বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া অত্যন্ত জরুরি। যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে পারে, আনন্দ ও নতুন মোটিভিশনের মাধ্যমে নতুন বর্ষের শ্রেণী কার্যক্রম শুরু করতে পারে। কিন্তু সেই ২০১০ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে হঠাৎ করে বিনামূল্যে বই বিতরণের এক চমক (?) সৃষ্টি করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার। অনেকেই এটিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। আমি প্রথম থেকেই বলে এসেছি যে এটি শিক্ষা সংকোচনের একটি নীতি এবং শিক্ষাকে অন্যভাবে আরো বাণিজ্যিকীকরণের আর একটি উপায়, যার মাধ্যমে সরকারসংশ্লিষ্টরা আপাত ভালো দৃষ্টান্তের মাধ্যমে নতুনভাবে লাভবান হওয়ার ও অর্থ চুরির আর একটি পন্থা বের করছেন। প্রতি বছর তা প্রমাণও হয় কিন্তু পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না। এখন তো কেউ সহজে পরিবর্তনও করতে পারবে না, কারণ সস্তা পাবলিক সেন্টিমেন্টের ভয়! অনেকেই বলবেন, বিনামূল্যের বই বাদ দিয়ে শিক্ষার গলায় কাঁটা বাঁধানোর চিন্তা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এ বই বিতরণের প্রথম বছর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কোনো বছরই বছর শুরুর তিন-চার মাসের মধ্যেও সব বই হাতে পায়নি। ম্যানেজ করা কিছু মিডিয়া মহোৎসাহে পূর্ববর্তী সরকারের গুণগান ও সাফল্যকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর জন্য বহুভাবে তা উপস্থাপন করে আসছে। কিন্তু গ্রামের, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কখনো বই ঠিকমতো পৌঁছে না। পৌঁছানোর কথাও নয়, কারণ এনসিটিবির সেই সক্ষমতা ও মেকানিজম কোনোটিই নেই। এটি তাদের মূল কাজও নয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সব ছিল ওলট-পালট। সেই অবস্থায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাবিহীন সরকার ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সব হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্যে কীভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছবে সেটি ছিল আমাদের মহাচিন্তার বিষয়। বই আসলেই পৌঁছতে পারেনি, পারার কথাও নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছতে তিন মাসের বেশি বিলম্ব হয়েছিল, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেমন ব্যাহত করেছে, তেমনি সরকারকেও বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। মানুষ তো সমালোচনা করতে যত ওস্তাদ তার এক-দশমাংশ পরিমাণও প্রকৃত সহায়তা করতে পারদর্শী নয়। শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন ব্যাহত হয়েছে মারাত্মকভাবে। অনেকে পিডিএফ বই প্রিন্ট করে, কেউবা আবার পিডিএফ কপি প্রিন্ট করা বই বাজার থেকে চড়াদামে ক্রয় করেছেন। যাদের কোনোটিরই সামর্থ্য ও সুযোগ ছিল না তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে মারাত্মকভাবে। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্র বাতিল, পুনঃদরপত্র আহ্বান ও সমন্বয়ের অভাব এর আপাত কারণ। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে রাজনৈতিক অস্থিরতা সেভাবে না থাকলেও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতাই এবার বই মুদ্রণ বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। আমি গত বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখেছি, ওই বছরের প্রথম চার-পাঁচ মাসেও সব বই প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা হাতে পায়নি। বই হাতে পাওয়া এবং এ নিয়ে বহু উচ্ছ্বাস, আনন্দ আর শতগুণ বাড়িয়ে বলা এসব ঘটনা শুধু মিডিয়ায়, বাস্তব সব সময়ই উল্টো। আওয়ামী সরকার আবিষ্কৃত এ তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো শিক্ষা ও শিক্ষাপণ্যকেও মারাত্মকভাবে রেশনিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসার কৌশল অনেকেই সেভাবে বুঝতে পারেননি। সবাই ভেবেছেন, এটি মঙ্গলজনক কিন্তু আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করি এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়াই ও খোঁজখবর রাখি তারা এর প্রকৃত চেহারা দেখতে পাই। এ রেশনিং প্রথায় বই দেয়ায় লাভবান হন হর্তাকর্তারা, যারা কোনো না কোনোভাবে পূর্ববর্তী সরকারেরই লোক। শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের শিক্ষা সংকোচন ছাড়া আর কিছুই হয় না এতে। কারণ বই তো ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে। মানহীন এ বই অনেক শিক্ষার্থী ছয় মাসের মধ্যে ছিঁড়ে ফেলে কিংবা হারিয়ে ফেলে, ফলে তারা থাকে বইহীন এবং তখন গাইড বইয়ের ওপর তাদের নির্ভরতা আরো বেড়ে যায়।
আমরা জানি, নভেম্বর-ডিসেম্বরে মুদ্রণকারীরা সাধারণত গাইড বই ছাপার কাজে ব্যস্ত থাকেন। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে পোস্টার, লিফলেট ছাপানোর কাজও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছতে যে বিলম্ব হবে, সেটি সহজেই অনুমেয় ছিল। সেই করোনা থেকে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি চলে এসেছে, যার ক্ষতিপূরণ হতে আরো বেশ সময় লেগে যাবে। তার ওপর প্রতি বছরই শিক্ষার্থীরা কয়েক মাস পর বই হাতে পান। ফলে শিখন গ্যাপ বৃহৎ থেকে বৃহত্তরই হচ্ছে। এসব কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তাই উচ্চপর্যায়ে প্রখর মেধাসম্পন্ন শিক্ষার্থী আসছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ে পাসের হার বাড়ানোর প্রতি যতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, ঠিক ততটাই অবজ্ঞা করা হয়েছে শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার ক্ষেত্রে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় যারা উচ্চশিক্ষা অর্জন করছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। এসব বিষয়কে আরো উসকে দিচ্ছে এ রেশনিং পদ্ধতিতে বই বিতরণ, যা বাজারের নোট-গাইডকে তিন গুণ উৎসাহিত করছে। যে কেউ ইচ্ছে করলেই একটি বই দেখতে পারছে না, কারণ বাজারে বই নেই। কোথাও কোথাও আবার পাওয়া যায় চড়া দামে। অনলাইনে একটি বই দেখার জন্য চাপ দেবেন—দেখবেন বিভিন্ন প্রকাশনীর নামে বই বের হচ্ছে। সঠিক বইটি পেতে আপনাকে বহুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, বহুবার বাটন ক্লিক করতে হবে অর্থাৎ ইউজার ফ্রেন্ডলি নয়। বই থাকবে মানুষের হাতে, আপনি ল্যাপটপ নিয়ে কতক্ষণ ঘুরবেন আর সেটি এখনো কত শতাংশ মানুষের নাগালে?
শিক্ষার্থীদের হাতে সঠিক সময়ে নির্ভুল বই তুলে দিতে না পারা আমাদের জাতিগত ও সম্মিলিত ব্যর্থতা! অতীতে ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। প্রায় প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপা হয়ে সেগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে বিতরণের পর ভুলত্রুটি, অস্পষ্টতা ও নানা অসংগতি ধরা পড়লে সরকার পরবর্তী সময়ে ‘সংশোধনী’ দিয়ে মনে করে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এটি এক ধরনের জিইয়ে রাখা অব্যবস্থাপনা! ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩০ কোটি বই ছাপার কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিকের নয় কোটি বই এবং মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির জন্য ২১ কোটি বই। মোট বইয়ের এক-দশমাংশের বেশি কাজ পেয়েছে চারটি প্রেস। অগ্রণী প্রিন্টিং পেস, কর্ণফুলী প্রিন্টিং প্রেস, কচুয়া ও আনোয়ারা প্রিন্টিং প্রেস। এ প্রেসগুলোর মালিক পরস্পর দুই ভাই ও ভগ্নিপতি। তারা ২০০ কোটি টাকার বেশি পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেয়েছেন। বইয়ের সংখ্যা তিন কোটির