স্পেংলার কর্তৃক খালদুনের উপস্থাপনা
১৯৬৪
সালে যখন
জোসেফ জে
স্পেংলারের লেখা
যুগান্তকারী প্রবন্ধ
Comparative
Studies in Society and History-তে প্রকাশিত
হলো, তখন
অর্থশাস্ত্রের আদিপুরুষের
দাবি নিয়ে
বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত
হলেন চতুর্দশ
শতাব্দীর আরব
অর্থনীতিবিদ ইবনে
খালদুনও (১৩৩২-১৪০৬)।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের
জগতে এর
আগেও খালদুনের
নাম অজানা
ছিল না,
তবে তার
প্রচার ও
প্রসার মুসলমান
ধর্মবেত্তা ও
আরব গবেষকদের
মধ্যেই সীমিত
ছিল এবং
তার প্রধান
পরিচয় ছিল
ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী
ও রাষ্ট্রচিন্তক
হিসেবে। খালদুন
প্রচুর লেখালেখি
করে গেছেন
এবং তার
সবই আরবি
ভাষায়। অন্য
অনেক বিষয়ের
সঙ্গে অর্থনীতিতে
গভীর চিন্তাভাবনা
ও গবেষণার
সুস্পষ্ট প্রমাণ
পাওয়া যায়
তার বিখ্যাত
গ্রন্থ ‘আল্-মুকাদ্দিমা’য়।
আসলে ‘আল্-মুকাদ্দিমা’
খালদুনের লেখা
কোনো স্বতন্ত্র
বই নয়।
এটা তিনি
লিখেছিলেন তার
বিখ্যাত গবেষণা
গ্রন্থ ‘কিতাব
আল-ইবার’-এর
ভূমিকা মনে
করে। এ
ভূমিকাটি বেশ
বিশদ, প্রায়
৪৫০ পৃষ্ঠাব্যাপী
বিস্তৃত। এজন্য
জ্ঞানের জগতে
‘আল্-মুকাদ্দিমা’
একটি পূর্ণাঙ্গ
বই বলেই
বিবেচিত হয়ে
থাকে।
এ নিবন্ধের
জন্য গবেষণা
করতে গিয়ে
দেখা গেছে,
গত ৫০-৬০
বছরে ইবনে
খালদুন এবং
অর্থশাস্ত্রে তার
অনন্য অবদানের
ওপর প্রচুর
লেখালেখি হয়েছে
এবং এখনো
হচ্ছে। লেখকদের
মধ্যে আরব-অনারব
ও পাশ্চাত্য
গবেষকরা তো
আছেন-ই,
তাদের সঙ্গে
বিভিন্ন জাতি
ও ভাষাভাষী
সাংবাদিকও যোগ
দিয়েছেন। প্রকাশনা
যেমন হচ্ছে
একাডেমিক জার্নালে,
তেমনই হচ্ছে
অনলাইন ব্লগে।
এসব ঘাঁটাঘাঁটি
করে সুশৃঙ্খলভাবে
এ মনীষীর
গুরুত্বপূর্ণ ও
তাত্পর্যপূর্ণ কার্যাবলি
গুছিয়ে উপস্থাপন
করার কাজটি
যত সহজ
ভেবেছিলাম বাস্তবে
তেমনটি পাইনি।
খালদুন ‘আল্-মুকাদ্দিমা’য়
অর্থনীতির যেসব
বিষয়ে বিস্তারিত
আলোচনা করেছেন
সেগুলোকে প্রধানত
পাঁচ ভাগে
ভাগ করা
যায় - 1. Specialization and
division of labor, 2.Taxation, Laffer curve and supply side economics, 3.
