বাণিজ্য প্রসারে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি

সম্প্রতি চীনে সে দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, স্থলবেষ্টিত নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারে। মূলত আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা এবং এ থেকে সংশ্লিষ্ট সবার অভিন্ন উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি একথা বলেছেন।

জনসংখ্যা ও বাজারের আকার বিবেচনায় এশিয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ফের আবির্ভূত হয়েছে। এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতি চীন এরই মধ্যে বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সামনের দিনগুলোয় দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর ভূমিকা আরো বাড়বে। মোদ্দাকথা বিশ্ব অর্থনীতি এশিয়ার ওপর সামনের দশকগুলোয় আরো নির্ভরশীল হবে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি চীনে সে দেশের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, স্থলবেষ্টিত নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সমুদ্রপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারে। মূলত আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা এবং এ থেকে সংশ্লিষ্ট সবার অভিন্ন উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি একথা বলেছেন। উল্লেখ্য, সেভেন সিস্টার্স প্রসঙ্গে তিনি এই প্রথমবার বলেননি। তিনি ২০১২ সালে একই ধরনের কথা বলেছিলেন। ২০২৩ সালেও জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিশিদা নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশকে একটা ভ্যালু চেইনে আবদ্ধ করার কথা বলেছিলেন এবং তিনি এ প্রসঙ্গে সিঙ্গেল ইকোনমিক জোনের (একক অর্থনৈতিক অঞ্চল) কথাও বলেছিলেন, যেটিকে ‘বিগ বি ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

গত এক দশক ধরে অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিনিয়োগ করছে জাপান। সব দিক মিলিয়ে অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে জাপানি অর্থায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ। অন্যদিকে একই চিন্তাধারা নিয়ে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছে। এ সামান্য পর্যালোচনা থেকে বুঝা যায় এসব কিছুর মূলে রয়েছে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অথচ প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের পর ভারতের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশ্লেষকরা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখান যার আসলে রাজনৈতিক ছাড়া কোনো উপযোগিতা নেই। একটা ভালো প্রস্তাবকে তারা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ভারতের একটা এলাকা যা সম্পূর্ণভাবে স্থলবেষ্টিত যার সমুদ্রে যাওয়ার কোন পথ নেই তাই প্রধান উপদেষ্টা তাদেরকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাব তিনি নেপাল ও ভুটানকেও দিয়েছেন। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাব। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই সবচেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত এবং মূল্যবান। যে দেশ অর্থনীতিকভাবে যত বেশি উন্নত বিশ্বে তার মূল্যায়ন তত বেশি।

সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ তাদের দেশের অর্থনৈতিক আধিপত্যকেই তুলে ধরে। সুতরাং আমদের এ অঞ্চল যদি পরস্পরের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে তবে শেষ পর্যন্ত এ এলাকার মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটবে এবং বিশ্বে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী হবে। আর এ উন্নয়ন দর্শন নিয়ে কাজ করেই তো ড. ইউনূস নোবেল পেয়েছেন। তার চিন্তাধারায় সর্বদা মানুষ স্থান পেয়েছে। তাই তিনি সারা বিশ্বের কাছে একজন অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। যার কথা শোনার জন্য সারা বিশ্বের মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকে। তার বক্তব্যকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে যে দেশে যে পণ্য বা সেবা উৎপাদনে পারদর্শী সে দেশ সেই পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবে এবং রপ্তানি করবে। এই একই কথা প্রযোজ্য প্রাকৃতিক সুবিধার ক্ষেত্রেও। নেপাল যেমন তাদের অবকাঠামো ব্যবহার পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তাই তারা যদি এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে তা নেপালের জন্য যেমন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে তেমনি বাংলাদেশ, ভারত উপকৃত হতে পারে। তেমনি ভারতের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশ ব্যবহার করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলতে পারে। তাই রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও