ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প

ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন

ভেনিজুয়েলায় ২৫ জুন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প হয়।

এতে রাজধানী কারাকাস ও উত্তর উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। এছাড়া প্রায় অর্ধলক্ষাধিক নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভেনিজুয়েলার ভূমিকম্পে প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার। অন্যদিকে একই দিন উত্তর জাপানের উপকূলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। সাধারণত ৭ মাত্রার ভূমিকম্পকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয় প্রায় ১৬টি। অন্যদিকে পৃথিবীতে বছরে প্রায় ছয় হাজার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। অবশ্য এর বেশির ভাগই মৃদু আকারের হয়, বিধায় সাধারণভাবে তা অনুভূত হয় না।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্ত এলাকায় ভূমিকম্পের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুসারে, সর্বশেষ ২২ জুন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়; ১৮ জুন রাতে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার, ১১ জুন ৪ দশমিক ৪ মাত্রার, ৭ জুন রাতে সিলেটে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু ও ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিভিন্ন মাত্রার ৫৪টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয় আর ২০২৫ সালে সংঘটিত হয় ছোট-বড় বিভিন্ন মাত্রার ৬২টি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক বছরে দেশের অভ্যন্তরে ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল। সুতরাং জনবহুল এ দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থপনার ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের খুব কাছাছাছি দিয়ে প্লেট বাউন্ডারি অতিক্রম করেছে। ভারত, মিয়ানমার ও ইউরেশিয়ান গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান, বিধায় এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত থেকে স্বল্প দূরে মিয়ানমারের ভেতরে ভারতীয় প্লেটের ওপরই বাংলাদেশের অবস্থান। প্লেট সঞ্চালনের কারণে যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, এটা এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের অন্যতম কারণ। এছাড়া বাংলাদেশ চারটি ফল্ট বা চ্যুতি জোনের মধ্যে পড়েছে। ফল্ট জোন বা চ্যুতি হলো সেসব স্থান, ভূমিকম্প হলে যেখান দিয়ে ভূগর্ভস্থ শক্তিটা বের হওয়ার চেষ্টা করে এবং বাংলাদেশে এ রকম চারটা চ্যুতি জোনের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের বৃহৎ চ্যুতিগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ডাউকি ফল্ট। সিলেট শহর ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে এ ডাউকি ফল্টের কারণে। বাংলাদেশের আরেকটি ফল্ট বা চ্যুতি জোন হলো যমুনা ফ্লাড প্লেইনের সংযোগ বরাবর উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্ত। মধুপুরের এ ফল্ট জোন রাজধানী ঢাকা শহরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে আরেকটি জোন হলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে উপকূল বরাবর দক্ষিণে মিয়ানমার, আন্দামান পর্যন্ত বিস্তৃত ফল্ট লাইন। সার্বিক আলোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রধান ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল পাঁচটি। এগুলো হলো মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত প্লেট সীমানা-১, নোয়াখালী থেকে সিলেট পর্যন্ত প্লেট সীমানা-২ এবং সিলেট থেকে ভারতের দিকে যাওয়া প্লেট সীমানা-৩; এগুলো বড় আকারের ভূমিকম্পনের সম্ভাব্য উৎস। এছাড়া রয়েছে ডাউকি ফল্ট ও মধুপুর ফল্ট।

বাংলাদেশ যে মারাত্মক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে তা বিভিন্ন দিক থেকে প্রমাণিত। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, গত ৩০০ বছরে এ অঞ্চলে শক্তিশালী বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিস্তা নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ার ঘটনা যেমন আছে, তেমনি ব্যাপক হতাহতের ঘটনাও আছে। ১৭৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিমি বিস্তৃত ফল্ট লাইনে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রায় তিন মিটার ওপরে উঠে আসে এবং সীতাকুণ্ডে পাহাড়ের নিচ থেকে কাদা-বালির উদ্‌গিরণ ঘটে এবং সে সময় ২০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন আসামে ঘটে যাওয়া ৮ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পকে বলা হয় ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়াক’। এ ভূমিকম্পে আসাম ও বাংলাদেশ অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামে ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে হামজারবাগে একটি বিল্ডিং ধসে ২৩ জন নিহত হয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-২০২০ অনুসারে সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি সিসমিক জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো জোন-১ (তীব্র ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল: সিলেট, ঢাকা বিভাগের কিছু অংশ ও উত্তর পূর্বাঞ্চল); জোন-২ (মাঝারি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল: চট্টগ্রাম বিভাগ, রাজশাহী এবং ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কিছু অংশ); জোন-৩ (মৃদু ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল: বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের অন্যান্য অংশ) এবং জোন-৪ (তুলনামূলক কম মৃদু ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সুন্দরবনসহ নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল)।

বাংলাদেশের নগর এলাকায় প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করে, প্রতি বছর নগর জনসংখ্যা বাড়ছে ৪ শতাংশ হারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নগর দুর্যোগগুলোর মধ্যে ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে, কারণ সঠিকভাবে অবকাঠামো নির্মিত না হওয়ায় নগর এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকির মাত্রা বেশি। নগর এলাকার আবাসিক ভবন, সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শপিং মল ইত্যাদি যদি সঠিকভাবে নির্মাণ করা না হয়, তবে ভূমিকম্পের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রাণহাণি বাড়াবে। রাজউকের তথ্য বলছে, ঢাকা শহরের ৪-৩০ তলা পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ ভবন ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) হিসাবে, বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি একতলা এবং ৯০ হাজার ৪৪৪টি ভবন দুই-পাঁচতলা, ৬-১০ তলা ১৩ হাজার ১৩৫টি এবং ১০ তলার ঊর্ধ্বে ৫৩৭টি। এসব ভবনের মধ্যে যেগুলো পুরনো ও বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি, সেগুলো ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) হিসেবে ১৮৯৭ সালের মতো ভূমিকম্পে ঢাকা শহরের ভালো মাটিতে নির্মিত ৭০-৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়তে পারে। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরে ১ লাখ ৪০ হাজার এবং সিলেট শহরের ৩০ হাজার ভবন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অতীতের দুর্যোগের ঘটনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে অনুরূপ একটি ঘটনাকে অনুমান করে আগে থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থপনার জন্য যথাযথ এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হলো দুর্যোগ প্রস্তুতি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায়, বিধায় অতীতের মতো ভবিষ্যতেও যেকোনো সময় এখানে ভূমিকম্প হতে পারে। ভূমিকম্প দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সীমিত রাখার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ওপরের সত্যগুলো মেনে আমাদের সচেতনভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করে ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি হতে হবে। ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। ভূমিকম্পের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ; বিভিন্ন স্থাপনাগুলো মজবুত কাঠামো ও বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণ করতে হবে। ভূমিকম্পের আগাম সতর্ক সংকেত দেয়া সম্ভব নয়, বিধায় সচেতনতা ও পূর্ব প্রস্তুতিই ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম উপায়। ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি মোকবেলায় উদ্ধারকর্মী, হাসপাতাল, উন্মুক্ত স্থান, আশ্রয়স্থল ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন নিয়মিত পরীক্ষা ও মহড়া প্রয়োজন। ভূমিকম্প যেহেতু প্রতিরোধ সম্ভব নয়, বিধায় বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

আরও