দীর্ঘ ৫৫ বছর পর বাংলাদেশ অর্থবছরের কাঠামো বদলাতে যাচ্ছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বর্তমানের ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত চলা অর্থবছরের পরিবর্তে ভবিষ্যতে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর নির্ধারণ করা হবে। আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ট্রানজিশনাল ধরে ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) শেষ করে, ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন কাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।
কেন এপ্রিল-মার্চ, ক্যালেন্ডার বছর কেন নয়
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরকেই অর্থবছর করা হলো না কেন? বিশ্বের প্রায় ১৫৪টি দেশ ইংরেজি ক্যালেন্ডার বছরকেই অর্থবছর হিসেবে অনুসরণ করে—চীন, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, স্পেন, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেন এ তালিকায় পড়ে।
এ পথে গেলে বাংলাদেশের জন্য কিছু স্পষ্ট সুবিধা তৈরি হতো। ব্যাংক-বিমা খাত এরই মধ্যে জানুয়ারি-ডিসেম্বর হিসাব বছর অনুসরণ করে, ফলে সরকারি অর্থবছর ও বেসরকারি খাতের হিসাব বছরের ফারাক ঘুচে যেত; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করায় প্রতিবেদন-তুলনা সহজ হতো; আর প্রশাসনিক দিক থেকে এটিই হতো সবচেয়ে সরল সমাধান।
তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারি সীমানা বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতির সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ের একটি। আমন কাটা-মাড়াই ও বোরো রোপণ একসঙ্গে চলে এ সময়ে। ফলে বছরের শেষভাগে হিসাব বন্ধ করা প্রশাসনিকভাবে চাপের হতে পারে। শেষে সরকার এপ্রিল-মার্চকেই বেছে নিয়েছে মূলত উন্নয়ন-বাস্তবায়নের ঋতুগত সুবিধার কারণে। এই কাঠামোয় অর্থবছরের শেষ তিন মাস (জানুয়ারি-মার্চ) পড়ে শুষ্ক মৌসুমে, যখন সড়ক-সেতু-অবকাঠামোর কাজ নির্বিঘ্নে শেষ করা যায় এবং বছরের প্রথম প্রান্ত থেকেই বর্ষা শুরুর আগে পুরো নির্মাণ মৌসুম হাতে থাকে। ধান-চাল সংগ্রহ ও কৃষি ভর্তুকির হিসাব-চক্রও এতে এক অর্থবছরের মধ্যেই গুছিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। সংক্ষেপে বললে, ক্যালেন্ডার বছর প্রশাসনিক সরলতা দিত, কিন্তু ঋতুভিত্তিক উন্নয়ন-বাস্তবায়নের সুবিধা দিত না—সরকার সেই বিচারে ঋতু-সংগতিকে প্রাধান্য দিয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ও বিশ্বের অর্থবছর গণনার চিত্র
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থবছর-কাঠামো একরৈখিক নয়। পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের বর্তমান কাঠামোর মতো জুলাই-জুন অনুসরণ করে। ভারত, যুক্তরাজ্য, হংকং, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকা এপ্রিল-মার্চ কাঠামোয় চলে— বাংলাদেশ এখন যে পথে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরকেই অর্থবছর হিসেবে গ্রহণ করেছে। নেপালের কাঠামো সবচেয়ে ভিন্ন— নিজস্ব বিক্রম সম্বৎ পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৬ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের অর্থবছর চলে। ইরানে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে ২১ মার্চ থেকে ২০ মার্চ, ইথিওপিয়ায় ৮ জুলাই থেকে ৭ জুলাই অর্থবছর গণনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, কোস্টারিকা ও থাইল্যান্ডে আবার অর্থবছর শুরু হয় অক্টোবরে।
এ বৈচিত্র্য থেকে স্পষ্ট, অর্থবছরের সময়সীমা নির্ধারণে সর্বজনীন কোনো নিয়ম নেই—প্রতিটি দেশ নিজের কৃষি-ঋতু, প্রশাসনিক ইতিহাস ও বাণিজ্য-অংশীদারদের বিবেচনায় নিজস্ব কাঠামো ঠিক করেছে। বাংলাদেশ এখন যে কাঠামোয় যাচ্ছে, তার নিকটতম প্রতিবেশী ভারত সেই কাঠামোতেই আছে, কিন্তু আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তান রয়ে যাচ্ছে পুরোনো জুলাই-জুন কাঠামোতেই — এই আঞ্চলিক অসামঞ্জস্য ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় হিসাব-তুলনায় সামান্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
জুলাই-জুন অর্থবছরের শিকড়
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই-জুন অর্থবছরের চল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই শুরু হয়ে পাকিস্তান শাসনামল এবং সেখান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়েছে দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে এই কাঠামো নতুন করে প্রবর্তিত হয় — এ নিয়ে সূত্রভেদে সামান্য অস্পষ্টতা থাকলেও মূল সত্যটি অভিন্ন: স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশ এই কাঠামোতেই স্থির ছিল, কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখন এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা ভেঙে বাংলাদেশ এমন একটি কাঠামোয় যাচ্ছে, যা ইতিমধ্যে ভারত ও যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশে বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।
বাজেট ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
পরিবর্তনটি নিছক ক্যালেন্ডার-বদল নয়। এর প্রভাব পড়বে গোটা রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় — বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট ব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু তারিখ বদলালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না; বরাদ্দ বিতরণ, প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া, দরপত্র ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে কাঠামোগত সংস্কার না হলে কেবল অর্থবছর বদলে ফলাফল খুব বেশি বদলাবে না।
করবর্ষ ও ট্যাক্স-সময়সীমার সঙ্গে সম্পর্ক
এখানেই সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি—আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট নির্ধারণ, ব্যাংক-বিমা খাতের করবর্ষ, কোম্পানির নিরীক্ষা, সবকিছুর সময়সীমা নতুন কাঠামোর সঙ্গে মেলাতে হবে। এ ব্যাপারেও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরে সরকার সরে গেলেও ব্যাংকিং খাত জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরেই থেকে যাচ্ছে, ফলে সরকারি অর্থবছর ও ব্যাংক হিসাব বছরের মধ্যে নতুন এক অসামঞ্জস্য তৈরি হবে।
এ দ্বৈততা মোকাবেলায় সংবিধান ও জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টসহ প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনী আনতে হবে, আর এ জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, লেজিসলেটিভ ও অর্থ বিভাগ সমন্বয়ে একটি পৃথক কমিটি কার্যকর করণীয় নির্ধারণ করবে, না হলে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা বাড়তে পারে।
এ পরিবর্তনের ফলে কর মূল্যায়ন বর্ষ, রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা, উৎসে কর কর্তনের হিসাবচক্র, কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা ও নিরীক্ষার সময়রেখা—সবকিছু নতুন করে সাজাতে হবে। এই সমন্বয় যুক্তিসংগত হলেও বাস্তবায়নে যথেষ্ট কারিগরি জটিলতা তৈরি করবে, বিশেষত ট্রানজিশনাল ৯ মাসের অর্থবছরে দ্বৈত হিসাবরক্ষণের নতুন চাপ সামলাতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
পরিশেষে, অর্থবছর বদলের যুক্তি—শুষ্ক মৌসুমে উন্নয়নকাজ, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সাযুজ্য, কৃষিভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা—এ সবই নীতিগতভাবে সংগত, এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ একাধিক দেশের অভিজ্ঞতাও এই কাঠামোর পক্ষেই কথা বলে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর, শুধু ক্যালেন্ডারের ওপর নয়।
প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, অর্থছাড়ে বিলম্ব ও তদারকির দুর্বলতা অপরিবর্তিত থাকলে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরও পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন মোড়কে বহন করবে। বরং এই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে করনীতি, বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতায় সমান্তরাল সংস্কার আনাই হবে প্রকৃত অর্জন।
এম এম মাহবুব হাসান: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক