বাংলাদেশ বর্তমানে ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ এবং দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিভিন্ন অভিঘাতের মুখোমুখি। ঢাকায় নতুন প্রশাসন সুশাসন, বেসরকারি খাতের বিকাশ, ডিজিটাল রূপান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বাংলাদেশ।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজস্ব রাজস্বের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বলতে নিজস্ব আর্থিক সম্পদ—প্রধানত কর—সংগ্রহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগের অর্থায়নকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়নের অন্যান্য খাতে ব্যয়। বড় বিনিয়োগ বা সংকট মোকাবেলায় বৈদেশিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্ভরযোগ্য কর রাজস্ব একটি দেশকে নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ, উন্নয়ন লক্ষ্যে বিনিয়োগ এবং পরিবর্তনশীল বহিঃঝুঁকির প্রভাব প্রশমিত করার অধিক স্বাধীনতা দেয়।
বাংলাদেশে কর আদায়ের পরিমাণ এখনো কম। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল কর রাজস্ব, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। রাজস্বের স্বল্পতা উন্নয়ন ও জনসেবায় ব্যয় সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত করে। একই সময়ে সরকারি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের ব্যয়। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের ব্যয়—২০২১-২৫ অর্থবছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিনিয়োগের জন্য সরকারের হাতে অর্থের অবকাশ কমে এসেছে।
রাজস্ব আহরণ কম হওয়া এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার এ পরিস্থিতি কর আদায়ের সক্ষমতা জোরদারের জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। সরকার ২০৩৫ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের উন্নয়ন এবং করদাতা ও সরকারের মধ্যে আস্থা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মূল সমস্যা করহার কম থাকা নয়, বরং প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত করপোরেট আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের (মূসক) সাধারণ হার তুলনীয় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমস্যাটি মূলত কর-ব্যয়ের ব্যাপক প্রয়োগ। কর-ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে কর অব্যাহতি, হ্রাসকৃত করহার, কর কর্তন এবং করের দায় কমানোর অন্যান্য সুবিধা। কার্যত এসব সুবিধা কর ব্যবস্থার মাধ্যমে দেয়া এক ধরনের সরকারি ভর্তুকি, যা সরাসরি বাজেট থেকে অর্থ দেয়ার পরিবর্তে কর আদায় না করার মধ্য দিয়ে প্রদান করা হয়।
বিনিয়োগ আকর্ষণ, নির্দিষ্ট শিল্প খাতকে সহায়তা কিংবা বিশেষ কিছু জনগোষ্ঠীর সুবিধার জন্য এসব ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। কিন্তু এর ফলে সরকারি রাজস্ব কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব সুবিধার ব্যয় থেকে প্রাপ্ত সুফলও কম হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ অর্থবছরে আয়কর-সংক্রান্ত কর-ব্যয়ের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২১ অর্থবছরে তা কমে ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২২ অর্থবছরে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ২০২২ সালে মূসক-সংক্রান্ত কর-ব্যয়ের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এসব সুবিধার কারণে আদায় না হওয়া রাজস্বের সম্মিলিত পরিমাণ বাংলাদেশের সামগ্রিক কর-জিডিপি অনুপাতের প্রায় সমান।
উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় বাংলাদেশ অকার্যকর কর ব্যয় পর্যালোচনা ও কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সালে এনবিআর কর ব্যবস্থার মাধ্যমে দেয়া এসব সুবিধার তদারকি জোরদার, অতিরিক্ত প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ এবং শুধু এনবিআরের বিবেচনাধীন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ ধরনের সুবিধা প্রদান বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি কর ব্যয় নীতিকাঠামো গ্রহণ করে। এ কাঠামো অনুযায়ী, কর ব্যয়-সংক্রান্ত সুবিধা প্রদানের জন্য সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন।
এ সংস্কার রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে নীতিকাঠামোর ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং অযৌক্তিক কর ব্যয় নিয়মিত মূল্যায়ন ও হ্রাস করার ওপর। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর পরিপালন উন্নত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকরভাবে করের আওতা বাড়াতে পারলে আমাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-৩০ অর্থবছরের মধ্যে কর রাজস্বের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো সম্ভব।
করনীতি, কর প্রশাসন ও সুশাসনের উন্নয়ন একসঙ্গেই ঘটাতে হবে। কর কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে করনীতির সংস্কার থেকে খুব বেশি সুফল পাওয়া যাবে না।
এনবিআরের কার্যক্রমে বিভাজন এবং পৃথক বিভাগগুলোর বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংস্থাটির বিভিন্ন উইং প্রায়ই আলাদাভাবে কাজ করে। তাদের তথ্য ব্যবস্থা খণ্ডিত, করদাতা শনাক্তকরণে একাধিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ের সুযোগ সীমিত। এতে কার্যকারিতা কমে যায় এবং করদাতাদের কর্মকাণ্ড ও কর পরিপালন সম্পর্কে সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা এনবিআরের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
কিছু অগ্রগতি হলেও আয়কর প্রশাসন এখনো অনেকাংশে হাতে-কলমে পরিচালিত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও বাস্তবসম্মত পরিচালন কাঠামোর ভিত্তিতে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং তথ্য বিশ্লেষণে কর্মীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ডিজিটাল রূপান্তর তথ্যের কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে পারে। এর মাধ্যমে কর পরিপালন-সংক্রান্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করা সম্ভব হবে, বিশেষত উচ্চ ঝুঁকির করদাতাদের ক্ষেত্রে।
কর প্রশাসনের সংস্কারে করদাতাদের উন্নত সেবাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। এনবিআরের ভেতরে এবং সামগ্রিক সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো গেলে করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাস দৃঢ় হবে।
দীর্ঘমেয়াদে কর রাজস্বের টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে স্বেচ্ছায় কর পরিপালনের ওপর। কর প্রশাসন ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও সেবামুখী হলে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কর পরিশোধে অধিক আগ্রহী হয়। করনীতি, প্রশাসন ও সুশাসনের সমন্বিত উন্নয়ন বাংলাদেশের নিজস্ব রাজস্ব আহরণ এবং সেই রাজস্ব দিয়ে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
সমীর খাতিওয়াদা: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রিন্সিপাল পাবলিক ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট
ইউহেই চিবা: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট (ট্যাক্স)