বহির্বাণিজ্য

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে দেশীয় বায়োটেকনোলজি ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের সম্ভাবনা

জাতিসংঘ চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে চলতি বছর এলডিসি উত্তরণ করব আমরা। সরকার যদিও তা তিন বছর পেছানোর আবেদন করেছে এবং জাতিসংঘও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

তবে একসময় আমাদের এলডিসি উত্তরণ করতেই হবে। এর আগে প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে রফতানির মাধ্যমে বহুমুখী করা জরুরি। এক্ষেত্রে দেশীয় বায়োটেকনোলজি ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের বাণিজ্য সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। খাত দুটো দেশের বিকাশমান শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর। তাই এ দুই খাতের জন্য কাঙ্ক্ষিত বাজার খোঁজার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। তুলনামূলক বিচারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একক বাজার এ দুই শিল্পের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সম্পর্কিত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার চুক্তি বা ‘ট্রিপস’-এর আওতায় এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধ খাতে পেটেন্ট ছাড়ের এক বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। এ সুবিধার ফলেই দেশের ফার্মা খাত বিশ্বমানের ওষুধ আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে স্থানীয় জনগণকে দিতে পেরেছে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের স্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে আমাদের দেশের মোট ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় এবং আমরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এলডিসি উত্তরণের পর এ পেটেন্ট ছাড়ের মেয়াদ বা বিশেষ সুবিধা আর কার্যকর না থাকলে ফার্মা ও লাইফ সায়েন্স খাতের বাণিজ্যিক রূপরেখা কেমন হবে? ইইউর মতো সংবেদনশীল ও নিয়মকানুনভিত্তিক বাজারে আমরা কি সেই নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত?

ট্রিপস নমনীয়তা উঠে যাওয়ার সরাসরি অর্থ হলো, নতুন মূল অণু (স্মল মলিকিউল ড্রাগস) বা বায়োলজিকসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আইন শতভাগ মেনে চলতে হবে। পেটেন্টপ্রাপ্ত কোনো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বা বায়ো-সিমিলার বিশ্ববাজার থেকে সরাসরি কপি করে আগের মতো স্বল্পমূল্যে উৎপাদন ও বাজারজাত করা আইনগতভাবে আর সম্ভব হবে না। অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণের পর ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বাংলাদেশকে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধার জন্য দরকষাকষি করতে হবে। তবে জিএসপি প্লাস বাণিজ্য শুল্কে ছাড় দিলেও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বা পেটেন্ট আইনের কঠোর বাধ্যবাধকতা শিথিল করে না।

ফলে নতুন ও উচ্চমানের ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ, অটো-ইমিউন ডিজিজের চিকিৎসাসামগ্রী, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার কিংবা হৃদরোগের আধুনিক জৈব ওষুধের ওপর আমদানিনির্ভরতা বা পেটেন্ট ফি দেয়ার কারণে স্থানীয় বাজারে দাম বহুগুণ বাড়বে। একই সময়ে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার্ড জেনেরিক পণ্য নিয়ে ইউরোপে সরাসরি রফতানির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। বৈশ্বিক ওষুধ শিল্প এখন কেমিক্যালভিত্তিক সিন্থেটিক ওষুধ থেকে দ্রুত স্থানান্তরিত হচ্ছে ‘বায়োফার্মাসিউটিক্যালস’ বা জিন ও অণুজীবভিত্তিক বায়োলজিকসের দিকে। ভ্যাকসিন, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন এবং জিন থেরাপিই হলো বিশ্ব চিকিৎসার নতুন ভবিষ্যৎ। তাই ট্রিপস-পরবর্তী বাস্তবতায় ইইউ বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে অতি দ্রুত ‘জেনেরিক রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং’ মডেল থেকে বেরিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি ও ‘হোমগ্রোন’ উদ্ভাবনী মডেলে প্রবেশ করতেই হবে।

ফার্মাসিউটিক্যালস ও বায়োটেক খাতে সম্ভাব্য এ বাণিজ্য ধাক্কা সামলানো এবং ইইউ ব্লকে শক্তিশালী বিকল্প তৈরির মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে দেশীয় বায়োটেকনোলজি এবং অণুজীব প্রযুক্তির শিল্পায়নের মধ্যে। ইউরোপের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসার ব্যয় কমাতে তারা এখন সাশ্রয়ী অথচ উচ্চমানের ‘বায়ো-সিমিলার’ ও অ্যাক্টিভ ফার্মা ইনগ্রেডিয়েন্টের (এপিআই) সন্ধান করছে। পেটেন্ট জটিলতার অধিকাংশ সুযোগ তৈরি হয় বহুজাতিক কেমিক্যাল স্ট্রাকচার ও মলিকিউলের ক্ষেত্রে। কিন্তু দেশীয় অণুজীবের বৈচিত্র্য ব্যবহার করে গাঁজন ও বায়োপ্রসেস প্রযুক্তির মাধ্যমে যে ভ্যাকসিন, এনজাইম, বায়ো-সিমিলার, কাঁচামাল কিংবা প্রোবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব, তা আমাদের সরাসরি পেটেন্ট সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ‘বায়ো-ইকোনমিক সার্বভৌমত্ব’ ও ইউরোপের বাজারে নতুন স্থান দিতে পারে।

আমাদের বুঝতে হবে, লাইফ সায়েন্স শিল্পে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অর্থ শুধু মানুষের ওষুধ তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতও। বর্তমানে আমাদের পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতের চাহিদা মেটাতে বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকার পশুখাদ্য অ্যাডিটিভস, এনজাইম ও অ্যানিমেল ভ্যাকসিন আমদানি করতে হয়। এর বিশাল অংশ কেমিক্যাল বা পেটেন্টেড প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। যদি আমরা ফারমেন্টেশন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ বাড়িয়ে দেশীয় অণুজীবভিত্তিক প্রোবায়োটিকস, এগ্রো-ভিটামিন ও স্থানীয় জীবাণুর স্ট্রেইন ব্যবহার করে পশুচিকিৎসা ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারি, তবে একদিকে যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটবে, অন্যদিকে কৃষি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বন্ধ হবে। তখন ইইউর কঠোর অর্গানিক মানদণ্ড মেনে বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশকে ফার্মা জেনেরিক হাব থেকে ‘বায়োটেক ইনোভেশন হাব’-এ রূপান্তর করতে হলে আমাদের উচ্চ শিক্ষা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাইক্রোবায়োলজি, বায়োটেকনোলজি এবং বায়োইনফরমেটিকস বিভাগে উচ্চমানের গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কৃত অনেক ফলপ্রসূ উদ্ভাবন শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়; তা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডিং বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাপোর্ট পায় না।

বিশ্বের যেকোনো দেশে বায়ো-টেকনোলজিভিত্তিক শিল্প বৈপ্লবিক উন্নতি করেছে একাডেমিয়ার সঙ্গে শিল্পসংযুক্তি। আমাদের স্থানীয় ফার্মা কোম্পানিগুলোকে এখন যৌথভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বায়ো-গবেষণায় বিশেষ তহবিল বা ‘আরঅ্যান্ডডি’ স্পন্সরশিপ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সির (ইএমএ) মানদণ্ড মেনে উৎপাদন প্রক্রিয়া সাজাতে ইউরোপীয় বায়োটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর জোরদার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘বায়ো-ইনকিউবেশন সেন্টার’ ও টেস্ট বায়োরিয়্যাক্টর স্কেল-আপ ফ্যাসিলিটি তৈরি করা প্রয়োজন। তাতে মেধাবী তরুণরা সরাসরি ‘বায়ো-উদ্যোক্তা’ হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পণ্য রূপান্তর করতে পারেন।

এলডিসি-পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদের এখনই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেয়া দরকার। ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি দূরদর্শী ‘জাতীয় বায়োম্যানুফ্যাকচারিং পলিসি’ প্রণয়ন করতে হবে। গবেষণাগার থেকে পণ্য বাজারে আনার মধ্যবর্তী পথকে সহজ করতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ অর্থায়নে একটি বিশেষ ‘ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড’ গঠন জরুরি। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বায়োলজিকস, ভ্যাকসিন এবং বায়ো-সিমিলারের দ্রুত অনুমোদন ও বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করতে আমাদের ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের নীতি ও কারিগরি সক্ষমতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সির মানদণ্ডে উন্নীত করতে হবে।

যেসব ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োটেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশীয় কাঁচামাল ও অণুজীব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘হোমগ্রোন’ ভ্যাকসিন, এনজাইম কিংবা এপিআই তৈরিতে বিনিয়োগ করবে, তাদের আগামী অন্তত ১০ বছরের জন্য কর মওকুফ ও কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়া উচিত।

২০২৬ সালের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন কেবল একটি চ্যালেঞ্জের বার্তা নয়, বরং এটি আমাদের শিল্প খাতকে পুনর্গঠন করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ। ট্রিপস নমনীয়তা চলে যাওয়া আমাদের দেশীয় লাইফ সায়েন্স শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করার এবং ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের টেকসই ভাবমূর্তি তৈরির জন্য একটি প্রয়োজনীয় উদ্দীপক হিসেবে কাজ করতে পারে। মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা যদি এখন থেকেই যৌথ গবেষণা, বাণিজ্যিক রূপান্তর, ইইউ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় এবং নীতিগত সহায়তা জোরদার করি, তবে ট্রিপস-পরবর্তী যুগে বাংলাদেশ কেবল তার ওষুধ খাতের আত্মনির্ভরশীলতাই ধরে রাখবে না; বরং এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান বায়ো-ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে ইউরোপসহ বিশ্ববাজারে এক নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করবে।

ড. মো. ফকরুদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

আরও