অভিমত

সংক্রামক রোগে সতর্কতা

অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৩৫০ জন লোকের বাস। যেখানে পাশের দেশ ভারতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৯২ লোকের বাস।

অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৩৫০ জন লোকের বাস। যেখানে পাশের দেশ ভারতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৯২ লোকের বাস। যদি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা প্রভৃতি উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে দেখা যায়, তা যথাক্রমে মাত্র ৩৮, ৩ দশমিক ৫ ও চারজন মানুষ প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে। তাহলে বুঝতেই পারছেন, মানুষের বসবাসের ঘনত্ব আর জীবনযাত্রার মান আমাদের মাতৃভূমির কেমন বা কতটা উন্নত। জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে মাল্টা, চতুর্থে রয়েছে মালদ্বীপ; একইভাবে তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে বাহরাইন, সিঙ্গাপুর ও মনাকো। সংক্রামক রোগগুলো বেশি লক্ষ করা যায় অপরিচ্ছন্ন, দূষিত পরিবেশে বসবাসরত মানুষের মাঝে, যাদের আবাসিক অবস্থান অতটা উন্নত পর্যায়ে নয়। নোংরা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ জীবাণু ও জীবাণুর বাহকের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। পরিবেশ যত দূষিত হবে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ততই বাড়বে। তাই সব দিক বিবেচনা করে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সংক্রামক রোগব্যাধির জন্য অত্যন্ত সহায়ক। পরিবেশ দূষণ, জীবনযাপনের নিম্নমান, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের অভাব, স্বাস্থ্যসচেতনতার অজ্ঞতা, খাবারদাবার তৈরি, পরিবেশন ও গ্রহণের যে মান রক্ষা করা প্রয়োজন তার স্বল্পতা বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে সংক্রামক রোগের এক অভয়ারণ্যের দিকে। অন্যদিকে পরিবর্তিত পরিবেশও অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করছে জীবাণু ও বাহকের অস্তিত্ব রক্ষায়।

সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বাহক ও বাহকের পরিবেশ, জীবাণু ও পোষকদের মধ্যে সুন্দর ও ছন্দময় সম্পর্ক থাকে। যদি পরিবেশের উপাদানগুলো বাহকের অনুকূলে থাকে তবে বাহক যেমন অতি স্বাচ্ছন্দ্যে জীবাণুকে বহন করতে পারে তেমনি জীবাণুও অতি সহজেই তার রেপ্লিকেশন ঘটিয়ে রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি করে মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেয়। সেজন্য পোষক-বাহক জীবাণু পরিবেশ সম্পর্ক বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। এ দেশে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, সূর্যের আলোর তীব্রতা, বাতাসের গতিবেগ প্রভৃতি পরিবেশগত উপাদানের তারতম্য ঘটে। এ তারতম্যের কারণে কখনো বাহকের বংশবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়, আবার কখনো জীবাণু সংক্রমণের হার বেড়ে যায়। একইভাবে পরিবেশের দূষণ জীবাণুর কর্মক্ষমতা বা সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস করে। এ সত্যতা সবাইকে সার্বিকভাবে উপলব্ধি করেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, আক্রান্ত হওয়ার হাত হতে নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে ভুক্তভোগী হতে হবে নিজেকে। তাই নির্দিষ্ট সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত এবং নিজ নিজ পরিবেশগত কাঠামোর ভিত্তিতে প্রণীত গাইডলাইন অনুযায়ী সব ধরনের বিধিনিষেধ মেনেই চলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলতে হয়, ডেঙ্গু ভাইরাস একজনের শরীর হতে অন্য শরীরে পরিবাহিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাহকের ভূমিকাই প্রধান। তাই এর বাহকের হাত হতে সুরক্ষার জন্য অবশ্যই মশার প্রজনন প্রক্রিয়া অর্থাৎ জীবন চক্রের ধারা বা জীবন চক্রের ধাপগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। অর্থাৎ বাহক নামক এডিস মশকীর জীবন চক্র ও প্রজনন স্থল সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। যদি মশকীর আচরণ, মরফোলজি বা শরীরের বাহ্যিক গঠন, ডিম পাড়ার ধরন, স্থান এবং মানুষের সংস্পর্শে আসার সময়, সংবেদনশীলতা প্রভৃতি বিষয় জানতে পারলেই ডেঙ্গুর বাহককে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ডেঙ্গুব বাহক নিয়ন্ত্রণে এলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব হবে। আমরা জানি, এখন ডেঙ্গু শহর হতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার যে দুটি প্রজাতি এডিস ইজিপ্টি ও এডিস এলবোপিকটাস এখন সমানতালে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশা জরিপে শহরে এডিস ইজিপ্টি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে এডিস এলবোপিকটাসের ঘনত্ব লক্ষণীয়ভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম প্রজনন স্থল, যেমন নারকেলের মালা, নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের নিচে ফ্লাডিং ফ্লোর, জমানো পানি, কনটেইনার, টায়ার অথবা বহুতল ভবনের পানির পাম্প প্রভৃতিতে এডিস ইজিপ্টির উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি ও উদ্বেগজনক। প্রাকৃতিক উৎস, যেমন কচুগাছ, কলাগাছের পাতার এক্সাইল, গাছের ছিদ্র বা কুঠুরি, ব্যাম্ব ট্রাম্প প্রভৃতির মধ্যে এডিস এলবোপিকটাসের ঘনত্ব বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। একইভাবে উভয় প্রজাতিই ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে চলেছে। সেজন্য আর শহর ও গ্রামাঞ্চলে আক্রান্ত মশার ঘনত্ব নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য, তা হলো গ্রামাঞ্চলে পড়ে থাকা এডিস এলবোপিকটাস কীভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত সহজ। এখন যোগাযোগমাধ্যম অত্যন্ত সহজ হওয়ার ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সহজেই গ্রামাঞ্চলে চলে যাচ্ছে ডেঙ্গু ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত যখন এডিস এলবোপিকটাস পান করবে তখন খুব সহজে মশাটি আক্রান্ত হবে এবং সমান্তরাল ও ভার্টিকল দুদিকেই ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করবে।

ভার্টিকল বিস্তার অর্থাৎ এক জেনারেশন হতে অন্য জেনারেশনে বিস্তার লাভ খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলে। এটা আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে যথাযথ কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের অভাবে। পুরোপুরিভাবে যদি আক্রান্ত রোগীর সত্যিকারের ঠিকানা অনুসন্ধান করা না যায় তাহলে বিনা বাধায় আক্রান্ত মশা ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়াবে। এক্ষেত্রে যেমন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে একইভাবে বাড়ছে আক্রান্ত মশার সংখ্যা। বাড়ছে আক্রান্ত এরিয়া। ক্রমেই সংক্রামিত মশা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নির্বিঘ্নে বেড়ে চলছে। এ অবস্থায় প্রয়োজন রোগীর প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ এবং নিজ নিজ দায়িত্বে নিজের এলাকায় সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সমন্বিতভাবে আইপিএম এবং আইভিএমের সমন্বয়ে আইপিভিএম অর্থাৎ সমন্বিত বালাই ও বাহক ব্যবস্থাপনা।

বাদুড় দ্বারা একইভাবে শীতকালে নিপাহ ভাইরাসের যে প্রাণঘাতী আবির্ভাব আমাদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে তা হতে পরিত্রাণের উপায় হলো সচেতনতা। কাঁচা খেজুরের রস বাদুড়ের বিষ্ঠা হতে রক্ষা করা এবং কাঁচা রস পান করা থেকে বিরত থাকা। বাদুড়ের অর্ধ খাওয়া ফল কখনই খাওয়া যাবে না। রস উৎসবসহ এমন সামাজিক উৎসবগুলো এড়িয়ে চলা। আমাদের মতো দেশের মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগের বিস্তার যত সহজেই হতে পারে, উন্নত দেশগুলোয় তত সহজে সম্ভব নয়। তাই সচেতনতার বিকল্প নেই। রোগের জীবাণু বা প্যাথোজেনের যেমন আধিক্য তেমনি বাহকের আধিক্য ও তৎপরতা ব্যাপক। পানি, বায়ু ও খাবার বাহিত সংক্রামক রোগগুলোর বিস্তার ব্যাপক হারে বেড়েই যাচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের যে পরিমাণ ডাস্ট পার্টিক্যাল রয়েছে তা শুধু সংক্রামক রোগই ছড়াচ্ছে না অগ্রণী ভূমিকা রাখছে এনসিডি বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ ছড়াতে। সিওপিডি, লাং ক্যান্সার, স্ট্রোক, হার্ট-ডিজিজসহ অসংখ্য মারাত্মক রোগ। এতে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পেতে পকেট ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়ছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষের অতি দরিদ্রতার মূল কারণ দুটি। একটি হলো মামলাসংক্রান্ত ব্যয় এবং অন্যটি চিকিৎসা ব্যয়। পরিবর্তিত পরিবেশে আমরা যদি সচেতন ও সতর্কতার সঙ্গে রোগজীবাণু প্রতিরোধ করতে না পারি তাহলে সংক্রামক রোগের সংক্রমণ ইমার্জিং ও রি-ইমার্জিং হতেই থাকবে। মূল্যবান প্রাণ অকাতরে ঝরতেই থাকবে। তাই আসুন ভয় বা গুজবে কান না দিয়ে নিজেকে সচেতন করি এবং অন্যকে সতর্ক হতে উদ্বুদ্ধ করি। একটি সুস্থ সাবলীল সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলি।

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)

আরও