কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতায় ইথিওপিয়ার অবনতির বিষয়টি উল্লেখ করে গত ১০ মার্চ ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি’স দেশটিকে ডাউনগ্রেড করেছে। যদিও ইথিওপিয়ায় ট্রিগ্রেরি অঞ্চলের সহিংসতা কিংবা নিপীড়নের ঘটনাগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠেনি। বরং মুডি’স এর কারণ হিসেবে বলছে, ঋণ সংস্থানের জন্য জি২০ সাধারণ ফ্রেমওয়ার্কের অংশ হিসেবে ঋণ পরিষেবা স্থগিতকরণ উদ্যোগের বাইরে ব্যক্তি ঋণদাতাদের সঙ্গে ইথিওপিয়ার সরকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা এক ধরনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে, যা ঋণদাতাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, মহামারী চলাকালীন নিম্ন আয়ের দেশগুলো যখন তাত্ক্ষণিক ত্রাণ সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ করছে, তখন তাদের দায়বদ্ধতা হ্রাস করার জন্য কিংবা ঋণের বোঝা কমানোর জন্য ঋণ পরিষেবা স্থগিতকরণ উদ্যোগ (ডিএসএসআই) ডিজাইন করা হয়। অনেক দেশের জন্য যা তাদের ঋণের বোঝা কমানোর সর্বোত্তম সুযোগ প্রদান করে। তবে বর্তমানে রেটিং ডাউনগ্রেডের হুমকি ছায়া ফেলছে দেশগুলোর সম্ভাবনার ওপর।
বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থায়নে একটি পদ্ধতিগত সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে, যা অতিরঞ্জিত এবং অনুপযুক্ত কয়েকটি বেসরকারি ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির শক্তি দ্বারা পরিচালিত। এ ধরনের এজেন্সির সংখ্যা মাত্র তিনটি—মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস ও ফিচ রেটিংস—যারা ৯৪ শতাংশেরও বেশি বকেয়া ক্রেডিট রেটিংকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্রস শেয়ারহোল্ডিং রয়েছে।
এসব অলিগোপলিক সংস্থাগুলো মূলত বাজারের নির্মাতা ও চালক, তারা আর্থিক পোর্টফোলিও বরাদ্দকরণ, ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ের মূল্য নির্ধারণ এবং মূলধন খরচকে প্রভাবিত করে। এ সংস্থাগুলোর কর্তৃত্বকে জোরদার করতে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আবার তাদের অফিশিয়াল স্ট্যাটিস্টিক্যাল রেটিং সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক অনেক বিনিয়োগকারীকে আইন অনুযায়ী তাদের পোর্টফোলিওগুলোয় প্রয়োজনীয় ‘বিনিয়োগ গ্রেড’ সম্পত্তি রাখার জন্য অবশ্যই রেটিং এজেন্সিগুলোর রায়কে অনুসরণ করতে হবে।
২০০১ সালে এনরন কেলেঙ্কারি চলাকালীন রেটিং এজেন্সি-সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো প্রথম সামনে আসে। এনরন মূলত এনার্জি ট্রেডিং কোম্পানি, যারা বিনিয়োগকারী, পাওনাদার ও নিয়ন্ত্রকদের বিভ্রান্ত করার জন্য অ্যাকাউন্টিং কৌশল এবং জটিল আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করে আসছিল। এভাবে রেটিং এজেন্সিগুলোকেও বোকা বানানো হয়েছিল: ভেঙে যাওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগে এজেন্সি তিনটিই (মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস ও ফিচ রেটিংস) এনরনের বিনিয়োগ গ্রেড রেটিং ইস্যু করে।
ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবপ্রাইম-মর্টগেজ বুদ্বুদকে সক্রিয় করার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগটি ছিল এটি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের নেপথ্যে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এবং রেটিং ডাউনগ্রেডের মাধ্যমে দ্রুত বিপর্যয় ঘটিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। তারা এমনভাবে রেটিং সমন্বয়ের জন্য পরিচিত ছিল, যা আদর্শিক অবস্থান গ্রহণকে প্রতিফলিত করে, যেমন আর্থিক কৃচ্ছ্রের প্রতিশ্রুতি।
জাতিসংঘের বিদেশী ঋণ ও মানবাধিকার সম্পর্কিত স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ইউফেন লি তার নতুন একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, রেটিং এজেন্সিগুলোকে তাদের ভুল ও ক্ষতিকারক আচরণের জন্য কোথাও কোনো জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয় না। তাদের রেটিংকে আইনিভাবে স্রেফ ‘মতামত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা বাক্-স্বাধীনতা আইনের (ফ্রি স্পিচ ল) আওতায় সুরক্ষিত রয়েছে এবং তারা কখনই তাদের রেটিং পদ্ধতিগুলো প্রকাশ করে না। সংক্ষেপে রেটিং এজেন্সিগুলো যে ধরনের ব্যাপক ক্ষমতা চর্চা করে, এজন্য তাদেরকে কোথাও কোনো ধরনের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না।
