পিকেএসএফের একটি অনন্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা বাংলাদেশের একমাত্র সংস্থা, যারা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড—এ তিন বৈশ্বিক তহবিল থেকেই স্বীকৃতি পেয়েছি। বাংলাদেশে ইডকল গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনটি তহবিলের স্বীকৃতি পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ কাজ।
বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোর আলোচনা ও বাস্তবতা থেকে মনে হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো অর্থায়নে অনিচ্ছুক। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি কঠোর বাস্তবতা। তাই কেবল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া অনুদানের ওপর নির্ভর করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করলে তা ভুল হবে। গত ১০-১২ বছরে আমরা প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ডলার অর্থ সংগ্রহ করতে পেরেছি, কিন্তু একেকটি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ছয়-সাত বছর লেগে যায়। তাই শুধু অনুদানের অপেক্ষায় না থেকে বিকল্প অর্থায়ন ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আমি পুরো জিনিসটাকেই একটু ভিন্নভাবে দেখতে চাই। ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রে একটি কথা আছে—‘আমরা যেকোনো অসুবিধাকে সুবিধায় রূপান্তর করতে পারি।’ কারণ প্রতিটা অসুবিধা বা প্রতিবন্ধকতার পেছনে কিন্তু সুবিধা ও সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আমরা মূলত তিন ভাগে দেখছি: দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দেশের বিভিন্ন অংশে বন্যা ও অতিবন্যা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও মরুময়তা।
এ সংকটগুলো আমাদের সামনে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করছে। যেমন লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে লবণ সহনশীল ফসলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কৃষি পদ্ধতি, ডিপ সেচ ও পানিসাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন বাড়ছে। আবার অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে শীতলীকরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি তাপ সহনশীল আবাসন ও নির্মাণ প্রযুক্তির চাহিদাও তৈরি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এ নতুন প্রয়োজনগুলোকে আমরা নতুন বাজারে পরিণত করতে পারি। এ নতুন বাজারের জন্য আমাদের অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস লাগবে। তা করতে পারলে একটি অধিকতর সৃজনশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই অর্থনীতির দ্বার খুলে যাবে। চলতি বছর অর্থনীতিতে যারা নোবেল পুরস্কার পেলেন, তাদের থিসিস অনুযায়ী যদি আমরা মানুষের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সিগন্যাল দিতে পারি যে ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ আসবে, তবে মানুষের ভোগের প্রকৃতি ও বিনিয়োগ আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি বা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থায়িত্বে বড় ভূমিকা রাখে।
এ নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আমাদের প্রধান প্রয়োজন জ্বালানি। পেট্রোলিয়ামভিত্তিক জ্বালানি অফুরন্ত নয়, বরং এর দামও ক্রমেই বাড়ছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। গত পাঁচ বছরে তারা প্রায় ৫০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তুলেছে এবং তিন-চার বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের পেট্রোলিয়াম আমদানি কমাতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে সৌর প্যানেলের দক্ষতা আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে প্যানেল, ইনভার্টার ও লিথিয়াম ব্যাটারির দামও অনেক কমেছে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের আওতায় পিকেএসএফ গ্রামীণ অঞ্চলের আট হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগে মোট ১ দশমিক ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। এতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব সামলে এসব উদ্যোগের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এর মাধ্যমে গ্রিড-বহির্ভূত জ্বালানি উৎপাদনকারী এক নতুন ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। তারা বহনযোগ্য সৌর প্যানেল ব্যবহার করে সেচকাজে ডিজেলের বিকল্প তৈরি করছে। সেচ মৌসুম শেষে একই প্যানেল চাতাল বা কৃষকের গুদামে ধান শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে অসময়ের বৃষ্টিতেও ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমছে। এর ফলে নানা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষ এতে সাড়া দিচ্ছে।
এ নতুন অর্থনৈতিক মডেল ও জ্বালানি রূপান্তরের জন্য অর্থায়ন প্রয়োজন। তবে প্রচলিত ব্যাংকনির্ভর মডেল দিয়ে তা সম্ভব নয়, কারণ ব্যাংকগুলো মূলত আমানতকারীদের স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে কাজ করে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন মিশ্র অর্থায়ন, প্রাথমিক ক্ষতি বহনের ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্যশীল মূলধন, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের সমন্বয় থাকবে। সরকারি অর্থায়নের মূল উদ্দেশ্য হবে বড় পরিসরের বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং শুরুর ঝুঁকি ও ধাক্কা সামলানো।
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনকে অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এতে আমাদের হাউজিং, লজিস্টিকস এবং দেশে নিজস্ব সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি তৈরির মতো বড় বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হবে। এগুলো সবই সম্ভব যদি কনসিস্টেন্ট ম্যাক্রো পলিসি সিগন্যাল থাকে।
সম্প্রতি সরকার সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের জন্য পিকেএসএফ, ইডকল ও বিআইএফএফএলকে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা নমনীয় সুদে ঋণ হিসেবে দেয়া হবে। তবে এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ধারাবাহিক ও অনুকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা যদি বিশ্বাস করেন যে এ ইতিবাচক ও অনুকূল পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকবে, তবেই তারা বড় পরিসরে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হতে পারব।
মো. ফজলুল কাদের: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক ‘গ্রিন ডায়ালগ’-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]