আগস্টের প্রথম দিকে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি সর্বকালের সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলারে উন্নীত হয়েছে। যদিও বিশ্ব ১৯৭১ সালে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পরিত্যাগের পর থেকে মূলধারার অর্থনীতিবিদরা স্বর্ণকে সাইড শো হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন, তবে দামে সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফন একটি তাত্পর্যজনক সংকেত বটে।
যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, ঝুঁকি ও ডলারের বিকল্প নিরাপদ সঞ্চিতি উপকরণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বেড়ে চলা আকাঙ্ক্ষা—এ তিনটি বিষয়কে ঊর্ধ্বমুখী স্বর্ণের দামের ব্যাখ্যা হিসেবে আপাতত বলা হচ্ছে, যদিও উল্লিখিত প্রতিটি বিষয়েই কিছুটা সত্যতা রয়েছে।
মার্চে নভেল করোনাভাইরাসসৃষ্ট আর্থিক মন্দার পর থেকে ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ আগ্রাসীভাবে মুদ্রানীতি শিথিল করেছে। প্রকৃত বিষয় হলো, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই আছে এবং বহু শতাব্দী ধরে স্বর্ণ মজুদের প্রধান উদ্দেশ্যও মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তবে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সহজ অর্থের একমাত্র সংকেত নয়। আজকে নিম্ন সুদহার, অবমূল্যায়িত ডলার, উচ্চ শেয়ারমূল্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে ফেডের স্থিতিপত্রের আকার—সবই ফেডারেল রিজার্ভের সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির অবস্থানের প্রতিফলন ঘটায়।
তত্ত্বে এবং বাস্তবে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে নিম্ন সুদহার প্রায়ই যুক্ত। সর্বোপরি স্বর্ণ কোনো সুদ দেয় না—দীর্ঘকালীন এ যুক্তি মোটেই প্রলুব্ধকর নয়, যখন অন্য সম্পদগুলোও স্বল্প রিটার্ন দিচ্ছে।
গত দশক সুদহার ও স্বর্ণের দামের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক নিশ্চিত করে। ফেডের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের (কিউই) সময়ে ২০১১-১২ সালে এখনকার মতো স্বর্ণের দাম বেশি ছিল। ‘ট্যাপার ট্যানট্রামের’ সময় এটি তখন আউন্সপ্রতি ১ হাজার ২০০ ডলারে পড়ে গিয়েছিল, যখন তত্কালীন ফেড চেয়ার বেন বার্নানকে ২০১৩ সালের মে মাসে কিউই অবসানের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল।
স্বর্ণে বিনিয়োগের আরেকটি পুরনো যুক্তি হলো, ঝুঁকি সীমিত করা। কারণ ব্যাপকভাবে পরিবর্তনশীল হলেও স্বর্ণের দাম অন্য সিকিউরিটিজগুলোর দামের সঙ্গে তুলনামূলক দুর্বলভাবে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করে। কাজেই সুস্পষ্ট কারণেই ফেব্রুয়ারি থেকেই মানুষের ঝুঁকির বোধ বেড়েছে, যেমনটা পলিসি আনসার্টেন্টি ইনডিসেস এবং ভিক্স সূচকে (তথাকথিত ভয় সূচক) প্রতিফলিত হয়েছে। স্বর্ণ সাধারণত কয়েকটি সেইফ হ্যাভেন সম্পদের একটি, যেটিতে ঝুঁকিবিমুখ বিনিয়োগকারীরা লগ্নি করতে ভরসা পান।
ডলার যদিও দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের শীর্ষ সেইফ হ্যাভেন মুদ্রা বিবেচিত হয়ে এসেছে, তবে নিজেদের সম্পদ ধারণ বহুমুখী করার অনেক বিনিয়োগকারীর বেড়ে চলা আগ্রহ অংশত ট্রাম্পের কাগুজে ডলারের অস্ত্রীকরণের (উইপনাইজেশন অব গ্রিনব্যাক) বিষয়টিতেই প্রতিফলিত হয়। ট্রাম্প বরাবরই বেআইনিভাবে একতরফা মার্কিন অবরোধ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সঞ্চিতি মুদ্রার শীর্ষ অবস্থান হিসেবে ডলারকে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে এটি ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। ডলারের ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদের আরেকটি বোধগম্য ফ্যাক্টর হলো, মার্কিন শাসনের সক্ষমতার প্রতি ব্যাপকতর আস্থা হ্রাস, বিশেষত কভিড-১৯ মহামারী সামলানোয় ট্রাম্প প্রশাসনের আনাড়িপনার কারণে।
এমন এক বাস্তবতায় অনেকেই ডলারের প্রভাব কমার আশঙ্কা করছেন। ডলারের একাধিপত্যের অবসান ঘোষণা আগেও অনেকবার করা হয়েছে এবং এখনো এর কোনো সুস্পষ্ট চ্যালেঞ্জার আবির্ভূত হয়নি। বিশ্বের সবচেয়ে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা ইউরো আন্তর্জাতিক ব্যবহারের মানদণ্ডে ডলারের পেছনে পড়ে আছে। এদিকে চীনা রেনমিনবি (সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জার হিসেবে অগ্রণী জায়গায় খুব বেশিদিন আগে আসেনি) ব্যবহূত মানদণ্ডের ওপর নির্ভর করে কেবল পঞ্চম, সপ্তম বা অষ্টম অবস্থানেই থাকে।
স্বর্ণ কোনো মুদ্রা নয়, কিন্তু এটি একটি আন্তর্জাতিক সঞ্চিতি সম্পদ হিসেবে ডলারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং এভাবে বহুমুখিনতার আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে এটি প্রভূতভাবে উপকৃত হয়েছে। অধিকন্তু, এপ্রিল থেকে ইউরো ও অন্য প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের অবমূল্যায়ন নিজেই স্বর্ণের ডলার মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি অংশত ব্যাখ্যা করে।
