বিশ্বব্যাপী অ-নবায়নযোগ্য খনিজ জ্বালানির সংকট ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে টেকসই বিকল্পের সন্ধান ও বৃহত্তর পরিসরে নবায়নযোগ্য সম্পদ ব্যবহারের প্রসঙ্গটিও বিশ্বনেতাদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে। এ আলোচনার অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হলো বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) ব্যবহার বৃদ্ধি করা। জ্বালানি সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি ইভির বাজার সম্প্রসারণ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতের নানা সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ইভির মতো একটি সুবৃহৎ শিল্প খাতে ইভি ম্যানুফ্যাকচারিং, অ্যাসেম্বলি, পেইন্ট ও সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে হাজার হাজার মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হবে। ব্যাটারি ও স্পেয়ার পার্টস নির্মাণ ও বিক্রয় এবং গ্রাহকসেবা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকেই উপার্জনের সুযোগ পাবেন। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোয় শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ইভি ব্র্যান্ড এরই মধ্যে নিজস্ব প্লান্ট স্থাপন করেছে, যার ফলে একদিকে যেমন এ ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোয় আগামীর যানবাহনের ধারণা ও প্রস্তুতি তৈরি হচ্ছে, পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, রিসাইক্লিং ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন কাজে তারা স্থানীয়ভাবে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারছে। ইতিবাচক বিনিয়োগ নীতি ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশও এ ধারায় যুক্ত হয়ে বিশ্বের বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্র্যান্ডগুলোর জন্য সম্ভাবনাময় বাজারে রূপ নিতে পারে।
আমাদের দেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর। বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে তেল আমদানি করতে হয়। কাস্টম হাউজের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ৪৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৮২ দশমিক ৬৬ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। যুদ্ধসহ ভূরাজনৈতিক কারণে বিগত বছরগুলোয় জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারের ভারসাম্য ব্যাহত হওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বৈদ্যুতিক বাহনকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্প খাত গড়ে তোলার মাধ্যমে আগামী দশকগুলোয় আমরা বিপুল অংকের রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন করতে পারি, অন্যদিকে আমদানি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার ঝুঁকিও কমিয়ে আনতে পারি।
বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্রেতার জন্য গাড়ি এখনো বিলাসী পণ্য। তবে বৈদ্যুতিক গাড়িতে যাতায়াত খরচ পেট্রল বা ডিজেলচালিত গাড়ির তুলনায় সাধারণত কম। তাই দীর্ঘমেয়াদে ইভি ব্যবহার যেমন ব্যয় সাশ্রয়ী তেমনি বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতার জন্য ইতিবাচক সমাধান। তাছাড়া সাধারণ গাড়ির ইঞ্জিনের তুলনায় ইভির ইঞ্জিনে মুভিং পার্টস কম হওয়ায় ক্ষয় হয় কম। এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমে যায়। ইঞ্জিন অয়েলের ঝামেলা থেকে মুক্তি ও দীর্ঘস্থায়ী ব্রেক ওয়্যারসহ বিভিন্ন সুবিধা ইভি ব্যবহারের খরচ আরো কমিয়ে আনে। তাই সাধারণের ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাইড-শেয়ারিং প্লাটফর্ম ও রেন্ট-এ-কারের মতো বাণিজ্যিক পরিসরে ব্যবহারের জন্যও ইভি লাভজনক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইভি ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগ ও গাড়ি বিক্রয় শুরু করলে একই সঙ্গে আরেকটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা খাত গড়ে উঠবে, যার মূলে থাকবে চার্জিং স্টেশন। যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে ইভি ব্যবহারকারীদের গাড়ি চার্জ দেয়া কিংবা ব্যাটারি পরিবর্তনসহ নানা প্রয়োজন মেটাতে দেশজুড়ে বিশাল ইভি সাপোর্ট অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। চার্জিং ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন সম্ভব হবে; তাছাড়া প্রতিটি স্টেশনে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থানও গড়ে উঠবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির আরেকটি পরোক্ষ সুবিধা হলো বায়ুদূষণ-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনা, যা জনস্বাস্থ্যে ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখবে। পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির কালো ধোঁয়া থেকে নিঃসৃত উচ্চমাত্রার পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম ২.৫) বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগ ও ফুসফুসের রোগের অন্যতম কারণ। ইভির ব্যবহার এসব রোগের ঝুঁকি কমায়। বায়ুদূষণ রোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রতি বছর উচ্চ বাজেটের প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। ইভি ব্যবহারের প্রসার দেশে এ ধরনের প্রকল্প ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তাও কমিয়ে আনবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট ইভি বিক্রি হয়েছে, যা মোট গাড়ি বিক্রির ১৮ শতাংশ। চীনে পেট্রলচালিত গাড়ির ওপর ভর্তুকি বৃদ্ধি, ইউরোপে নতুন কার্বন নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণসহ নানা কারণ বিবেচনায় নিয়ে বাজার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে ইভি বিক্রির ঊর্ধ্বমুখী ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই এটি দুই কোটি ইউনিট ছাড়িয়ে যাবে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত প্রভৃতি দেশ বিদ্যুচ্চালিত গাড়িকে লাভজনক শিল্প আকারে প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কৌশল নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এখনই কাজ শুরু করতে হবে।
২০২৯ সাল নাগাদ বিশ্বে ১ হাজার ৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইভির বাজার তৈরি হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে জার্মান ডাটা অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা। এ বিস্তৃতি মানচিত্রের বিভেদ অতিক্রম করে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলকে প্রভাবিত করবে, যাতে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু সংরক্ষণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, কেননা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ৭৫ থেকে ৯৫ শতাংশ সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ি বিদ্যুচ্চালিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ মহৎ প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে বাংলাদেশও বিশ্ব মানচিত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এরই মধ্যে বৈশ্বিকভাবে শীর্ষস্থানীয় ইভি ব্র্যান্ড বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণ আরম্ভ করেছে। দেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়বে এবং আগামীর সমৃদ্ধ অর্থনীতি নিশ্চিতে এ শিল্প খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন হবে, এটিই প্রত্যাশা।
নকিবুল ইসলাম খান: অফলাইন মার্কেটিং এবং ক্যাটাগরি ডেভেলপমেন্টের প্রধান, বিওয়াইডি বাংলাদেশ