসে নয়—গাড়ি, ওষুধ, আবাসন, এমনকি স্বাস্থ্যসেবাতেও একইভাবে প্রযোজ্য।

আজ থেকে ১০ বছর আগে ১৫ হাজার টাকায় যে স্মার্টফোন পাওয়া যেত, তাতে ছিল ২ জিবি র‍্যাম আর ১৬ জিবি স্টোরেজ। একই দামে আজকের ফোনে মিলছে ৮ জিবি র‍্যাম, ১২৮ জিবি স্টোরেজ, ৫০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, এমনকি ৫জি সংযোগও। সংখ্যার হিসাবে দাম স্থির আছে। কিন্তু একই টাকায় ক্রেতা এখন অনেক বেশি সেবা পাচ্ছেন। তাহলে প্রকৃত অর্থে দাম কি বেড়েছে, না কমেছে?

অর্থনীতিতে এ ধারণাটিকে বলা হয় মানোন্নয়ন বা কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট। বিষয়টি সহজ: একই টাকায় যদি বেশি সেবা পাওয়া যায়, তাহলে প্রকৃত দাম আসলে কমেছে। কিন্তু আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরো যখন ভোক্তা মূল্যসূচক তৈরি করে, তখন কেবল নামমাত্র দামের দিকে তাকায়—ফোনের দাম ১৫ হাজার ছিল, এখনো ১৫ হাজার, অতএব মূল্যস্ফীতি শূন্য। এ যে হিসাবের গলদ, অর্থনীতিবিদরা একে বলেন মান-বিচ্যুতি বা কোয়ালিটি বায়াস। আর এ সমস্যা শুধু ইলেকট্রনিকসে নয়—গাড়ি, ওষুধ, আবাসন, এমনকি স্বাস্থ্যসেবাতেও একইভাবে প্রযোজ্য।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের দুই অর্থনীতিবিদ মার্কো এরিকো ও দানিয়াল লাশকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, আমদানি পণ্যের মূল্যসূচকে এ মান-বিচ্যুতি হিসাবে না নিলে মূল্যস্ফীতি বছরে প্রায় দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি দেখায়। শুনতে সামান্য মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এ পার্থক্য বিশাল—তাদের হিসাবে প্রায় তিন দশকে এ ক্রমপুঞ্জিত বিচ্যুতি ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কম্পিউটার ও প্রযুক্তি পণ্যে এ সমস্যা আরো প্রকট—সরকারি হিসাবে দাম বহু গুণ বেড়েছে দেখালেও মানোন্নয়ন বিবেচনায় নিলে প্রকৃত দাম বরং কমেছে।

এ সমস্যা কেবল উন্নত দেশের নয়। ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মান-বিচ্যুতির প্রভাব সম্ভবত আরো বেশি। কারণ এসব দেশে প্রযুক্তি পণ্যের আমদানি দ্রুত বাড়ছে, অথচ মূল্যসূচকে মানোন্নয়ন সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। ১৯৯৬ সালে মার্কিন সিনেটের বসকিন কমিশন হিসাব করেছিল, মান-বিচ্যুতি ও নতুন পণ্য বিচ্যুতি মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বছরে প্রায় দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি দেখায়। জার্মানির ক্ষেত্রে এ বিচ্যুতি দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বলে অনুমান করা হয়েছে। ভারত বা বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা না হওয়ায় সঠিক পরিমাণ জানা নেই, তবে এটা বলা যায় যে সমস্যাটি এখানেও বিদ্যমান।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মোট আমদানির প্রায় ৩১ শতাংশ আসে চীন থেকে—এর মধ্যে বড় অংশ ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ। ভারত থেকে আসে আরো ১৩ শতাংশ, যার উল্লেখযোগ্য অংশ শিল্প যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য। এসব পণ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটে দ্রুত। আজকের একটি সিএনসি মেশিন ১০ বছর আগের মেশিনের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল ও দক্ষ, কিন্তু দাম হয়তো কাছাকাছিই আছে।

