আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস

দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কতদূর

১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের ইতিহাসে বড় বড় অর্জন যেমন আছে, তেমনি আছে সীমাবদ্ধতার কালো ছায়াও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে।

দারিদ্র্য কেবল মানুষের আয়স্বল্পতার নাম নয়; বরং খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার নির্মম বাস্তবতা। একটি দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ল, বড় বড় অবকাঠামো নির্মিত হলো কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান উন্নত হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য পরিশোধ, সন্তানের শিক্ষা ও পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খায়, তবে সেই উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, দীর্ঘদিনের উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরও কেন বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং বর্তমান সরকার কীভাবে এ করুণ বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের ইতিহাসে বড় বড় অর্জন যেমন আছে, তেমনি আছে সীমাবদ্ধতার কালো ছায়াও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এ অগ্রগতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু দারিদ্র্যের হার কমার পরিসংখ্যান দেখলেই চলবে না; দেখতে হবে প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল, কর্মসংস্থান কতটা বেড়েছে এবং দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ কতটা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জন করেছেন।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যান্ড ইক্যুইটি অ্যাসেসমেন্ট ২০২৫ অনুসারে, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তবে ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য হ্রাসের গতি মন্থর হয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল বণ্টন তুলনামূলকভাবে কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে আরও উঠে এসেছে, ২০২২ সালে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে পুনরায় পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন। অর্থাৎ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসা মানেই অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ হয়ে যাওয়া নয়। অসুস্থতা, কর্মহীনতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মতো একটি ধাক্কাই বহু পরিবারকে আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ বাস্তবতা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দারিদ্র্য বিমোচনকে টেকসই করার ক্ষেত্রে নীতিগত দুর্বলতার প্রশ্ন সামনে আনে।

বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের উন্নয়ন মডেলের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান, আয়বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তার কার্যকর সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে না পারা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, দরিদ্রতম পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ সামাজিক সহায়তার বাইরে ছিল, অথচ তুলনামূলকভাবে অনেক সচ্ছল পরিবার এসব সুবিধা পেয়েছে। এ চিত্র সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং সম্পদের সুষম বণ্টনকে স্পষ্টতই প্রশ্নবিদ্ধ করে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও যদি প্রকৃত দরিদ্র মানুষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচির সাফল্য শুধু বরাদ্দ কিংবা সুবিধাভোগীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না।

পরবর্তী সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ থেকে ২০২৫ সালে আনুমানিক ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন, বিবিএসের নতুন সরাসরি জরিপের ফল নয়। তা সত্ত্বেও এ হিসাব একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। দারিদ্র্য হ্রাসের অতীত অর্জন অর্থনৈতিক ধাক্কা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতএব পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের ব্যর্থতার যথার্থ মূল্যায়ন হবে এ উপলব্ধিতে যে কিছু অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হলেও দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে। ২০২৬ সালের ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলা ও তিনটি সিটি করপোরেশনের ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। এ উদ্যোগের বিশেষ তাৎপর্য হলো, পরিবারের নারীপ্রধানের কাছে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে খাদ্য, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সহায়তা বিতরণের ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণসহ মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানোরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসবের সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া কতটা নির্ভুল, অর্থ নিয়মিত তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা এবং উক্ত সহায়তা পরিবারের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে—তার ওপর।

একইভাবে কৃষক কার্ড কর্মসূচি গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সরকারের ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পাঁচ বছরে ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের কাছে এ কার্ডের সুফল পৌঁছে দেয়া। বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ দারিদ্র্য বিমোচনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কার্ড বিতরণকে সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কৃষকের প্রকৃত আয়, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কতটা বেড়েছে, সেটিই হবে কর্মসূচিটির কার্যকারিতা নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি।

দারিদ্র্য বিমোচনে এ কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে শিক্ষিত বেকারত্ব ও অনিশ্চিত আয়ের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, রফতানিমুখী উৎপাদন এবং সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার, নিয়মিত যাচাই এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দারিদ্র্য বিমোচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো নিরাপদ আবাসন, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা। উপকূলীয় অঞ্চলের নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ বহু পরিবারকে বারবার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলে। অন্যদিকে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের বড় অংশের উপার্জন ব্যয় হয় বাসাভাড়া, খাদ্য ও যাতায়াতে। ফলে আয় বাড়লেও সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক সুরক্ষা, সাশ্রয়ী আবাসন, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানকে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

সবশেষে, দারিদ্র্য বিমোচনের প্রতিটি কর্মসূচির ফলাফল নিয়মিতভাবে প্রকাশ ও স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। কত টাকা ব্যয় হয়েছে কিংবা কতটি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, তার পাশাপাশি কত পরিবার স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে, কতজনের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং কত মানুষের প্রকৃত আয় বেড়েছে—এসব সূচককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে বাংলাদেশের সামনে তাই একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। উন্নয়নের সুফল যেন কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে। পতিত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সেই প্রবৃদ্ধিকে ন্যায়সংগত ও টেকসই করা। বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক উদ্যোগ সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং মানুষের জীবনমানের পরিমাপযোগ্য উন্নতির ওপর। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রকৃত অর্থ হবে এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ, যেখানে কোনো পরিবার খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অসহায় হবে না, কোনো কৃষক ফসল উৎপাদন করেও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে থাকবেন না এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবে কোনো তরুণের অমিত সম্ভাবনা চিরতরে বিনষ্ট হবে না।

মাহমুদুল হাসান কমল: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুখপাত্র, বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ)

আরও