নির্বাচনী প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ যেন নতুন করে দম ফিরে পেয়েছে

মানুষ ভোট দিতে পেরেছে—এ স্বাভাবিক ব্যাপারটাই আজ সবার কাছে, বিশেষত ৩৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া ও ভোটারদের ভোট দেয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

মানুষ ভোট দিতে পেরেছে—এ স্বাভাবিক ব্যাপারটাই আজ সবার কাছে, বিশেষত ৩৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া ও ভোটারদের ভোট দেয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সেই স্বাভাবিকতাই বন্ধ ছিল। দেশটি ছিল এক ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাসহীন রাজনৈতিক মৃতাবস্থায়। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন কবরের নীরবতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন নতুন করে দম ফিরে পেয়েছে। নির্বাচন যাতে না হয় সেজন্য আওয়ামী লীগ ও ভারতের যে চেষ্টা ছিল সেটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

এ নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকার আরো এক বছর আগেই করতে পারত—বরং করা উচিত ছিল। কারণ প্রায় দেড় দশক ধরে দেশের জনগণ হাজার হাজার মানুষের জীবন, অগণিত আহত ও পঙ্গুত্ব, নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিনিময়ে এ নির্বাচন অর্জন করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সেই জনগণের অর্জনের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত করেছে বলেই মনে হয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি অঘোষিত ভূমিকা রয়েছে। ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেন নিজেদের ‘পুতপবিত্র’ করে জনগণের সামনে হাজির হয়—এক ধরনের গঙ্গাস্নান বলা যেতে পারে। তবে এর মধ্যেই নগদ অর্থ দিয়ে ভোট কেনা বা কারচুপির চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। বিদ্যমান কাঠামোয় এসব পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকগুলোর একটি ছিল নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। মিছিল, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নারী প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো এখন আর নির্বিকারভাবে বক্তব্য দিয়ে পার পাচ্ছে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীরা যেভাবে সক্রিয় ও অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেছেন, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের নারী সমাজ যে একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে—এ নির্বাচন তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে প্রার্থী হিসেবে নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্র-তরুণরা রাজনৈতিক দলগুলোর এক ধরনের রিজার্ভ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তারা যেহেতু স্বতন্ত্র কোনো শ্রেণী গঠন করে না, তাই এক বা একাধিক নতুন দল গঠিত হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের নেতৃস্থানীয় অংশ বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই জায়গা করে নেবে—এ নির্বাচনে তা এরই মধ্যেই স্পষ্ট। যদি অভ্যুত্থানের ছয় মাসের মধ্যেই নির্বাচন হতো, এ প্রক্রিয়া আরো পরে ঘটত।

অন্যদিকে শ্রমিক–কৃষক ও শ্রমজীবী জনগণ বরাবরের মতোই মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণ করলেও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে শ্রমিকদের আবির্ভাব—যখনই তা ঘটুক—বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় মোড় পরিবর্তনের সূচনা করবে এবং তা অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হয়।

বাংলাদেশে অতীতে যেমন ধর্মীয় এজেন্ডার ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন হয়নি, এবারো হয়নি। যদিও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরে রাজনীতিতে ধর্মীয় এজেন্ডা চাপিয়ে দেয়ার নানা চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু জনগণের পক্ষ থেকে এর কোনো বাস্তব চাহিদা না থাকায়—বরং নীরব প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে—নির্বাচনে তা স্থান পায়নি। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। তাদের নির্বাচনী ইশতাহারের কেন্দ্রে ছিল মূলত অর্থনৈতিক কর্মসূচি।

নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যা এবং ভোট চলাকালে ঢাকার কয়েকটি এলাকা পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ঢাকার বাইরে থাকা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে মনে হয়েছে, মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই ভোট হয়েছে। পুরনো অভ্যাসজনিত কিছু অনিয়ম ঘটলেও তা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার মতো ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়।

ফ্যাসিবাদী শক্তির একটি চিরাচরিত কৌশল হলো জনগণকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করা, শত্রুশিবিরে বিভক্ত রাখা। সেই চেষ্টা এখনো অব্যাহত। তবে এর বিপরীতে ঐক্য ও মিলনের আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যেই প্রবল। রাজনৈতিক দলগুলো সেই আকাঙ্ক্ষাকে কতটা উপলব্ধি করে এবং সম্মান জানায়—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী: উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

আরও