তাছাড়া ইউফেন লি প্রচলিত সুদ দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করেছেন। রেটিং এজেন্সি মূলত বেসরকারি ব্যবসা। যে কোম্পানিগুলোকে তারা রেটিং করে, মূলত তারাই এদের অর্থায়ন করে। তারা ওই বাজারগুলোরই খেলোয়াড়, যা তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মূল্যায়ন করে। এর মানে তারা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবসময় নিজ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। উদাহরণস্বরূপ, রেটিং এজেন্সিগুলো আর্থিক পণ্য সৃষ্টির কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরবর্তী সময়ে সে পণ্যের রেটিংয়ের দায়িত্বটাও তারাই পালন করে। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধক সমর্থিত সিকিউরিটিজও—রেটিংয়ে সর্বোচ্চ নম্বর দেয়ার কারণে, যা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পালে হাওয়া জুগিয়েছিল।
এমনকি এখনো নিয়ন্ত্রকরা যখন আর্থিক বাজারের অধিকাংশ খেলোয়াড়দের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সীমাবদ্ধ করার জন্য কাজ করছে, তখনো মনে হয় যেন খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রকদের পদক্ষেপ না গ্রহণের কারণ মূলত ওই তিন কোম্পানির তদবির করার শক্তিকে প্রতিফলিত করে, যা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে আর করোনাভাইরাস মহামারী বিষয়টিকে আরো বেশি তীব্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউফেন লি তার প্রতিবেদনে রেটিং নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয়টি তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক বাজারের পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে, বিশেষ করে কভিড-১৯ সংকটে যেসব দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া রেটিং ডাউনগ্রেডের হুমকি অনেক দেশের সরকারগুলোকে মহামারী পুনরুদ্ধারে পর্যাপ্ত আর্থিক ব্যয়ে অনুৎসাহিত করছে। আর এখন মুডি’সের সর্বশেষ পদক্ষেপ অনুসারে উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলো ঋণের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে বহুপক্ষীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেসরকারি ঋণদাতাদের সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠনবিষয়ক আলোচনায় যেতে অবশ্যই ভয় পাচ্ছে।
জি২০ তালিকাভুক্ত দেশগুলো যদি সত্যিকার অর্থে কভিড-১৯ সংকটকালে উন্নয়নশীল দেশের ঋণ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে চায়, তাহলে তারা সাময়িকভাবে ক্রেডিট রেটিংকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে তা শুরু করতে পারেন। মাঝারি মেয়াদে রেটিং এজেন্সিগুলো তাদের অভীষ্ট বাজারগুলোয় স্থিতিশীল ভূমিকা পালন করছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রকদের অবশ্যই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্বার্থের সংঘাত মোকাবেলা করতে হবে। যেমন এজেন্সি কর্তৃক যেসব কোম্পানির ক্রেডিট রেটিং নির্ণয় করা হয়, ওই কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে এজেন্সির আর্থিক নির্ভরতা কমানো। আর এ কাজটি করা কিন্তু খুব জরুরি।
তবে বেসরকারি রেটিং এজেন্সিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই কিন্তু যথেষ্ট নয়। বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘের সম্মেলনে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দেখিয়েছে যে কোম্পানি ও সার্বভৌম ঋণ পরিশোধের যোগ্যতাবিষয়ক উদ্দেশ্যমূলক মূল্যায়নের জন্য বিশ্বের একটি স্বাধীন পাবলিক রেটিং এজেন্সির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ-জাতীয় সংস্থাটি আর্থিক খাতে নতুন নতুন বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যবহূত পদ্ধতিগুলোর মূল্যায়ন করার জন্যও জরুরি, আগামী বছরগুলোয় যার উচ্চ চাহিদা হবে।
ক্রেডিট রেটিং বিশেষ করে সার্বভৌম ঋণের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক সংস্থা থাকা জরুরি, তার সুযোগও রয়েছে। সম্ভবত এটি করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বেহিসাবি বেসরকারি এজেন্সিগুলোকে প্রয়োজনীয় সমতা প্রতিষ্ঠার তাড়া দেবে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বিগ থ্রি খ্যাত উক্তি তিন প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধ করে আসছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
জয়তী ঘোষ: নির্বাহী
সম্পাদক, ইন্টারন্যাশনাল
ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস
অ্যাসোসিয়েটস;
অধ্যাপক,
ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট
ইউনিভার্সিটি।
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস