ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু সহনীয়তা নিশ্চিতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়, সিভিএফের অন্যান্য সদস্য দেশ এ প্রত্যাশার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০ প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘মিডনাইট সারভাইভাল ডেডলাইন ফর দ্য ক্লাইমেট’ উদ্যোগ গ্রহণসহ প্যারিস চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, এনডিসির লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু তহবিলের জোগান বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির বিষয় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করে বর্ধিত এনডিসি ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়। অভিযোজনের পাশাপাশি প্রশমন কার্যক্রমকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে তার বর্ধিত এনডিসি ২০২০ প্রণয়ন করছে বলে জানায়। উল্লেখ্য, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দেশব্যাপী ১১ দশমিক ৫ মিলিয়ন গাছের চারা রোপণসহ প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার প্রথম প্রস্তাব হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কঠোর বাস্তবায়ন। কিন্তু বাস্তবে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশমন কার্যক্রমের মাধ্যমে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমপক্ষে ২ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, প্রতিনিয়ত প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি চুক্তিতে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে সে বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতার বিষয়ে আইপিসিসি সম্প্রতি এক বিশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার কমানো না গেলে ২০৩০-২০৫২ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি অতিক্রম করবে। ফলে বিশ্বে খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে; যার প্রধান শিকার হবে সিভিএফভুক্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলো।
জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিতে প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী চীন, ভারত, রাশিয়া, জাপানকেও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিতের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হারের অনুপাতে প্রয়োজনীয় তহবিল প্রদানের মাধ্যমে জলবায়ু দুর্যোগের শিকার দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সিভিএফ দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে চাপ প্রদান করতে হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রতি বছর কমপক্ষে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অন্য একটি হিসাবে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কমপক্ষে বছরে ৪০০-৪৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষয়ক্ষতির মোকাবেলা করতে হবে, যা বেড়ে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬০০-৭০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পাঁচ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও উন্নত দেশগুলো কর্তৃক প্রতিশ্রুত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের বিপরীতে মাত্র মোট ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে, আর বাস্তবে এ পর্যন্ত মাত্র ২১ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল হিসেবে প্রদান করেছে, যার মধ্যে সামান্য পরিমাণ হলো অনুদান। যদিও অক্সফামের হিসাব মতে, শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক সরকারি অর্থায়নের মোট পরিমাণ ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। চরম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জিসিএফ থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল পাওয়ার ন্যায্য অধিকার রয়েছে। জিসিএফ থেকে এ পর্যন্ত প্রদত্ত তহবিলের মাত্র ৪৫ শতাংশ অনুদান হিসেবে প্রদান করা হলেও বাকি ৫৫ শতাংশ তহবিলের মধ্যে ঋণ প্রদান করা হয়েছে ৪১ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো গড়ে তাদের আয়ের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বিদেশী ঋণ পরিশোধে ব্যয় করে। তবে ২০১৭ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার ক্ষুদ্র দ্বীপদেশগুলোকে এর চেয়ে বেশি হারে ঋণ পরিশোধ করতে হয়। জুবলি ঢেট ক্যাম্পেইনের তথ্যমতে, ৬৩টি দরিদ্র দেশের সরকারকে ২০১১ সালের ১৩৩ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ প্রদানের তুলনায় ২০২২ সালে তা ২১৬ শতাংশে দাঁড়াবে। এরই মধ্যে আইএমএফ প্রদত্ত তথ্যমতে, ক্ষুদ্র দ্বীপদেশ গ্রানাডা, ডমিনিকা, হাইতি, কিরবাতি, মালদ্বীপ, সামোয়া, মার্শাল দ্বীপদেশ, টুভালু, ভানুয়াতুসহ বিভিন্ন দ্বীপদেশ ঋণে জর্জরিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সাধারণত যেকোনো দুর্যোগে পড়লে এসব স্বল্পোন্নত দেশকে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করতে হয়।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় আন্তর্জাতিক উৎস থেকে জলবায়ু তহবিল সংগ্রহে কোনো কার্যকর পথনকশা না থাকা, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সক্ষমতার ঘাটতি, জনঅংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা না থাকায় এনডিসি লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি সিভিএফের দেশগুলোয় অভিযোজনের পাশাপাশি প্রশমনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণে প্রতিশ্রুত অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে। সিভিএফ দেশগুলোর জনস্বাস্থ্য ও নির্মল বায়ু নিশ্চিতে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সিভিএফের পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত মোকাবেলায় এনডিসি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের গুরুত্ব ও আবশ্যকতা বিবেচনায় অনতিবিলম্বে কার্বন নিঃসরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় কমিয়ে আনতে চুক্তিভুক্ত দেশগুলোকে বর্ধিত এনডিসি ঘোষণার পাশাপাশি এনডিসিতে ২০১৫ প্রতিশ্রুত লক্ষ্যের সঙ্গে নতুন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমিয়ে আনতে কার্যকর নীতি গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানাতে হবে বাংলাদেশের নেতৃত্বাধীন সিভিএফকে।
তৃতীয় প্রস্তাবনা হলো, উন্নত প্রযুক্তিতে অভিগম্যতাসহ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্থের জোগান বৃদ্ধি করা। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত প্যারিস চুক্তিতে জলবায়ু অর্থায়নের সর্বসম্মত সংজ্ঞা নির্ধারণ না করায় ‘নতুন’ ও ‘অতিরিক্ত’ উন্নয়ন সহায়তা এবং অনুদান অথবা ঋণসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে এ অস্পষ্টতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী প্যারিস চুক্তিতে প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল প্রদানের বিষয়টি বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ঝুঁকিতে থাকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোপেনহেগেন চুক্তির ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর নতুন প্রতিশ্রুতি হিসেবে উন্নয়ন সহায়তার অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এ খাতে কাঙ্ক্ষিত অনুদান প্রদান করা হয়নি। অর্থায়নের প্রধান মাধ্যম সবুজ জলবায়ু তহবিলে (জিসিএফ) এ পর্যন্ত মাত্র ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে জিসিএফ থেকে মোট প্রকল্প চাহিদার পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। এ পরিপ্রেক্ষিতে কোন উৎস থেকে, কখন এবং কীভাবে তা প্রদান করা হবে, তার নিশ্চয়তা না থাকায় ক্ষতির মাত্রা যে সামনে বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। উল্লেখ্য, জিসিএফ কর্তৃপক্ষের প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত তহবিল ছাড়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় জিসিএফ বোর্ড কর্তৃক ২০১৫ থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন করেছে। অনুদানভিত্তিক জলবায়ু তহবিলের পরিবর্তে এ খাত ঘিরে এক ধরনের আন্তর্জাতিক ঋণ বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং প্যারিস চুক্তিবিরোধী। পাশাপাশি প্রদত্ত ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত দেশের চাহিদার পরিবর্তে তহবিল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।
জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার চতুর্থ প্রস্তাবনা হলো, বৈশ্বিক আলোচনার মূলধারায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতিকে যুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ। আইপিসিসির বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লিখিত সতর্কবার্তা এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘জলবায়ু জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বানের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও প্রভাব সম্পর্কে গভীর সতর্কবার্তা প্রদান করা হলেও প্যারিস চুক্তিসহ এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফলপ্রসূ হয়নি। প্যারিস চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ‘ক্ষয়ক্ষতি’র বিষয়টি অভিযোজন থেকে আলাদা বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখন পর্যন্ত ‘নতুন ও অতিরিক্ত’ কোনো তহবিল বরাদ্দ করা হয়নি। এমনকি ২০১৭ সালে প্রণীত ‘ওয়ারশো ইন্টারন্যাশনাল মেকানিজমের’ কর্মপরিকল্পনায় জিসিএফ থেকে অর্থায়নের বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনাও নেই। ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে দূষণকারী দেশগুলো বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমানোর জন্য বাজারভিত্তিক বীমা ব্যবস্থার সুপারিশ করছে। ফলে জলবায়ু দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবহাওয়ার আকস্মিক/চরম ঘটনার জন্য ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার, যা প্রয়োজনীয় অভিযোজন ও প্রশমনের মাধ্যমে পরিহার করা যেত। কভিড-১৯ মহামারীতে বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকির মুখে থাকা এলাকাগুলোর মানুষ কর্ম হারিয়ে দারিদ্র্য ও অনাহারের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশে নতুন করে দারিদ্র্য চক্রে পড়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ। খাদ্য উৎপাদন ছাড়াও শিল্প খাতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় টেকসই উন্নয়ন যে হুমকির মুখে, তা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২০ সালের পরিবেশগত মূল্যায়নে পৃথিবীর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম ও দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে ষষ্ঠ এবং এ বছরই শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক নির্গমনের পরিমাণ ১৩৪ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ কার্বন নির্গমনকারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ প্রকাশ করা হচ্ছে, তা প্রধানত চারটি প্রধান বিষয় বা স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে প্রণীত হচ্ছে।
কার্বনসাশ্রয়ী ও কার্বননিরপেক্ষ উন্নয়নের জন্য আয় বৃদ্ধি, ইতিবাচক কল্যাণ, উন্নততর বাণিজ্য ও অন্যান্য আর্থসামাজিক খাতে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় উৎস থেকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়ন নিশ্চিত করা। বাস্তবে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশসহ ১০টি দেশকে জিসিএফ থেকে মাত্র ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রদান করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে অনুমোদিত মোট তহবিলের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা জলবায়ু ন্যায্যতার বিপরীত অবস্থান। অথচ শুধু বাংলাদেশের অভিযোজন বাবদ বছরে দরকার ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বিসিসিএসএপির নীতি অনুসরণে জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন খাতে কোনো ধরনের ঋণ নয়, বরং ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ কমানোর পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান কীভাবে, কোন উৎস থেকে, কোন সময়ে আসবে তার একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মকৌশল দ্রুত প্রণয়ন করা উচিত। এক্ষেত্রে অনুদানভিত্তিক অর্থায়নে উদ্ভাবনী কৌশল, যেমন সবুজ/কার্বন কর, এভিয়েশন ও শিপিং করসহ কমিউনিটি নেতৃত্বাধীন তহবিল গঠনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান দেয়া সম্ভব।
টেকসই জ্বালানির জন্য ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা, নীতি কাঠামো ও অর্থায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান ও জলবায়ু-সহিষ্ণু গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আকারের বিদ্যুৎ গ্রিড চালু করতে হবে। বাস্তবায়ন ও পরিকল্পনাধীন সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ ফুরানোর সঙ্গে সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে হবে। উল্লেখ্য, জলবায়ু-সহিষ্ণু অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ পুঁজিনিবিড় ও জলবায়ু-স্মার্ট বিনিয়োগের জন্য ব্যক্তি খাত, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়টিও সরকারের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় স্তম্ভ। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব ধরনের দেশী-বিদেশী তহবিল দাতা, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে সব ধরনের প্রণোদনা দিয়ে ‘অর্থনীতির সবুজ পুনরুদ্ধার’ মডেল ঘোষণা করতে পারে। এক্ষেত্রে জিডিপির পরিবর্তে কল্যাণ সূচক গ্রহণ, দ্রুত নির্মল বায়ু আইন বাস্তবায়ন করে শিল্প-কারখানা ও পরিবহন খাতে কার্বনসাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করার জন্য নগদ ভর্তুকি, কর মওকুফের মতো উদ্যোগের পাশাপাশি দূষণকারীদের ওপর সবুজ করারোপ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিভিন্ন ইতিবাচক প্রণোদনা ও বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের মাধ্যমে অতিক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসার সুরক্ষা প্রদানসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি বীমা খাতে বিপদাপন্ন ২০টি দেশের অর্থায়নের ঘাটতি কমপক্ষে অর্ধেকে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করাও জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার অন্যতম দিক।
জলবায়ু-সহিষ্ণু খাতগুলোয় গুরুত্বারোপের মাধ্যমে মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষম কেউ যেন বাদ না পড়ে, সে লক্ষ্যে জলবায়ু ঝুঁকি থেকে শ্রমক্ষম জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার জন্য কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ করা পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য দিক। উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের শিকার বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় জলবায়ু সহনীয় ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গঠনে মানবসম্পদের ভূমিকা অপরিহার্য। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিকভাবে সিভিএফভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দে ঘাটতি রয়েছে। ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জলবায়ু তাড়িত বাস্তুচ্যুত যুবক-যুবতীদের জন্য যথাযথ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে পারলে যেকোনো দুর্যোগে বস্তুগত সম্পদের হানি ঘটলেও টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে তরুণ-তরুণীদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে বরাদ্দ নিশ্চিতে সিভিএফ দেশগুলোর সমন্বিত রূপরেখা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন জরুরি।
সার্বিকভাবে জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা কাগজে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় টেকসই অর্থনীতি ও মানবসম্পদের যথাযথ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু দুর্যোগের পাশাপাশি কভিড-১৯-এর কারণে জলবায়ু সহনীয়তা ও পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, তেমনি বন ও পানির উেসর সুরক্ষা ছাড়াও নির্মল বায়ু নিশ্চিতের বিকল্প নেই। কভিড-১৯ উত্তর বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে দেশে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অবশ্যই সবুজ তথা প্রাণ ও প্রকৃতিবান্ধব হতে হবে।
এম জাকির হোসেন খান: জলবায়ু অর্থায়ন ও পরিবেশ বিশ্লেষক