৬ জানুয়ারি ট্রাম্প সমর্থকরা ক্যাপিটল ভবনে প্রবেশ করে সহিংসতা ছড়িয়ে দিলে আমেরিকার ভারসাম্য ও ভাবমূর্তি নিয়ে সমগ্র বিশ্বই এক ধরনের হতাশায় নিমজ্জিত হয়। এ অবস্থায় বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রসঙ্গে গোটা বিশ্ব, বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর অবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।
মানতেই হবে, মার্কিন বৈশ্বিক নেতৃত্বের সীমাগুলো তাত্পর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের শাসনামল শেষে আমেরিকার নির্ভরযোগ্য মিত্ররা পর্যন্ত দেশটির নির্ভরযোগ্যতা, মূল্যবোধ এবং সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপকমাত্রায় সন্দিহান। কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে ট্রাম্প প্রশাসন যারপরনাই ব্যর্থ। বরং তারা জাতীয় বিশৃঙ্খলতাকে আরো বেশি জোরদার করেছে। ক্যাপিটল ভবনের ঘটনার নেপথ্যে খোদ ট্রাম্প উসকানি দিয়েছিলেন। তার অভিপ্রায় ছিল বাইডেনের নির্বাচনী বিজয়কে ধূলিসাৎ করে দেয়া। বাইডেনের পক্ষে কংগ্রেসের সমর্থন থাকলেও ট্রাম্প সেসব থোড়াই কেয়ার করেছেন।
আমরা যদি অর্থনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখি, এক দশক আগে আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে যে কর্তৃত্বের অবস্থানে ছিল, বর্তমানে তারা এর ধারেকাছেও নেই। আমি মাত্র এক প্রজন্ম আগের কথা বলছি। ধরে নিচ্ছি, মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সামান্যই। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এমন অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য বাইডেন প্রশাসনের ক্ষমতা সীমিত বলেই মনে হচ্ছে।
বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। আমেরিকার পাশাপাশি বাকি বিশ্বের কল্যাণের জন্য সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে এমন নীতি বাস্তবায়নের জন্য বাইডেনের কিন্তু কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন নেই।
প্রথম পদক্ষেপটি হচ্ছে কভিড-১৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) কর্তৃক প্রস্তাবিত বৌদ্ধিক সম্পত্তিগত নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো বাতিলবিষয়ক আপত্তি নাকচ করে দেয়া। কভিড-১৯ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা সম্পর্কিত সাশ্রয়ী মূল্যের মেডিকেল সরঞ্জামাদি সময়মতো প্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতাগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত প্রস্তাবটি পেশ করে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশও তাতে সমর্থন দেয়।
যা ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ: বাণিজ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার (টিআরআইপিএস) চুক্তিতে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিংয়ের অনুমতি দেয়। উপরন্তু টিআরআইপিএসের আওতায় জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে ডব্লিউটিও বাধ্যতামূলক লাইসেন্স দেয়ার জন্য যথেষ্ট, এর ফলে অনেক বেশি কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করা সম্ভব হবে। তাছাড়া এ বিধানটি প্রয়োগ করার জন্য কভিডের মতো এমন উপযুক্ত পরিস্থিতির বিকল্প কল্পনা করাটাও কঠিন।
কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ও ওষুধের কম মূল্যের মাধ্যমে সর্বসাধারণ মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবেন। উন্নত অর্থনীতির জন্যও বিষয়টি সত্য—কেননা তাদের সরকারি বাজেটও বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। অথচ উন্নত অর্থনীতির প্রতিনিধিত্বকারী আমেরিকা প্রস্তাবনাটির বিরোধিতা করে বসে আছে। আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, এ থেকে কেবল একটি গোষ্ঠীরই লাভ হচ্ছে। আর তারা হচ্ছে বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি। এটা কোম্পানিগুলোর খরচ উঠিয়ে নেয়ার বিষয় নয়। কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উন্নয়নের নেপথ্যে সরকারি গবেষণার বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। তাছাড়া প্রায় সব অর্থায়নও হয়েছে সরকারি বাজেটের মাধ্যমে। এমনকি বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার আইন সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করলেও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও বেশ ভালো অংকের মুনাফা তৈরিতে সক্ষম হবে।
অন্যায্যভাবে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির পকেট ভারী করার স্বার্থে কভিড-১৯-এর পেটেন্ট একচেটিয়াভাবে তাদের দখলে রাখলে সবার ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিতের বিষয়টি কেবল প্রলম্বিতই হবে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি অর্থনীতির ওপরও। তাই বাইডেন প্রশাসন যদি উন্নত অর্থনীতিগুলোকে বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার আইনের সাময়িক প্রত্যাহারের পক্ষে নেতৃত্ব দান করে, তাহলে অগণিত মানুষের জীবন রক্ষা হয়। একই সঙ্গে বেগবান হবে বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও।