আন্তর্জাতিক গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের (যার অধীনে শীর্ষ অধিকাংশ মুদ্রাগুলো রূপান্তর করা হতো) সুবর্ণ সময় অবসান হয় ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। তবে ১৯৭১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আলোচ্য ব্যবস্থা-আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন হঠাৎ করে স্বর্ণে ডলারের বিনিময়যোগ্যতার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন।
অবশ্য আজকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড প্রাচীন আগ্রহের বেশি কিছু নয়। জানুয়ারিতে ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের সাত গভর্নরের একজন হিসেবে জুডি শেলটনকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন, যিনি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের একজন পুরোদস্তুর প্রবক্তা হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। সিনেট ব্যাংকিং কমিটি ২১ জুলাই তাকে অনুমোদনের জন্য ভোটের আয়োজন করেছে এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে আরেকটি চূড়ান্ত ভোটের মাধ্যমে তার নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
শেলটনের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত নস্টালজিয়াকেও ছাড়িয়ে যায়। ২০০৯ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘চলুন, আমরা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডে আবার ফিরে যাই।’ লিগ্যাল টেন্ডার হিসেবে তিনি হুকুমি ডলারের বিলোপের পক্ষে মত ব্যক্ত করেছিলেন।
তবে স্বর্ণভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় ফেরার ধারণাটি ছিল ভয়াবহ। এমনকি কেবল যদি নিম্ন ও স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তাহলেও গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড তা কখনো পূরণ করতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৭৩ ও ১৮৯৬ সালের মধ্যে সাধারণ দাম মাত্রা যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩ শতাংশে এবং যুক্তরাজ্যে ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছিল নতুন স্বর্ণ আবিষ্কারের অভাবে, যেটি কেবল ১৮৯৬ সালের কনডাইক গোল্ড রাশে পর্যবসিত হয়েছিল।
অধিকন্তু, অর্থনীতিগুলো তখনই ভালো করে, যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাম স্থিতিশীলতা, আর্থিক স্থিতিশীলতা অন্বেষণ এবং আয় ও কর্মসংস্থান স্থিতিশীল রাখার জন্য কাজ করে। ২০০৮-১২ সময়পর্বে বেকারত্ব যখন ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, তখন ফেডের আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টি এভাবে ছিল সঠিক নীতি। অন্যদিকে ২০১৬-১৮ সালে বেকারত্ব যখন ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল, তখন কঠোরতা অবলম্বন করাটা যথার্থ ছিল।
উচ্চ বেকারত্বের সময় প্রলম্বিত করার মাধ্যমে ফেড বরং স্বর্ণের বাজার অনুসরণ করার পরিবর্তে ২০১০ সালে মুদ্রানীতি কঠোর করতে পারত এবং ২০১৮ সালে নীতি শিথিল করতে পারত। যখন নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট মন্দা আঘাত হানে, তখন প্রণোদনা আবারো সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, তবে স্বর্ণের প্রতি সত্যিকার আস্থাভাজনরা সাম্প্রতিক রেকর্ড দামকে একটি সংকেত হিসেবে নিতে পারত, যাতে ফেড আগ্রাসীভাবে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারে।
তদুপরি শেলটনের ভাবাদর্শিক অসামঞ্জস্যও আছে। উচ্চপদে যত দ্রুত সম্ভব আসীন হওয়ার বাসনায় ট্রাম্প যা শুনতে চান, তা শোনানোর জন্য তিনি তার দীর্ঘস্থায়ী দর্শনের সঙ্গে আপস করেছেন। একটা উদাহরণ দিই। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, ফেডের আরো দ্রুত মুদ্রানীতি শিথিল করা উচিত।
স্বর্ণের দাম, অর্থনীতির ভালো-মন্দ কোনোটিই বোধহয় শেলটনের ভোট নির্ধারণ করবে না। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্সিয়াল প্রার্থী জয়ী হলে তিনি প্রায় নিশ্চিতভাবে স্বর্ণের সঙ্গে পুনঃসংযোগ স্থাপন করবেন এবং নীতি কঠোর করার জরুরি প্রয়োজন পুনরাবিষ্কার করবেন, এমনকি অর্থনীতি তখন খুব দুর্বল থাকলেও। তবে ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হলে তিনি বিদ্যমান আর্থিক প্রণোদনা বাড়ানোর পক্ষে বলবেন, এমনকি মূল্যস্ফীতি পুনরায় বাড়লেও।
ট্রাম্পের অধীনে বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে মার্কিন ডাকসেবা সর্বত্রই আমরা মোসাহেবিপনা ও স্বজনতোষণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। সৌভাগ্যক্রমে এখন পর্যন্ত ফেড এসব ঘৃণ্য প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছে, তবে আর খুব বেশিদিন বোধহয় সেটি পারবে না।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জেফরি ফ্র্যাংকেল: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাপিটাল ফরমেশন অ্যান্ড গ্রোথের অধ্যাপক
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির