বিশ্লেষণ

বৈধ অর্থকে সহজে বাইরে না নিতে দিলে হুন্ডি-হাওলা থাকবেই

হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় দেশেও আসছে আবার বাইরেও যাচ্ছে। দেশে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে যে অর্থ দেশে আসছে তা নিয়ে আমাদের অত ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ বেশি হলো হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে যে অর্থ বিদেশে যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে। আমরা এভাবে অর্থ বিদেশে যাওয়াকে অর্থ পাচার বলছি, কিন্তু আমরা কমই ভেবে দেখেছি, কেন বাংলাদেশের লোকেরা কথিত এ অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচার

হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় দেশেও আসছে আবার বাইরেও যাচ্ছে। দেশে হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে যে অর্থ দেশে আসছে তা নিয়ে আমাদের অত ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ বেশি হলো হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে যে অর্থ বিদেশে যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে। আমরা এভাবে অর্থ বিদেশে যাওয়াকে অর্থ পাচার বলছি, কিন্তু আমরা কমই ভেবে দেখেছি, কেন বাংলাদেশের লোকেরা কথিত এ অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। অর্থের ধরন দুই ধরনের। একটা হলো বৈধ অর্থ বা বৈধ আয় থেকে লব্ধ অর্থ। অন্যটি হলো অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ। অবৈধ অর্থকে আবার দুভাগে ভাগ করা হয়। একটা হলো অবৈধ উৎস থেকে। যেমন কেউ মাদক বিক্রয় করে যে অর্থ পাচ্ছে সেটা অবৈধ। অন্য অবৈধ অর্থ হলো উৎসটা বৈধ বটে, তবে সেই আয়ের বিপরীতে কর্তৃপক্ষকে ট্যাক্স দেয়া হয়নি। তবে ট্যাক্স ফাইলে প্রদর্শিত অর্থ সংজ্ঞা অনুযায়ীই বৈধ অর্থ। ধরে নিলাম, অবৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থ বা আয় যেহেতু স্বীকৃত অর্থ বা আয় নয়, সেটা বৈধ পথে বাইরে নেয়ার অনুমোদন দেয়ার প্রশ্নই আসে না, কিন্তু বৈধভাবে অর্জিত অর্থকে টাক্স দিয়ে হলেও বৈধপথে বাইরে নেয়ার অনুমোদন দেয়া উচিত বলে আমাদের মনে হয়। আর ট্যাক্স ফাইলে প্রদর্শিত অর্থকে বিনা বাধায় বৈদেশিক মুদ্রায় বাইরে নেয়ার অধিকার আয়ের মালিককে দেয়া উচিত। ব্যক্তির অর্থ ব্যক্তি কীভাবে কোথায় ব্যয় করবে এটা সম্পূর্ণ তার অধিকারের বিষয়। এখন আমরা যদি বৈধ ট্যাক্স পেইড অর্থকে নানা নিয়মকানুনে বা বিধিনিষেধ আরোপ করে আটকাতে চাই সেটা রীতিমতো অন্যায়। শেষ পর্যন্ত সৎ লোকগুলো তাদের সৎভাবে অর্জিত অর্থকে হুন্ডি-হাওলা করে বাইরে নিতে বাধ্য হয়। তাতে তাদের খরচও বেশি হয়। যে অর্থনীতিতে তারা সেই অর্থ নিচ্ছে সেই অর্থনীতিও ওই পাঠানো অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির বৈধ আয়ও মানি লন্ডারিংয়ের বিধিনিষেধের আওতায় এসে যেতে পারে। আমাদের মধ্যে একটা ধারণা আছে, অর্থকে আইন করে আটকানো যায়। কিন্তু সত্য হলো, অর্থকে আইন করে আটকানো যায় না। বরং অর্থের অবাধ প্রবাহ আয়-রোজগারকে সহায়তা যেমন করে তেমনি যেসব অর্থনীতি অর্থের আসা-যাওয়াকে স্বাধীনতা দেয় ওইসব অর্থনীতিতে বেশি অর্থ আসে। বাংলাদেশী যারা বিদেশে থেকে অর্থ প্রেরণ করে, তারা যদি মনে করে তারা চাইলেই সে অর্থ বিনা জিজ্ঞাসায় আবার বাইরে নিয়ে যেতে পারবে তাহলে তারা বৈধ পথেই বেশি অর্থ দেশে প্রেরণ করবে। কিন্তু তারা যখন বৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে দেশে একটা বাড়ি কেনে, পরে সেই বাড়ি বিক্রয় করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ কি তারা বৈদেশিক মুদ্রায় বিনা বাধায় দেশের বাইরে পাঠাতে পারে?

