পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় দেশের রাজনীতির ক্রান্তিকালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি এক ধরনের উন্নয়ন দর্শনের সূচনা করেন। এ দর্শনের মূলে ছিল তিনটি স্তম্ভ—নদী, উপকূল এবং মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রাণশক্তি লুকিয়ে আছে এর নদ-নদী আর বিশাল জনসমষ্টির মধ্যে। নদীকে শাসন না করে নদীসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে মানুষের ভাগ্যবদল করা যায়, সেটিই তার রাজনীতির মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে। পলিগঠিত ব-দ্বীপটিতে দেশের কৃষি, যোগাযোগ এবং সংস্কৃতি সবই আবর্তিত হয় নদীকে কেন্দ্র করে। এটি জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন বলেই তার উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদীসম্পদকে ব্যবহারের বিষয়টিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান তার শাসনকালে নদী ও খাল খনন নিয়ে সমন্বিত এক কর্মসূচির সূচনা করেন। বিভিন্ন সভা সেমিনার ও জনসভায় তিনি একাধিকবার বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নদীকে সজীব রাখতে হবে। এ ভাবনার সবচেয়ে উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ ছিল দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি। তিনি চেয়েছিলেন দেশজুড়ে অসংখ্য খাল খননের মাধ্যমে বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি খাল ও জলাশয়ে ধরে রাখতে, যাতে শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাব না হয়। আধুনিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তার এ উদ্যোগ আজও বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক প্রশংসিত ও আলোচিত বিষয়। নদী ও খাল সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে কৃষিতে বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল তার। পলিসমৃদ্ধ নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ ও উদ্ধার করলে সেচের সুবিধা যেমন বাড়বে তেমনি মাছ চাষেও সুবিধা হবে। বাড়তি সুবিধা হিসেবে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাও সুলভ হবে। কেবল বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন যে সম্ভব নয়, সে ভাবনা তার ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, জনসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার সম্ভব। এজন্যই কৃষি বিপ্লব ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য জিয়াউর রহমানের সরকার নানা পরিকল্পনা নেয়। শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ১ হাজার ২০০ মাইল খাল খনন করা হয়। এছাড়া কৃষকদের মধ্যে উন্নত মানের বীজ, সার এবং কীটনাশক বিতরণের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রান্তিক কৃষকরা যাতে মহাজনদের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি ব্যাংকিং সুবিধা পায়, সেজন্য বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচি চালু করা হয়। নদী ও খাল সংস্কারকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে সমাজ গঠনের কাজে আপামর মানুষের অংশগ্রহণের মানসিকতা এভাবেই গড়ে ওঠে। মানুষকে উৎসাহ দিতে তিনি নিজে কোদাল হাতে নেমে পড়েছিলেন।
সত্তরের দশকের শেষভাগে জিয়াউর রহমান পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দূরদর্শী কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী। দেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মোকাবেলায় কতটা অসহায়, ১৯৭০ সালের প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড় দেখে তা তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। এজন্যই দুর্যোগ মোকাবেলায় তিনি উপকূলীয় বনায়নের সূচনা করেন। ম্যানগ্রোভ বন বা প্যারাবন তৈরির মাধ্যমে তিনি এক বিশাল ‘সবুজ প্রাচীর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযানকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব প্রদান করেন। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুপ্রক্রিয়া রোধেও জিয়াউর রহমানের তৎকালীন সরকার উদ্যোগী হয়েছিল। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে বনায়ন ও কৃষি প্রসারের ওপর জোর দেয়া হয়।
নদী নিয়ে জিয়াউর রহমানের দর্শন কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের নদীগুলোর অস্তিত্ব নির্ভর করে আন্তর্জাতিক প্রবাহের ওপর। সেজন্যই ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধেও বিশ্ব জনমত গঠনে জিয়াউর রহমান সক্রিয় হন। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে তিনি আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সংকট আরো ঘনীভূত হয়। ১৯৭৫ সালের পর জিয়াউর রহমান অনুভব করেন যে কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে বসে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এ আঞ্চলিক সমস্যাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। ১৯৭৬ সালে কলম্বোয় অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে এবং পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জিয়াউর রহমান তুলে ধরেন বাংলাদেশে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব। এ কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের পানির অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। ঘরোয়া রাজনীতিতে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা লং মার্চের প্রতি জিয়াউর রহমানের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ। বলা হয়, জিয়াউর রহমান সরকারের আন্তর্জাতিক চাপের মুখেই ভারত আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হয়। এর ফলে ১৯৭৭ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিতে একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা নিশ্চয়তা অনুচ্ছেদ ছিল, যা নিশ্চিত করেছিল যে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি অবশ্যই পাবে। এটি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল বিজয়।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল আঞ্চলিক সহযোগিতা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভৌগোলিক সান্নিধ্য, অভিন্ন নদ-নদী এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় আঞ্চলিক সংহতি অপরিহার্য। জিয়াউর রহমান মনে করতেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যদি একটি সাধারণ প্লাটফর্ম থাকে, তবে তারা পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবেলায় একে অন্যের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও সম্পদের বিনিময় করতে পারবে। এ উপলব্ধি থেকেই তিনি সার্ক গঠনের প্রস্তাব দেন। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে যে প্রস্তাব পাঠান, তার মূলে ছিল তিনটি লক্ষ্য। প্রথম লক্ষ্য হলো—অভিন্ন নদীগুলোর অববাহিকাভিত্তিক সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, যাতে কোনো দেশ এককভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দ্বিতীয়টি হলো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় একটি সম্মিলিত পূর্বাভাস ও উদ্ধারকারী ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সর্বশেষটি, আঞ্চলিক পর্যায়ে বনাঞ্চল রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি অভিন্ন নীতি নির্ধারণ করা। এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন সাত দেশের সহযোগিতা সংস্থা সার্ক এমন একটি পরিবেশগত নিরাপত্তাবলয় তৈরি করুক, যেখানে একে অন্যের অভিজ্ঞতার আলোকে মরুকরণ রোধ, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করা সম্ভব হবে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্যসম্পদ আহরণ এবং খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমুদ্রের তলদেশে থাকা গ্যাস ও খনিজ সম্পদ বাংলাদেশের শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে। এ চিন্তা থেকেই তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন, যাতে প্রযুক্তিগত সহায়তায় সমুদ্রসম্পদের সঠিক মূল্যায়ন ও ব্যবহার সম্ভব হয়। এছাড়া সমুদ্রসীমা রক্ষায়ও জিয়াউর রহমান সরকার সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের নদী ও উপকূলকেন্দ্রিক উন্নয়ন চিন্তা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। টেকসই উন্নয়নের যে স্বপ্ন আজ বিশ্ব দেখছে, তার অনেক কিছুই জিয়াউর রহমান বহু বছর আগে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জিয়াউর রহমানের সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো পেরিয়ে যায়নি। নানা রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গণতন্ত্রের পথে ফেরা নতুন বাংলাদেশের নতুন সরকার নিশ্চয়ই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নদী, উপকূল ও মানুষকেন্দ্রিক দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ বিষয়ে কাজ করবে—এমনটিই প্রত্যাশিত।
মুহাম্মদ মনির হোসেন: নদী গবেষক ও পরিব্রাজক এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন