প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের ছয় মাসও পূর্ণ করেননি, কিন্তু এরই মধ্যে তিনি এবং তার দল যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম হয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে কর্মরত বৈধ কিংবা অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রায়ই সহিংস, মুখোশধারী আইসিই এজেন্টদের মোতায়েন করেছেন। হরেদরে বড় আকারের শুল্ক আরোপ বা তার হুমকি দিচ্ছেন, নির্বিচারে সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করছেন। প্রশাসনে গভীর অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা ব্যবসা ও ভোক্তা আস্থা নষ্ট করছে।
মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প একটি শক্তিশালী অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, যেখানে শক্তিশালী জিডিপি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছিল এবং মুদ্রাস্ফীতি কমছিল। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকের পূর্বাভাসে, ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ২৫ সালে ২ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ২ দশমিক ৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিতে অব্যাহত হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছিল। তিন মাস পর, এই অনুমানগুলো ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ২ দশমিক ৭ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিতে নেমে এসেছে। বেশির ভাগ পূর্বাভাসদাতা—কনফারেন্স বোর্ড থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পর্যন্ত—একমত যে, মার্কিন অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হবে, যেখানে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে থাকবে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৪ সালের ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে ২০২৫ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হবে।
যদিও ট্রাম্পের প্রতিদিনের নীতি ঘোষণা (প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত) এবং আইনগতভাবে সন্দেহজনক নির্বাহী আদেশগুলো উপেক্ষা করা কঠিন, তবে কম দৃশ্যমান হলেও আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বৈশ্বিক বিশ্বাস ও আস্থার ক্ষতি, যা ইউরোর বিপরীতে ডলারের ১০ শতাংশ পতন এবং সুইস ফ্রাঁর বিপরীতে এর দুর্বলতা দ্বারা প্রমাণিত। এপ্রিলে ঘোষিত সবচেয়ে শাস্তিমূলক "লিবারেশন ডে শুল্ক স্থগিত হওয়ার পর মার্কিন শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধার হলেও ডলার দুর্বল রয়ে গেছে এবং ট্রেজারি ইল্ড উঁচুতে রয়েছে।
আরো খারাপ খবর হলো, যদি ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান সহকর্মীদের ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট"(ওবিবিবিএ) কংগ্রেসে পাস হয়—যা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে ফেডারেল সরকারের ঋণ অন্তত ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে। ১০ ও ৩০ বছর মেয়াদি ফেডারেল ঋণের ওপর উচ্চ সুদের হার এরই মধ্যে বন্ড মার্কেটে এর প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
যখন বেশির ভাগ ভোটার অর্থনীতিকে তাদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন, তখন ট্রাম্পের প্রদর্শনীমূলক নিষ্ঠুর নির্বাসন এবং অভিবাসীদের হয়রানি অতিরিক্ত অর্থনৈতিক খরচ বয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটন এরই মধ্যে কমছে, গত বছরের তুলনায় কানাডিয়ানদের আগমন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। অভিবাসীরা অবকাশ ও আতিথেয়তা খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ কর্মী সরবরাহ করে—যেখানে বেশির ভাগই অবৈধ। শ্রম ঘাটতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কারণে ট্রাম্প সম্প্রতি এ শিল্পগুলোয় অভিবাসন বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দিলেও পরে তার দলের মধ্যে বিরোধিতার মুখে দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করেন।
তবে দেয়ালের লিখন স্পষ্ট। প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতি শ্রমশক্তির বৃদ্ধি এবং এর ফলস্বরূপ অর্থনীতির বৃদ্ধিকে সীমিত করবে; এটি দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা কমাবে এবং উদ্ভাবনকে দুর্বল করবে এবং এটি প্রভাবিত সব শিল্পে খরচ বাড়াবে এবং ব্যবসার লাভজনকতা কমাবে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নির্ভর করে শ্রম সরবরাহ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর, দুটোই নিট-ইতিবাচক অভিবাসনের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং অভিবাসন বিধিনিষেধে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করার মাধ্যমে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে যে ওবিবিবিএতে অন্তর্ভুক্ত এরই মধ্যে উচ্চ ঋণ-থেকে-জিডিপি অনুপাত আরো দ্রুত অসহনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া মৌলিক বিজ্ঞানে ফেডারেল সহায়তায় ব্যাপক কাটছাঁট অর্থনীতির মোট ফ্যাক্টর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে মন্থর করবে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে উদ্ভাবনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ছিল, মূলত গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) সরকারি বিনিয়োগের কারণে। এ বিনিয়োগের রিটার্ন ছিল বিশাল—৩০-১০০ শতাংশ বা তারও বেশি। ডালাস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গবেষণা অনুসারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সব ব্যবসায়িক খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রায় এক-চতুর্থাংশ সরকারি-অর্থায়িত আরঅ্যান্ডডির অবদান।
ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে হাজার হাজার বিজ্ঞানীকে বরখাস্ত করেছে, লাখ লাখ ডলারের বকেয়া বৈজ্ঞানিক অনুদান বাতিল করেছে এবং বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে তহবিল স্থগিত করেছে। কিন্তু এখন ওবিবিবিএ মার্কিন প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখা গবেষণা অবকাঠামোকে ধ্বংস করবে, যেখানে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ, এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন থেকে প্রাপ্ত অনুদানের তহবিল ৪৪-৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমবে।
এই কাটছাঁটগুলো গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মারাত্মক নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনবে, যা অধ্যাপক নিয়োগ, স্নাতক ছাত্রদের প্রশিক্ষণ এবং ল্যাব ও প্রকল্প পরিচালনার ব্যয় মেটাতে কেন্দ্র সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সুদূরপ্রসারী জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রভাবসহ উদ্ভাবনগুলোকে চালিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং যখন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন গ্রহের আরো অংশকে বসবাসের অযোগ্য করার হুমকি দিচ্ছে তখন ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগামী গবেষণার ভিত্তি ধ্বংস করছে।
এতদিন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশী পণ্ডিতদের জন্য একটি পছন্দের গন্তব্য ছিল। যাদের অনেকেই ছাত্র হিসেবে আসেন এবং তারপর গবেষকদের পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে বা কোম্পানি শুরু করতে থেকে যান। এই অভিবাসীদের মার্কিন (এবং বৈশ্বিক) উৎপাদনশীলতায় অবদান ছিল বিশাল। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে তারা মার্কিন উদ্ভাবনের প্রায় ৩৬ শতাংশের জন্য দায়ী। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সব অভিবাসীকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং কঠোর ভিসা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এমনকি তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বিদেশী বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে মার্কিন উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
গত ছয় মাসের আত্মবিধ্বংসী কার্যকলাপ ছিল নজিরবিহীন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এজেন্ডা কেবল মার্কিন অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য স্বল্পমেয়াদি ক্ষতিই করছে না, বরং বিশ্বে আমেরিকার অবস্থান ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও মৌলিকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ‘প্রজেক্ট ২০২৫’-এ বিস্তারিতভাবে তা উঠে এসেছে। ভিন্নমত দমন এবং অভ্যন্তরীণভাবে মার্কিন সেনা মোতায়েন করে ট্রাম্প একজন স্বৈরাচারের কৌশল অনুসরণ করছেন। ক্ষতি অপরিবর্তনীয় হওয়ার আগেই তাকে থামাতে হবে।
সুসংবাদ হলো—আমেরিকান জনগণ এ বিপদ সম্পর্কে সচেতন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। জাতীয় জনমত জরিপগুলোয় ট্রাম্প সামগ্রিক কর্মক্ষমতা এবং অভিবাসন ছাড়া অন্য সব প্রধান ইস্যুতে পিছিয়ে আছেন, যেখানে জরিপের ফলাফল মিশ্র। খারাপ খবর হলো—আমেরিকানদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরোধিতা সত্ত্বেও ওবিবিবিএ সম্ভবত পাস হয়ে যাবে।
এ ভয়াবহ আইন গরিবদের আরো গরিব ও ধনীদের আরো ধনী করবে। প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্য বীমা বঞ্চিত করবে, ৩২ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১০ লাখ শিশুকে খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত করবে এবং ফেডারেল ঋণে ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করবে। সরকারি সিকিউরিটিজের ঝুঁকি প্রিমিয়াম এবং সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যেমন আমেরিকান ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্য সুদের হার বাড়বে। একটি ভালো অর্থনীতি ট্রাম্প খারাপে পরিণত করেছেন, তা আরো খারাপ হতে চলেছে।
[স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
লরা টাইসন: ক্লিনটন প্রশাসনে প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কাউন্সিলের প্রাক্তন চেয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের হ্যাস স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক এবং অ্যাঞ্জেলেনো গ্রুপের বোর্ড অব অ্যাডভাইজরসের সদস্য।
লেনি মেন্ডোনকা: ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানির সিনিয়র পার্টনার ইমেরিটাস। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের সাবেক মুখ্য অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক উপদেষ্টা এবং ক্যালিফোর্নিয়া হাই-স্পিড রেল অথরিটির চেয়ার।