Demand and supply analysis, 4. Labor theory of value, 5. Public expenditure
& Keynesian economics। এবার
আসুন এসব
বিষয়ের আলোকে
অর্থশাস্ত্রে চতুর্দশ
শতকের অর্থনীতিবিদ
ইবনে খালদুনের
অবদান একটু
খতিয়ে দেখা
যাক।
শ্রম বিভাজন সম্পর্কে খালদুনের বক্তব্য
এ
আলোচনাটি যার
কথা দিয়ে
শুরু করা
যায় তিনি
একজন সাংবাদিক।
তার নাম
অলিভিয়া গোল্ডহিল।
তিনি ‘Quartz.com’
ব্লগের বিজ্ঞান
প্রতিবেদক। ২০১৭
সালের ১৭
জুন তিনি
একটি পোস্টে
লিখেছেন, আজকাল
ছাত্র-ছাত্রীরা
যখন অর্থনীতি
পড়তে যায়
তখন শুরুতেই
তাদের শেখানো
হয়, ‘আধুনিক
অর্থনীতির পিতা
অ্যাডাম স্মিথ’।
এটা পাশ্চাত্য
জগতে একটি
স্বাভাবিক ব্যাপার,
কিন্তু বিষয়টি
তিনি পছন্দ
করেন না।
কেন পছন্দ
করেন না,
সে কথা
বলতে গিয়ে,
গোল্ডহিল সূত্র
ধরিয়ে দিলেন
ড্যানিয়েল ওলাহ্-র।
এভাবে এ
হাঙ্গেরিয়ান অর্থনীতিবিদের
সঙ্গে আমার
প্রথম পরিচয়।
ড্যানিয়েল ওলাহ্
তার দেশের
জাতীয় অর্থনীতি
মন্ত্রণালয়ের একজন
তথ্যবিশ্লেষক ও
পূর্বাভাসকারী। তিনি
সম্প্রতি Review
of Religions.org নামক Blog-এ
একটি লম্বা
সাক্ষাত্কার দিয়েছেন।
সাক্ষাত্কারটি পোস্ট
করা হয়েছে
১৩ এপ্রিল,
২০২১। এখানে
ওলাহ্ বলছেন,
ইবনে খালদুন
উৎপাদন প্রক্রিয়ায়
শ্রম বিভাজন
প্রসঙ্গে যেসব
কথা বলে
গেছেন, আধুনিক
অর্থনীতিবিদরা তার
পুরোটাই প্রায়
ভুলে বসে
আছেন। এর
প্রমাণ অর্থনীতির
ইতিহাসের ওপর
লিখিত প্রধান
প্রধান পাঠ্যবইয়ে
Screpanti
and Zamagni (2005), Roncaglia (2005),
Rothbard (2006), Blaug (1986), etc.) ইবনে
খালদুনের অবদান
তো দূরে
থাক, তার
নামও খুঁজে
পাওয়া যায়
না। এ
কথা বলার
পর তিনি
আসল কথা
তুলেছেন। তিনি
খালদুন থেকে
উদাহরণ দিয়েছেন
এভাবে—
একাধিক মিস্ত্রি
কারুকার্যখচিত কাঠের
দরজা কিংবা
চেয়ার বানানোর
সময় আলাদাভাবে
যার যার
কাজ করেন।
কাজ শেষ
হলে তারা
টুকরো টুকরো
অংশগুলো একত্র
করে যখন
দরজা ও
চেয়ারের পূর্ণ
অবয়ব দেন
তখন বোঝা-ই
যায় না,
জিনিসগুলোর অংশবিশেষ
একাধিক ব্যক্তি
দ্বারা পৃথক
পৃথকভাবে বানানো
হয়েছে। ‘The
Wealth of Nations’-এ
অ্যাডাম স্মিথ
যেমন কারখানায়
শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে
আলপিন উৎপাদনের
বর্ণনা দিয়েছেন,
খালদুন, তার
‘আল্-মুকাদ্দিমা’য়
কাঠের কাজের
উদাহরণে ওই
একই কথা
বলছেন, একই
বিষয় বুঝিয়েছেন।
তফাতটা হলো,
স্মিথ যা
বলছেন ১৭৭৬
সালে, খালদুন
তা বলে
গেছেন তারও
৪০০ বছর
আগে।
একই সাক্ষাত্কারে
