বহির্বাণিজ্য

ক্ষুদ্র রফতানিকারকদের শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি সুবিধা রফতানি বহুমুখীকরণে সহায়ক হবে

আমদানি নীতিতে আংশিক রফতানিকারকদের শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের রফতানি খাত একটি পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এ নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় খাতটিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজের সমপরিমাণ সুবিধা বন্ড সুবিধার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়ার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত বছর সেপ্টেম্বরে এসআরও ৩৮৪ জারি করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু নন-বন্ডেড শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে রফতানি পণ্য উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ আমদানির সুযোগ দেয়া হয়।

এ সুবিধা তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা আমদানি শুল্ক ও করের সমপরিমাণ ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে রফতানির উদ্দেশ্যে কাঁচামাল আমদানি করতে সক্ষম বা আগ্রহী। ওই এসআরও জারি করা হয়েছে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৫ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ১২৬(১)-এর অধীনে।

রফতানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যেসব মানসম্পন্ন কাঁচামালের প্রয়োজন হয়, তার সবই দেশে উৎপাদিত হয় না। তৈরি পোশাকসহ শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা ভোগ করে আসছে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদনের একটি অংশ দেশের বাজারে বিক্রি করে এবং অবশিষ্ট অংশ রফতানি করে, তাদের জন্য এতদিন এ সুবিধা ছিল না। যদিও ডিউটি এক্সেম্পশন ও ড্র-ব্যাক ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব রফতানিকারকের আমদানির সময় পরিশোধিত শুল্ক ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো রফতানিকারকদের চাহিদা অনুযায়ী এ সুবিধা কার্যকরভাবে দিতে পারেনি।

আমদানি নীতিতে আংশিক রফতানিকারকদের শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে এমন পণ্যের সংখ্যা প্রায় ৭০০-৮০০। এসব পণ্যের কিছু কোনো কোনো বছর রফতানি হলেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ২০২৫ সালে এসআরওটি জারি করা হয়।

প্রাথমিকভাবে আটটি খাতকে এ সুবিধার আওতায় রাখা হলেও পরবর্তী সময়ে তা সম্প্রসারণ করে ১৮টি খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এসআরও ৩৮৪-এর ‘ঙ’ ও ‘চ’ দফা অনুযায়ী, রফতানি আদেশ এবং উপকরণ-উৎপাদন সহগ (ইনপুট-আউটপুট কো-এফিশিয়েন্ট) আগেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হবে। এ শর্ত ক্ষুদ্র রফতানিকারকদের জন্য বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। কারণ তারা সাধারণত ছোট ছোট চালানে রফতানি করেন। প্রতিটি চালানের জন্য বারবার এ ধরনের অনুমোদন নেয়া তাদের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।

উদ্যোক্তাদের মতে, রফতানি প্রক্রিয়া সহজ করা ও লিড টাইম কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সমুদয় রাজস্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রফতানি আদেশ, এলসি বা টিটি এবং উপকরণ-উৎপাদন সহগের পূর্বানুমোদন ছাড়াই আংশিক রফতানিকারকদের স্বঘোষণার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানির সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে শর্ত থাকতে পারে, আমদানীকৃত কাঁচামাল ও উপকরণ খালাসের তারিখ থেকে ২৭০ বা ৩৬০ দিনের মধ্যে উৎপাদন সম্পন্ন করে পণ্য রফতানি করতে হবে। অন্যথায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাশাপাশি যারা সরাসরি রফতানি না করে পরোক্ষভাবে রফতানি কার্যক্রমে যুক্ত, তাদেরও এ সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্য সংযোজন এবং খাতভিত্তিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতে উদ্যোক্তাদের এ সুবিধা গ্রহণে আগ্রহী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত নীতির সুবিধা কাজে লাগিয়ে রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে এ সুবিধা ব্যবহার করতে পারেনি।

এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। রফতানি অনুবিভাগের প্রধানের সভাপতিত্বে ১৭ সেপ্টেম্বর একটি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় এ ব্যবস্থার প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সভাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল আংশিক ও নন-বন্ডেড রফতানিকারকদের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির ব্যবস্থা সহজ ও কার্যকর করার উপায় নির্ধারণ। আংশিক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মোট উৎপাদনের একটি অংশ রফতানি করে এবং অবশিষ্ট অংশ দেশের বাজারে সরবরাহ করে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এসএমই উদ্যোক্তা এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। যথাযথ সুবিধা পেলে তারাও রফতানি বাড়াতে অবদান রাখতে পারেন।

উল্লেখ্য, এ ধরনের এসএমই প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান শুল্কমুক্ত বা শুল্ক-সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবস্থাগুলো—যেমন বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, ডিউটি ড্র-ব্যাক এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি—ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায়ই সমস্যার সম্মুখীন হয়। কারণ তারা একই সঙ্গে রফতানি ও দেশীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করে। ফলে রফতানির জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং দেশের বাজারের জন্য উৎপাদিত পণ্যে ব্যবহৃত কাঁচামাল আলাদাভাবে চিহ্নিত করা, হিসাব রাখা ও যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স, নথিপত্র সংরক্ষণ ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। ফলে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান রফতানি সহায়তা ব্যবস্থার পূর্ণ সুবিধা নিতে পারে না। এটি রফতানি বহুমুখীকরণের পথে একটি বড় বাস্তব প্রতিবন্ধকতা।

এ কথা সত্য যে নথিপত্র প্রস্তুত, যাচাই এবং শুল্ক ফেরত বা ডিউটি ড্র-ব্যাকের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। ফলে রফতানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। এমনকি শতভাগ বন্ড সুবিধার আওতায় রফতানি করলেও ব্যাংক গ্যারান্টি দ্রুত অবমুক্ত না হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়।

কিন্তু এত উদ্যোগের পরও এসআরওতে ঘোষিত সুবিধা ব্যবহারের বাস্তবতা হতাশাজনক। দেখা গেছে, ১৮টি নির্বাচিত খাতের জন্য এসআরও অনুযায়ী সুবিধা থাকার পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। একজন আংশিক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির চেষ্টা করলেও ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত আমদানির পরিবর্তে আমদানির পর্যায়েই প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনো এ শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য কাস্টমস প্রসিডিউর কোড (সিপিসি) প্রণয়ন করতে পারেনি। এটি সুবিধাটি ব্যবহার না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। একটি সিপিসি নির্ধারণের জন্য আইনগত ভিত্তি থাকা আবশ্যক। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট আইন, এসআরও, প্রজ্ঞাপন, অব্যাহতি আদেশ, চুক্তি বা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) কিংবা অন্য কোনো আইনগতভাবে বৈধ দলিলের ভিত্তিতে সিপিসি নির্ধারণ করতে হয়। এক্ষেত্রে নীতিগতভাবে যোগ্য সুবিধাভোগী ও যোগ্য পণ্যসহ সিপিসি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান এসআরওতে উল্লেখ রয়েছে। তার পরও তা নির্ধারণ করা হয়নি।

বাংলাদেশ কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট শাখা যথাযথ কমপ্লায়েন্স শর্ত এবং প্রযোজ্য এসআরও অনুসারে এ শুল্ক ও কর সুবিধার জন্য উপযুক্ত সিপিসি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করতে পারত। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি বা অ্যাসাইকুডা ডিক্লারেশনে সিপিসি উল্লেখ করা অপরিহার্য, যাতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট শুল্ক ও কর সুবিধা প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু সিপিসি নির্ধারণে বিলম্বের কারণে রফতানিকারকরা এখনো এ সুবিধা ব্যবহার করতে পারছেন না।

কাস্টমসের সিপিসির একটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ডেটাবেজ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুল্কমুক্ত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে ‘সি’, শিল্পের জন্য নির্ধারিত কনসেশনাল হারে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ‘আর’ এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অগ্রিম কর (এটি) অব্যাহতির ক্ষেত্রে ‘ভি’ ধরনের সিপিসি ব্যবহার করা হয়।

কাস্টমস আইনের অধীনে সিপিসি ঘোষণা করা হয়। নতুন সিপিসি প্রবর্তনের জন্য ফাইন্যান্স বিলে প্রস্তাব উত্থাপন এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের ফাইন্যান্স অ্যাক্টের মাধ্যমে তা কার্যকর করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রক্রিয়ার নির্ধারিত সময়সীমা এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ বিষয়ে কাজ করছে।

ঘোষিত নীতির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন-শৃঙ্খল কার্যকর না হলে রফতানিকারকদের জন্য এ নীতি থেকে উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। নন-বন্ডেড ও আংশিক রফতানিকারকদের সহায়তায় এরই মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমদানি নীতিতেও এ ধরনের সহায়ক কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় বাস্তবায়ন ব্যবস্থা কার্যকর করতে বিলম্ব হওয়ায় নীতির প্রত্যাশিত সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

অতএব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ সুবিধার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে—এমনটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে অবশিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ এবং আংশিক ও নন-বন্ডেড রফতানিকারকদের জন্য এ সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তাহলেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের রফতানি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দেশের রফতানি বহুমুখীকরণে এ উদ্যোগ বাস্তব অবদান রাখতে পারবে।

ফেরদাউস আরা বেগম: সিইও, বিল্ড—একটি সরকারি-বেসরকারি সংলাপভিত্তিক প্রতিষ্ঠান

আরও