বেশি। এ চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি সময়ক্ষেপণ করে একেবারে শেষ সময় গত ৪ ডিসেম্বর সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বই ছাপার চুক্তি করে। ফলে এসব বই ছাপা শেষ করতে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত লেগে যাবে। আর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে যেহেতু জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হবে, ফলে প্রেসগুলো মনে করছে এ সময় নিম্নমানের বই সরবরাহ করলে এ নিয়ে কেউ দেখার ও প্রশ্ন তোলার সময় পাবে না। তবে প্রাথমিকের বই নিয়ে কিছুটা স্বস্তি! প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাপে প্রাথমিকের বই ছাপা ও বিতরণের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই ছাপার জন্য প্রথমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল গত মে-জুনে। তবে গত সেপ্টেম্বরে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ দরপত্র বাতিল করা হয়। পরে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ২২ অক্টোবর ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৪২তম সভায় এ তিন শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। এর আগে ১৪ অক্টোবর মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরির নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ক্রয়াদেশ অনুমোদন দেয়া হয়। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর এনসিটিবির ওয়েবসাইটে ষষ্ঠ, নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তকের ১৭টি লটের পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ২৫ নভেম্বর। এরপর চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বই সরবরাহে দুই মাসের অধিক সময় প্রয়োজন হয়। তার মানে হচ্ছে, ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণীর বই মুদ্রণ ডিসেম্বরে সম্পন্ন করা কঠিন। আর নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করা তো নিয়ম হয়েই দাঁড়িয়েছে।
কাগজের জিএসএম কম দিলে তা শিক্ষার্থীদের পক্ষে এক বছর পড়া কষ্টকর হয়। বিশেষ করে ৬০ জিএসএমের কাগজ ছয় মাস পর ছিঁড়ে যায়। অন্যদিকে বইয়ের ব্রাইটনেস কম হলে শিক্ষার্থীদের চোখের ওপর চাপ পড়ে। এতে চোখের নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। আমরা জানি, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ৮০ শতাংশ বই-ই ছিল নিম্নমানের। কিন্তু বই সরবরাহের পর এনসিটিবি তদন্ত শুরু করলেও অজ্ঞাত কারণে তা থেমে যায়। ফলে তারা পার পেয়ে যান। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা না নিলে এ বছরও তারা পার পেয়ে যাবেন। প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির বইয়ে ৮০ জিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস থাকতে হবে। এ বইগুলো সব চার রঙের। অন্যদিকে মাধ্যমিকের বইয়ে ৭০ সিএসএম ও ৮৫ ব্রাইটনেস থাকার কথা। প্রাথমিক অধিদপ্তরের চাপে বইগুলো মোটামুটি মানসম্পন্ন হলেও ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিকের বইয়ে দেয়া হচ্ছে নিম্নমানের কাগজ। এনসিটিবির চাহিদা অনুযায়ী কাগজের বর্তমান বাজারদর প্রতি টন প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস ৯০ হাজার টাকায় কিনেছে। এ কাগজে ৬০ থেকে ৭৯ শতাংশ ভার্জিন পাল্প এবং ৩০-৪০ শতাংশ রিসাইকেলড কাগজ রয়েছে। প্রেস দুটি ইবতেদায়ির জন্য যেসব বই এরই মধ্যে সরবরাহ করেছে সেগুলো ৮০ জিএসএমের বদলে পাওয়া যাচ্ছে ৬৫-৭০ জিএসএম। ব্রাইটনেসও ৮০-এর বেশি উঠছে না। অন্যদিকে মাধ্যমিকের জন্য যেসব বই প্রস্তুত করা হয়েছে, সেগুলোতে ৭০ জিএসএমের পরিবর্তে পাওয়া যাচ্ছে ৬০-৬৩ জিএসএম। এ খেলা প্রতি বছরই চলছে। এনসিটিবি তথা সরকারের নিয়ন্ত্রণে যতদিন এভাবে বই ছাপা হবে, ততদিন এ খেলা চলতে থাকবে। কারণ এনসিটিবি ও সরকারকে প্রেস মালিকরা ম্যানেজ করতে পারেন। কিন্তু নিম্নমানের নিম্ন ব্রাইটনেসের বই যখন বাজার থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কিনতে হবে তখন তারা ভালো বইটিই কিনবেন। অর্থাৎ পাবলিশার্সরা তখন নিজেদের স্বার্থে ভালো মানের কাগজ ও ব্রাইটনেস ও সিএসএম ব্যবহার করবেন, কারণ বিচারক তখন কোটি কোটি ক্রেতা। কাদের তারা খুশি করবেন? এনসিটিবির নিজস্ব প্রেস নেই, কাগজ উৎপাদন বা কেনার ক্ষমতা নেই। সবকিছুই প্রাইভেট থেকে করতে হয়, তাহলে শুধু বই করা আর বিতরণ তারা কেন করবে? তারা তো পারছে না। দেশের কয়েকটি বড় বড় কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলে তাদের মধ্যে ভালো বই করার প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে, মানুষ ভালো বই ও সময়মতো যারা দিতে পারবে তাদের বই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কিনবে। এনসিটিবি শুধু শিক্ষার মান, কারিকুলাম, সিলেবাস ইত্যাদি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে পারবে। কিন্তু তাদের যেন কেন বই ছাপা, কাগজ কেনা, বই বিতরণে খুব আগ্রহ! পরবর্তী সরকারে যারা আসবেন তাদেরকে অনুরোধ করছি, অযথা এ কাজে এনসিটিবিকে ব্যস্ত না রেখে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও যুগোপযোগী কারিকুলাম যাতে এনসিটিবি তৈরি করতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা বহু টাকা দিয়ে নোট ও গাইড বই কেনে, প্রাইভেট পড়ে সেখানে দুইশ-তিনশ টাকার বিনামূল্যের বই তাদের খুব একটা এগিয়ে দেয় না। তার পরও কিছু দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় বই দেয়া যেতে পারে। ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম সবার জন্য এ বিনামূল্যের বই প্রয়োজন নেই।
এনসিটিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান! এটি শুধুই নামে, কামে পুরো উল্টো। চেয়ারম্যান পদটি যেভাবে পূরণ করা হয় তাতে স্বায়ত্তশাসন থাকার কথাও নয়। সর্বদাই মন্ত্রণালয়ের খবরদারির মধ্যে থাকতে হয়। আর খবরদারি হবেই না-বা কেন? তারাই তো নিয়োগ দিচ্ছেন চেয়ারম্যানকে। বিখ্যাত কিংবা অখ্যাত একটি কলেজের শিক্ষক/অধ্যক্ষ সেটি সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমেই হোক আর আত্তীকরণের মাধ্যমেই হোক শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে এত বছর এত বড় গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে আসছেন। তারা মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিতে দিতে প্রতিষ্ঠানটির বারোটা বাজিয়েছেন। শিক্ষার সঙ্গে, শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন সব লোককে নিয়োগ দেয়া হয় আর সেই নিয়োগ হয় পুরোপুরি ধরা-করার মাধ্যমে। অথচ এ প্রতিষ্ঠান থেকেই পুরো জাতির শিক্ষা অর্জনের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। প্রতি বছর এনসিটিবি যেসব সমস্যা ফেস করে তার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে এটিও একটি অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটিকে পুরো স্বায়ত্তশাসন প্রদান না করা। চেয়ারম্যানকে হতে হবে অল ইন অল। তিনি প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক উন্নয়নের জন্য নিজে সব ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সমর্থ হবেন, মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। কাজেই নিয়োগও হতে হবে সেই ধরনের, সার্স কমিটির মাধ্যমে কিংবা এ-জাতীয় কোনো পদ্ধতিতে। জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আমাদের সেটি করা উচিত। তা না হলে শিক্ষার মানেও পরিবর্তন আসবে না আর শিক্ষার্থীরা কখনই ঠিকমতো শিক্ষাসামগ্রী সময়মতো হাতে পাবে না।
মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)