শুধু আমদানি নয়, দেশীয় উৎপাদনেও একই চিত্র। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প এখন বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে রফতানি করে। একই জেনেরিক ওষুধ এখন আগের চেয়ে উন্নত ফর্মুলেশনে, ভালো বায়োঅ্যাভেইলেবিলিটি নিয়ে বাজারে আসছে, অথচ দাম সেভাবে বাড়েনি। সিরামিক্স শিল্পে আগে যে মানের টাইলস রফতানিযোগ্য ছিল না, এখন সেই কারখানাগুলোই আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করছে। টেলিকম সেবায় ১০ বছর আগে যে দামে শুধু ভয়েস কল পাওয়া যেত, এখন সেই দামে ডেটা, ভিডিও কল সব মিলছে। এ মানোন্নয়নের কোনোটাই মূল্যসূচকে প্রতিফলিত হয় না।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সীমাবদ্ধতাও বোঝা দরকার। তারা এখনো মূলত ল্যাসপেয়ার্স সূচক পদ্ধতি ব্যবহার করে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তি বছরের ভোগ-ঝুড়ি ধরে রাখা হয়। পণ্যের বৈশিষ্ট্য বদলালে সেটা আলাদাভাবে হিসাব করার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে মূল্যস্ফীতির যে চিত্র আমরা দেখি, তা সম্ভবত প্রকৃত চিত্রের চেয়ে বেশি—বিশেষ করে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে। অবশ্য এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে, এটা বাস্তব। কিন্তু মান-বিচ্যুতি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। অবমূল্যায়নের প্রভাব মূল্যসূচকে ধরা পড়ে, মানোন্নয়নের প্রভাব পড়ে না।

একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। ধরা যাক, একটি টেক্সটাইল কারখানা ২০১৫ সালে চীন থেকে একটি সেলাই মেশিন কিনেছিল ৫ লাখ টাকায়। সেই মেশিনে ঘণ্টায় ৫০০ পিস তৈরি হতো। এখন একই দামে নতুন মডেলে ঘণ্টায় ১ হাজার ২০০ পিস তৈরি হয়, সঙ্গে আছে স্বয়ংক্রিয় ত্রুটি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা। মূল্যসূচকের হিসাবে দাম অপরিবর্তিত। কিন্তু প্রতি পিস উৎপাদনে মূলধন ব্যয়ের নিরিখে দাম অর্ধেকেরও কম হয়ে গেছে। এ পার্থক্য আমাদের সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

এ বিচ্যুতির সুদূরপ্রসারী নীতিগত প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি নির্ধারণ করে মূল্যস্ফীতির হার দেখে। মূল্যস্ফীতি যদি প্রকৃত হারের চেয়ে বেশি দেখায়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে পারে—সুদের হার বাড়াতে পারে, ঋণ সংকোচন করতে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে অযথা বাধা সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে

বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মূল্যস্ফীতির হিসাবে যদি ঊর্ধ্বমুখী বিচ্যুতি থাকে, তাহলে এ কঠোরতার একটি অংশ হয়তো অপ্রয়োজনীয়।

প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হিসাব করতে নামমাত্র জিডিপি থেকে মূল্যস্ফীতি বাদ দিতে হয়। মূল্যস্ফীতি বেশি দেখালে প্রবৃদ্ধি কম দেখায়। ফলে আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য অযথাই খাটো হয়ে যায়। একইভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় সূচক এবং প্রকৃত মজুরি হিসাবেও এ বিচ্যুতি প্রভাব ফেলে। সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা, পেনশন সমন্বয়, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ—সবই মূল্যসূচকের ওপর নির্ভরশীল। হিসাব ভুল হলে হয় সরকারি ব্যয় অযথা বাড়ে, নয়তো শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন।

উন্নত দেশগুলো এ সমস্যা সমাধানে হেডোনিক মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি ব্যবহার করে। এতে পণ্যের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য—যেমন প্রসেসরের গতি, মেমোরির পরিমাণ, স্ক্রিনের রেজল্যুশন—আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। তারপর হিসাব করা হয় যে সমতুল্য বৈশিষ্ট্যের জন্য গত বছর কত দিতে হতো, এ বছর কত দিতে হচ্ছে। এভাবে মানোন্নয়নের প্রভাব পৃথক করে প্রকৃত মূল্য পরিবর্তন বের করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশে এ পদ্ধতি চালু করা অসম্ভব নয়। সব পণ্যে একসঙ্গে না হলেও অন্তত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—যেমন ইলেকট্রনিকস, শিল্প যন্ত্রপাতি, মোটরযান—এগুলোতে হেডোনিক সমন্বয় শুরু করা যায়। এজন্য দরকার পরিসংখ্যান ব্যুরোর কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সঠিক পরিসংখ্যানের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার। তাছাড়া একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য এ বিচ্যুতির পরিমাণ নির্ণয় করা জরুরি, যাতে নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারেন সমস্যাটি কতটা গভীর।

মূল্যস্ফীতির হিসাব নিছক সংখ্যার খেলা নয়। এর ওপর নির্ভর করে কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, সরকারের রাজস্ব পরিকল্পনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি। ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতি সবার। প্রযুক্তি যত এগিয়ে যাবে, পণ্যের মান যত দ্রুত বদলাবে, এ সমস্যা ততই প্রকট হবে। মানোন্নয়ন সমন্বয়ের বিষয়টি তাই আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সৈয়দ আবুল বাশার: স্বতন্ত্র গবেষক ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক

আরও