আমার জানা মতে পারে না। বাংলাদেশে বিদেশ থেকে অর্থ আনা যত সহজ, বিদেশে অর্থ নেয়া অতটা সহজ নয়। আজকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেকটা দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। তার পরও কিছু লোক বাইরে থেকে হুন্ডি-হাওলায় কেন তাদের আয় দেশে পাঠাচ্ছে? কারণ ভালো রেটের প্রাপ্তি আর অতিদ্রুত উপকারভোগীর কাছে অর্থকে পৌঁছে দেয়ার নিশ্চয়তা। যা-ই হোক, এ হুন্ডির পরিমাণ হয়তো অত বেশি নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, বড় বড় হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ নেয়াকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থ নেয়ার পথগুলোকে আরো সহজ করে দিতে হবে।

অন্য কথায়, অর্থপ্রবাহকে বাধা দিলে অর্থ কথিত বেআইনি পথে প্রবাহিত হবে। যে অর্থনীতি অর্থপ্রবাহের ক্ষেত্রে যত বেশি বিধিনিষেধ আরোপ করে, সেই অর্থনীতি থেকে অর্থ বাইরে যেতে চাইলে হুন্ডি-হাওলার আশ্রয় নিবেই। আবার সেই অর্থনীতিতে অর্থের আন্তঃপ্রবাহও কম হবে। কোনো অর্থনীতিতে বাইরে থেকে অর্থ বেশি প্রবাহ হয়। আবার কোনো অর্থনীতিতে কম প্রবাহ হয়। এর মূল কারণ হলো তিনটি। এক. অর্থকে সহজে বাইরে নেয়া যায় না, সহজে বাইরে নিতে পারলে সেই অর্থনীতিতে অর্থ বাইরে থেকে বেশি আসবে। দুই. ট্যাক্স বা করের হার। করের হার বেশি থাকলে অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ যেমন অর্থনীতিতে বাড়বে তেমনি বাইরে থেকে অর্থও সেই অর্থনীতিতে কম প্রবাহিত হবে। তিন. সেই অর্থনীতি অন্য অর্থনীতিগুলোয় দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত কিনা। বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিতে অর্থ কম আসে এবং বাইরেও কম যায়। সেই অর্থনীতি আজকের প্রেক্ষাপটে বেশি এগোতে পারে না। অন্য বিষয়টি হলো সামাজিক স্বস্তি। সামাজিক স্বস্তি থাকলে অর্থপ্রবাহ বাড়ে। যেসব অর্থনীতি অন্তহীন অন্তঃকোন্দলে লিপ্ত ওইসব অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ কম হয়। আইনের শাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা অর্থপ্রবাহের জন্য অন্যতম বড় নিয়ামক। অর্থ-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ধরন ও সময় অর্থপ্রবাহের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। মানুষ যেমন নিরাপত্তা খোঁজে। অর্থও তেমনি নিরাপত্তা খোঁজে। অর্থ নিরাপত্তা যেমন চায় তেমনি অর্থ আয়ও চায়। যেসব অর্থনীতি অর্থকে বেশি আয় দিতে পারবে ওইসব অর্থনীতিতে অর্থ বেশি প্রবাহিত হয়। সাধারণত মুক্ত অর্থনীতিতে অর্থ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দুবাই কেন বেশি অর্থ পাচ্ছে? সেই একই কারণে, উন্মুক্ততা এবং অন্য দেশের সঙ্গে সংযুক্তির কারণে। সিঙ্গাপুরের অবস্থানও তাই। সেখানে ট্যাক্স হার এবং অর্থের যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে অনুকূল অবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ থেকে অনেক অর্থই হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে বাইরে যাচ্ছে। সেটার পরিমাণ তথ্যমতে ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলার হবে। তবে এর বড় অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্য অর্থ থেকে বাইরে যাচ্ছে। এসব হুন্ডি-হাওলার অর্থের অন্য বড় উৎস হলো ঋণখেলাপির মাধ্যমে প্রাপ্য অর্থ। অর্থ পাচার বা হুন্ডি-হাওলার মাধ্যমে অর্থ পাচার কমাতে গেলে সহজে অর্থপ্রাপ্তির উৎস বন্ধ করতে হবে, যা বাংলাদেশ ইচ্ছা করলে অনেকটাই করতে পারে। ব্যাংক লুট করা অর্থ তো ওইসব পথেই বাইরে যায়। এতে আর আশ্চর্যের কী আছে! দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বাইরে যেতে বৈধ পথ খোঁজে না। দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থের প্রাপ্যতাকে উৎসেই বন্ধ করতে হবে। আইন-কোর্ট-দুর্নীতি দমন কমিশনকে যেমন এক্ষেত্রে তৎপর হতে হবে, তেমনি রেগুলেটরকে এক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। বৈধ অর্থকে বাইরে নিতে বিধিনিষেধকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে অন্য দেশ যেটা করেছে সেটা হলো, মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্টকে আংশিক হলেও কনভার্টেবল করে দিতে হবে। আজকের ডলারের অভাবে ব্যাংকগুলো ছাত্রদের বিদেশে পড়ালেখার জন্য স্টুডেন্টস ফাইলগুলো বন্ধ করে রেখেছে। তাহলে এসব ছাত্র বিদেশে কীভাবে লেখাপড়া করবে, অথচ তাদের অভিভাবকদের বৈধ অর্থ আছে। তারাও শেষ পর্যন্ত অর্থ নেয়ার ক্ষেত্রে হুন্ডির আশ্রয় নিচ্ছে। বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী বিনা ঘোষণায় বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই বৈধ আয় আছে। মুশকিল হলো, ব্যাংক চিকিৎসা বা গ্রাহকের জন্য চাহিদা মতো বৈদেশিক মুদ্রা দিচ্ছে না। তাই তো তারা পকেটের মধ্যে করেই বিদেশে ডলার নিয়ে যাচ্ছে।

সবার পকেটে হাত দিয়ে চেক করা কি সম্ভব? তাই বলব, সামগ্রিকভাবে ইস্যুগুলোকে বিবেচনায় নেয়ার জন্য। সরকার ইচ্ছা করলে ফার্স্ট ক্লাস, এক্সিকিউটিভ ক্লাসে বাংলাদেশীদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এতে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে। যারা ঘন ঘন ফার্স্ট ক্লাস, এক্সিকিউটিভ ক্লাসে বিদেশ যাচ্ছে তাদের ট্যাক্স ফাইলও দেখা যাতে পারে। অর্থনীতির মূল পলিসি হওয়া উচিত—বৈধ উপায়ে উপার্জনে উৎসাহ দেয়া এবং বৈধ আয়কে সঠিকভাবে যেকোনো স্থানে ব্যবহার করতে দেয়া। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সেটাও আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। বিচ্ছিন্ন ও অস্থির অর্থনীতিতে আয় থাকতে চায় না। আয় খোঁজে তার রিটার্ন আর নিরাপত্তা। আমরা যতদিন এ দুই উপাদানকে সরবরাহ করতে পারব না, ততদিনই আমরা অর্থ কম পাব এবং আমাদের অর্থনীতি ধীরে এগোবে। আসিয়ানের অর্থনীতিগুলো যদি বিচ্ছিন্ন থাকত, তাহলে সেসব অর্থনীতিতে এত তাড়াতাড়ি উন্নতি হতো কি? তাই বাংলাদেশ গ্লোবালি যত সংযুক্ত হবে ততই বাংলাদেশ তাড়াতাড়ি এগোবে এবং সেই অর্থনীতির ওপর মানুষের আস্থা আসবে। আস্থাহীন অর্থনীতিতে অর্থ এলেও সেই অর্থ থাকবে না। সেই অর্থ বিনিয়োগে ব্যবহার হবে না।

আবু আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক

আরও