ওলাহ্ ঢালাওভাবে
অর্থশাস্ত্রের রথী-মহারথীদের
প্রতি একটি
কঠিন ও
তির্যক মন্তব্য
ছুড়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘খালদুনের
চিন্তাধারা আধুনিক
অর্থনীতিবিদদের কাছে
‘অস্বস্তিকরভাবে
জানা’ একটি
বিষয়!’ এখানে
‘অস্বস্তিকরভাবে
জানা’ শব্দ
দুটি ব্যবহার
করে ওলাহ্
কী বোঝাতে
চাইছেন, পাঠকরা
নিশ্চয়ই ধরতে
পেরেছেন। তিনি
আরো বলছেন,
শ্রম বিভাজনকে
খালদুন সভ্য
সমাজের একটি
শক্তিশালী ভিত্তি
হিসেবে বিবেচনা
করতেন। শুধু
তাই নয়,
মধ্যযুগের এ
আরব মনীষী
শ্রমবিভাজনের অন্তত
তিন-তিনটি
পৃথক পরিপ্রেক্ষিত
সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত
করে গিয়েছেন,
প্রথমটি শিল্প
পর্যায়ে, দ্বিতীয়টি
সামাজিক পর্যায়ে
এবং শেষটি
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।
এ তিন
পর্যায়ের গভীর
ব্যাখ্যা পাওয়া
যায় অতি
সাম্প্রতিককালের Turkish
Journal of Islamic Economics-এ প্রকাশিত
তুর্কি লেখক
ও গবেষক
‘সিটি
রিজকিয়া’ এবং
‘আব্দুল
কাদের শাচি’র
প্রবন্ধে। এ
দুজন খালদুনের
কথা সংক্ষেপে
এভাবে উপস্থাপন
করেছেন। শিল্প
পর্যায়ে একজন
গমচাষীকে যদি
শুরু থেকে
শেষ পর্যন্ত
গম চাষের
প্রতিটি উপাদানসহ
গম ফলাতে
বলা হয়
, তাহলে তিনি
তার নিজের
বাঁচার জন্য
ন্যূনতম পরিমাণ
গম সারা
দিন কাজ
করেও উত্পন্ন
করতে পারেন
না, কিন্তু
শ্রমবিভাজনের মাধ্যমে
একাধিক শ্রমিক
যদি যৌথভাবে
একই কাজ
করেন তাহলে
তাদের প্রত্যেকেই
নিজের জন্য
ন্যূনতম পরিমাণ
কেন তার
চেয়ে অনেক
বেশি উদ্বৃত্ত
ফসল ফলাতে
পারেন। এ
গবেষকদের ভাষায়,
খালদুন মনে
করতেন, এ
রকম সুফল
পেতে হলে
শিল্প পর্যায়ে
কর্মরত শ্রমিকদের
মধ্যে একটি
সহযোগিতা ও
সমন্বয়ের সম্পর্ক
থাকা খুবই
জরুরি।
সামাজিক পর্যায়ে
দার্শনিক-অর্থনীতিবিদ
খালদুন সব
শিল্প এবং
জাতীয় অর্থনীতির
সব খাতের
মধ্যে একটি
সহযোগিতা, সমন্বয়
ও সহমর্মিতামূলক
সম্পর্কের স্বপ্ন
দেখে গেছেন।
তিনি আশাবাদী
মানুষ, তাই
প্রত্যাশার কথাও
শুনিয়েছেন, সমাজ
ও অর্থনীতির
বিভিন্ন ক্ষেত্রে
যার যার
যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা
ও প্রশিক্ষণ
অনুযায়ী প্রতিটি
শ্রমিক সবার
সঙ্গে যোগাযোগ
ও সহযোগিতার
হাত বাড়িয়ে
দিলে উৎপাদন
বাড়ে এবং
সবার জন্য
উদ্বৃত্তও জমা
হয়।
খালদুন এখানেই
থেমে থাকেননি।
তিনি তার
দূরদৃষ্টিকে আরো
প্রসারিত করে
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
পৌঁছে দিয়েছেন,
যেখানে আলাদা
সমাজ ও
রাষ্ট্র তাদের
উদ্বৃত্ত পণ্য
বাণিজ্যের মাধ্যমে
হাতবদল করতে
পারে এবং
এক সঙ্গে
সবাই লাভবানও
হতে পারে।
তার মতে,
এখানে আন্তর্জাতিক
শ্রম বিভাজন
ও বাণিজ্যের
ভিত্তি প্রাকৃতিক
সম্পদের মালিকানা
নয়, বরং
ভিত্তি হবে
শ্রমিকের যোগ্যতা,
দক্ষতা, অভিজ্ঞতা
এবং প্রশিক্ষণ।
যেসব দেশ
যত কার্যকরভাবে,
সফলতা ও
দক্ষতার সঙ্গে
তার শ্রমশক্তিকে
দেশের অভ্যন্তরীণ
প্রয়োজন মেটানোর
কাজে লাগাতে
পারে তারাই
তাদের শ্রমিকদের
রফতানি পণ্য
তৈরিতে তত
বেশি সুফল
পেতে পারে
এবং তত
বেশি মূল্যসংযোজনও
করতে পারে।
কর, ল্যাফার রেখা
এবং জোগানের দিকের অর্থনীতি
সরকারি
করারোপ এবং
রাজস্ব আহরণের
ব্যাপারে ইবনে
খালদুন বেশি
রাজস্ব আদায়ের
লক্ষ্যে করের
হার বাড়ানোর
একদম পক্ষে
ছিলেন না।
কারণ করের
হার বাড়লে
স্বাভাবিকভাবে মানুষের
কর্মোদ্যম ও
কর্মপ্রেরণায় ভাটা
পড়ে। কম
কাজ মানে
কম আয়,
কম আয়
মানে কর
প্রদানে সক্ষমতা
হ্রাস পাওয়া।
এ অবস্থায়
সরকারের জন্য
বেশি রাজস্ব
আদায়ের সম্ভাবনা
থাকে না।
পক্ষান্তরে করের
হার কম
করে রাখলে
লোকজনের কাজে
উৎসাহ কমে
না, বরং
বাড়তি আয়ের
আশায় তারা
বেশি কাজ
ও বেশি
উপার্জন করে।
এভাবে বেশি
মানুষ বেশি
কাজ করলে
কর থেকে
সরকারের রাজস্ব
হয় অনেক
বেশি। ১০টি
উন্নত দেশ,
১০টি উন্নয়নশীল
দেশ এবং
১০টি স্বল্পোন্নত
দেশের ওপর
একটি সমীক্ষায়
দেখা গিয়েছে,
সাড়ে ৬০০
বছর আগে
খালদুনের দেয়া
করতত্ত্ব এখনো
সঠিক ও
বাস্তবসম্মত। বিস্তারিত
জনতে হলে
International
Journal of Academic Research in Business and Social Sciences-এ
২০১৭ সালে
প্রকাশিত আবু
বকর জাফর
এবং আব্দুল
গাফার ইসমাইলের
প্রবন্ধ পড়ে
দেখতে পারেন। উইকিপিডিয়ায়
খালদুনীয় অর্থশাস্ত্রের
যে বিবরণ
আছে তাতে
দেখা যায়,
তার করনীতিকে
আধুনিক কালের
‘Laffer
curve’ এর
সঙ্গে তুলনা
করা হয়েছে।
শুধু তফাত
হলো Arthur Laffer
যা সেদিন
বলেছেন, ইবনে
খালদুন তা
বলেছেন ৫০০
বছর আগে।
এখানে আরেকটা
বিষয় লক্ষ
করার মতো—‘Laffer
curve’-এর
উদ্গাতা এমন
দাবি করেননি
যে, তিনি
এটা ষোল
আনা স্বতন্ত্রভাবে
একা একাই
এঁকেছেন। (চলবে)
[লেখাটি
প্রথম প্রকাশ
হয়েছে কলকাতা
থেকে প্রকাশিত
অর্থনীতিবিষয়ক ষাণ্মাসিক
বাংলা জার্নাল
‘অর্থবিশ্লেষণ’-এ
(ষষ্ঠ বর্ষ:
প্রথম ও
দ্বিতীয় যুগ্ম
সংখ্যা: ২০২১-২২)]
আবু এন
এম ওয়াহিদ: অধ্যাপক,
টেনেসি স্টেট
ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
এডিটর,
জার্নাল অব
ডেভেলপিং এরিয়াজ