ব্যক্তিগত অর্থের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় চাই আর্থিক সাক্ষরতা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে আর্থিক পরামর্শদাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করেন। এরা বিভিন্ন প্লাটফর্ম, যেমন ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও লিংকডইনে কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রচুর অনুসারী অর্জন করেন যার মধ্যে তরুণ অনুসারীর সংখ্যাই বেশি।

বাংলাদেশে এ বছর আর্থিক সাক্ষরতা সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে ১৭ মার্চ থেকে, যা চলমান থাকবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক সব তফসিলি ব্যাংককে ‘Think before you follow, wise money tomorrow’ থিমের ওপর বিশেষ গুরুত্বআরোপ করে সুনির্দিষ্ট কিছু কাজের নির্দেশনা দিয়েছে। এ থিমের মূল লক্ষ্য হলো আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রভাবশালী উপাদান সম্পর্কে তরুণ জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা।

বিশেষ করে আর্থিক পরামর্শদাতা, অন্ধ অনুকরণ, পক্ষপাতদুষ্ট উপদেশ এবং সহকর্মী অথবা সামজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রেশারের মতো বিষয়গুলো কীভাবে মানুষের আর্থিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা।

আর্থিক পরামর্শদাতাদের ভূমিকা ও প্রভাব:

বর্তমান ডিজিটাল যুগে আর্থিক পরামর্শদাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করেন। এরা বিভিন্ন প্লাটফর্ম, যেমন ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও লিংকডইনে কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রচুর অনুসারী অর্জন করেন যার মধ্যে তরুণ অনুসারীর সংখ্যাই বেশি।

আর্থিক পরামর্শদাতাদের কার্যক্রম:

# জটিল আর্থিক ধারণাগুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য উপযোগী।

# শেয়ারবাজার, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা স্টার্টআপ বিনিয়োগ সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রদান করেন।

# বাজেটিং, সঞ্চয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করেন।

আর্থিক সিদ্ধান্তে আর্থিক পরামর্শদাতাদের পরামর্শের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি:

# অনেক আর্থিক পরামর্শদাতা যথাযথ গবেষণা বা আর্থিক লাইসেন্স ছাড়া পরামর্শ দেন, যা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

# অনেক সময় ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ বা পারিশ্রমিকের কারণে পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য প্রদান করা হয়।

# কিছু আর্থিক পরামর্শদাতা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ (যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সি) প্রচার করেন, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সচেতন/সতর্ক থাকার উপায়:

# যেকোনো আর্থিক পরামর্শ গ্রহণের আগে নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করা।

# কেবল আর্থিক পরামর্শদাতার কথা শুনে বিনিয়োগ না করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া।

# সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত পরামর্শ অনুসরণ করা।

আর্থিক সিদ্ধান্তে দলগত অন্ধ অনুকরণের প্রভাব:

দলগত অন্ধ অনুকরণ হলো এমন একটি আচরণ, যেখানে মানুষ নিজের বিবেচনা ছাড়াই একতরফাভাবে অন্যদের অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, বিশেষ করে বিনিয়োগ ও আর্থিক ক্ষেত্রে। এটি শেয়ারবাজার, ক্রিপ্টোকারেন্সি, রিয়েল এস্টেট ও অন্যান্য বিনিয়োগ ক্ষেত্রগুলোয় ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়।

আর্থিক সিদ্ধান্তে দলগত অন্ধ অনুকরণের সুবিধা:

# অন্যদের পদক্ষেপ দেখে অনেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা সময় সাশ্রয়ী।

# যদি অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের অনুসরণ করা হয়, তাহলে ভালো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার সম্ভাবনা থাকে।

# বৃহত্তর বিনিয়োগকারীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে বাজারের প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

আর্থিক সিদ্ধান্তে দলগত অন্ধ অনুকরণের অসুবিধা ও ঝুঁকি:

# অনেকে বাজার বিশ্লেষণ না করেই অন্যদের দেখে বিনিয়োগ করেন, যা লোকসানের কারণ হতে পারে।

# যখন অনেকে একই বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়েন, তখন বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ধসে পড়তে পারে।

# যদি অধিকাংশ মানুষ ভুল বিনিয়োগের দিকে এগিয়ে যায়, তবে এটি সামগ্রিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সচেতন/সতর্ক থাকার উপায়:

# বিনিয়োগের আগে স্বতন্ত্র গবেষণা করা ও বাজার বিশ্লেষণ করা।

# শুধু জনমতের ভিত্তিতে নয়, বরং আর্থিক পরামর্শদাতাদের মতামত গ্রহণ করা।

# উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতাগুলো (যেমন হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্টক বা ক্রিপ্টো) এড়িয়ে চলা।

আর্থিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ পরামর্শের প্রভাব:

পক্ষপাতিত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো এমন পরামর্শ যা পরামর্শদাতার ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আগ্রহের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়, যা সব সময় পরামর্শ গ্রহণকারীর জন্য সর্বোত্তম হতে নাও পারে। এটি আর্থিক সিদ্ধান্তে ভুল বা অসম্পূর্ণ সিদ্ধান্তে নিয়ে যেতে পারে।

আর্থিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ পরামর্শের সুবিধা:

# কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে।

# পরামর্শদাতার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কার্যকর পরামর্শ প্রদান করতে পারে।

আর্থিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ পরামর্শের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি:

# পরামর্শদাতা নিজস্ব স্বার্থের দিকে ঝুঁকে থাকতে পারে, যা গ্রহণকারীর ক্ষতি হতে পারে।

# পরামর্শদাতা যদি নিজের লাভের জন্য পরামর্শ দেয়, তা ভুল সিদ্ধান্তে নিয়ে যেতে পারে।

# প্রয়োজনীয় তথ্য না দেয়ার ফলে ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সচেতন/সতর্ক থাকার উপায়:

# যেকোনো আর্থিক পরামর্শের জন্য নিরপেক্ষ পরামর্শদাতা নির্বাচন করুন।

# একাধিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন।

# পরামর্শের সত্যতা যাচাই করুন এবং নিজের গবেষণা করুন।

আর্থিক সিদ্ধান্তে পিয়ার অথবা সোশ্যাল মিডিয়া প্রেশারের প্রভাব:

পিয়ার অথবা সোশ্যাল মিডিয়া প্রেশার হলো এমন চাপ, যা একজন ব্যক্তি তার বন্ধু, সহকর্মী বা সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মের মাধ্যমে অনুভব করে। এটি তাকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা তার প্রকৃত ইচ্ছা বা পরিস্থিতির বিপরীত হতে পারে।

আর্থিক সিদ্ধান্তে পিয়ার অথবা সোশ্যাল মিডিয়া প্রেশারের সুবিধা:

# কিছু ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া অথবা পিয়ার প্রেশার একজনকে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে এবং নিজের সীমা ছাড়াতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

# সামাজিক চাপে নতুন সম্পর্ক তৈরি এবং নেটওয়ার্কিংয়ে সহায়ক হতে পারে, যা ভবিষ্যতে উপকারী হতে পারে।

আর্থিক সিদ্ধান্তে পিয়ার অথবা সোশ্যাল মিডিয়া প্রেশারের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি:

# অতিরিক্ত পিয়ার প্রেশার বা সোশ্যাল মিডিয়ার চাপে নিজের মনের ইচ্ছা বা ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলা হতে পারে।

# সোশ্যাল মিডিয়া এবং পিয়ার প্রেশার একজনকে অপ্রয়োজনীয় খরচ করতে প্ররোচিত করতে পারে, যেমন ব্র্যান্ডেড পণ্য কেনা।

# অপরিচিত বা অযথা তুলনা এবং চাপে মানসিক সমস্যা বা উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে।

সচেতন/সতর্ক থাকার উপায়:

# নিজের ইচ্ছা এবং মূল্যবোধের প্রতি সদয় থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়া বা পিয়ার চাপ থেকে বের হয়ে আসুন।

# সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় সীমিত করুন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতেই মনোযোগ দিন।

# পজিটিভ এবং সহায়ক মানুষের মধ্যে সময় কাটান, যারা আপনাকে আপনার সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

‘Think before you follow, wise money tomorrow’ থিমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক তরুণ জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেতন করতে চাচ্ছে। আর্থিক পরামর্শদাতা, অন্ধ অনুকরণ, পক্ষপাতদুষ্ট উপদেশ এবং সহকর্মী অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রেশারের মতো বিষয়গুলো আর্থিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এসব প্রভাবের মধ্যে থেকে সচেতন থাকতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য, গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য সব সময় নিজের ইচ্ছা, মূল্যবোধ ও সতর্ক মনোভাবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা দ্বারা ভালো রেটিংপ্রাপ্ত শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন আমাদের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে আনতে পারে।

মো. রাশেদ আকতার: হেড অব রিটেইল ডিস্ট্রিবিউশন ডিভিশন অ্যান্ড চিফ ব্যাংকান্স্যুরেন্স অফিসার, মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসি

আরও