যেমন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্য দেশগুলোতে বিশেষ বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকারবিষয়ক অনুমতি প্রদানের জন্য বাইডেন প্রশাসনের কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে না। গত এপ্রিলে আইএমএফের ৫০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের অনুমতিকে আমেরিকা আটকে দেয়। (ভারতও একই কাজ করেছে, তবে আমেরিকা যদি এটা প্রত্যাহার করে নেয়, তবে ভারত এখানে জোর করতে পারবে না। তাছাড়া ভারতের ভোট প্রদানের ক্ষমতাও সীমিত। তাই তাদের বিরোধিতাও টিকবে না।)
এ পর্যায়ে ৫০০ বিলিয়ন ডলার কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়; ধুঁকতে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি ফেরাতে কমপক্ষে ২ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রয়োজন। তবে প্রাথমিকভাবে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এসডিআর ইস্যুর মাধ্যমে ব্যাপক পরিসরে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির বন্দোবস্ত করা সম্ভব, বিশেষ করে অনেক বেশি ঋণগ্রস্ত দেশ এর মাধ্যমে উপকৃত হবে।
বাইডেন প্রশাসনের তৃতীয় অগ্রাধিকার হচ্ছে, বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মুনাফার ওপর একটি কার্যকর বৈশ্বিক কর ব্যবস্থা তৈরিতে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা। ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশন যেমন স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করে দেখিয়েছে। আর কাজটি করা খুব একটা কঠিন নয়। এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেটি হচ্ছে বিশ্বজুড়ে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ কার্যকরী করপোরেট কর হার নির্ধারণ। একটি নির্দিষ্ট দেশে কোনো কোম্পানির লাভের ওপর কর আদায় এমন একটি সূত্র অনুযায়ী নির্ধারিত হবে যার মধ্যে বিক্রয়, কর্মসংস্থান, ব্যবহারকারী (ডিজিটাল কোম্পানির ক্ষেত্রে) এবং মূলধন অন্তর্ভুক্ত। এভাবে অগ্রসর হলে লভ্যাংশের পরিমাণ কম দেখিয়ে কৃত্রিমভাবে প্রতিবেদন বদলে বহুজাতিক সংস্থাগুলো আর কর ফাঁকি দিতে সমর্থ হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসন তীব্রভাবে ন্যায্য বহুজাতিক করের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন ডিজিটাল জায়ান্ট ফেসবুক, অ্যাপল ও গুগলের ওপর ফ্রান্সের কর ধার্যের সিদ্ধান্তকে ঘিরে তারা দাবি করে যে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক আচরণস্বরূপ প্রতিশোধমূলক শুল্কারোপ করছে দেশটি। বাইডেন প্রশাসনের এক্ষেত্রে বিপরীত পন্থা অবলম্বন এবং বিশ্বব্যাপী সরকার ও জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করা উচিত।
তাছাড়া ক্ষমতায় বসার প্রথম দিনেই বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বেগবান করতে তার সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বাতিল করা প্যারিস চুক্তিতে প্রবেশ করবে। প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমেরিকা গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি দুর্দশাগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
প্যারিস চুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ডিকার্বনাইজিং করার জন্য এখন পর্যন্ত এটা আমাদের সেরা আশা। এটিকে কার্যকর করতে আমেরিকার ভূমিকা অপরিহার্য। কেননা ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন তার দেশের কর্মজীবী, ব্যবসায়ী ও কারদাতাদের ওপর ‘অন্যায্য অর্থনৈতিক বোঝা’ উল্লেখ করে প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহার করে নিলেন, তখন অন্য অনেক দেশও তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো কমিয়ে দিয়েছিল।
অতিসম্প্রতি চীন থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান অর্থনীতিগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উচ্চাভিলাষী নতুন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এমনকি মার্কিন ব্যবসায়ীরাও উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যই লাভজনক।
প্যারিস চুক্তিকে পুনরায় স্বীকৃতি দিয়ে বাইডেন জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বৈশ্বিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবেন এবং মহামারী পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা জোগাবেন। এ অবস্থায় আমরা আশা করতেই পারি, দোদুল্যমান অবস্থায় থাকা অন্য কাজগুলোও তিনি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করবেন।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
জয়তী ঘোষ: ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এবং ইনডিপেনডেন্ট কমিশন ফর দ্য রিফর্ম অব ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশনের সদস্য।
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস