প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পুরাকীর্তি, শিল্পসম্পদ—এগুলো দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এগুলো থেকে বিগত সময়ের ধারণা লাভ করে। যে কারণে এসব নিদর্শন সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় এবং পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন রাষ্ট্র এ দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে। দুঃখজনকভাবে এ দেশ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে তেমন সফলতা দেখাতে পারেনি। বরং এক্ষেত্রে এক ধরনের উদাসীনতাই পরিলক্ষিত হয়েছে।
এদিকে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পুরো দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বল নজরদারির কারণে অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলো। সেই সঙ্গে বিগত সরকার পতনের পর থেকে কয়েকদিন দেশের সীমান্তগুলোও ছিল অরক্ষিত। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চলছে প্রত্নসম্পদের চোরাচালান। গত কয়েক মাসে সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় উদ্ধার হয়েছে মূল্যবান পাথরের মূর্তিসহ বেশকিছু প্রত্নসম্পদ। যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীসহ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, উদ্ধারকৃত প্রত্ন ও শিল্পসম্পদের চেয়ে পাচারকৃত সম্পদের সংখ্যা আরো বেশি। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সরকারের উদাসীনতা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পনা নেয়া ও তা বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এমনিতে সরকারের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে মনোযোগী না হওয়ার দরুন বর্তমানে অনেক ঐতিহ্য আজ হারাতে বসেছে। সরকারিভাবে দেশের প্রত্নসম্পদগুলো যেটুকু রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, সেগুলোও সুপরিকল্পিত নয়। এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই অনেক সমস্যা আছে। সেগুলো অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে সর্বাগ্রে। তবে চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত সমাধানের পথে হাঁটা আবশ্যক। পাশাপাশি প্রত্নসম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
যেমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে, এ মুহূর্তে প্রত্নসম্পদ পাচারের ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটছে উত্তরবঙ্গে। বিশেষ করে দিনাজপুর ও আশপাশের জেলাগুলোর সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে প্রচুর প্রত্নসম্পদ পাচার হচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের মতে, এ অঞ্চলের কয়েকটি জেলায় প্রাচীন আমলে বিভিন্ন সময়ে নানা জনপদ গড়ে উঠেছে। এসব এলাকা প্রত্নসম্পদেও বেশ সমৃদ্ধ। আবার জেলাগুলোর সঙ্গে ভারতের বিস্তৃত সীমান্ত এলাকার বড় একটি অংশ অরক্ষিত। এ কারণে প্রত্নবস্তু পাচারকারীরা এ অঞ্চলে এখন বেশি সক্রিয়। অভিযোগ আছে, এখান দিয়ে পাচার হওয়া প্রত্ন নিদর্শনগুলো গিয়ে জমা হয় সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট এলাকায়। ওই এলাকাটিও প্রাচীন নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত। সেখানে বেশকিছু বিহার রয়েছে। ফলে সেখান দিয়ে পাচার করা তুলনামূলক সহজ। দিনাজপুরের বাইরে প্রত্নসম্পদ পাচারের আরেকটি বড় রুট হলো নওগাঁ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁর সীমান্তবর্তী তিনটি এলাকা দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রত্নবস্তু পাচার হয়। সুতরাং এ অঞ্চলগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে ও কড়া নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলত শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। এছাড়া জব্দকৃত প্রত্নসম্পদ সুরক্ষিত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে। যেকোনো প্রত্নসম্পদ যদি একবার দেশের বাইরে চলে যায়, তবে তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য বলে মনে করছেন প্রত্নতত্ত্ব গবেষকরা। তাই এসব সম্পদ রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্ব ও ভূমিকা প্রয়োজনে আরো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ সব নিদর্শন সরকারি তত্ত্বাবধানে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। যেমন বিভিন্ন অঞ্চলের উপাসনালয়, জমিদারবাড়ি, গ্রন্থাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত প্রত্ননির্দশনগুলো। এজন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোয় বাস করা জনগণকে সম্পৃক্ত করা দরকার। আবার এসব নিদর্শনের সুরক্ষার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, যেমন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি এবং স্মার্ট নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকা ও সীমান্তে পাচার রোধে গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইন পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো সংরক্ষণে কোনো অসুবিধা না হয়। অর্থাৎ আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কেউ যেন এসব সম্পদ পাচার বা বিক্রি করতে না পারে।
পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, প্রত্নসম্পদ রক্ষার আইন যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত নয়, যা এর সুরক্ষার পথে বড় বাধা। গত সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট পরিদর্শনকালীন জানিয়েছিলেন যে এগুলো সংরক্ষণে সঠিক নীতিমালা তৈরির জন্য তিনি এসব নিদর্শন দেখতে গিয়েছিলেন। আমরা এ বিষয়ে আশাবাদী হতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো এরপর অনেকটা সময় পেরিয়েছে। নীতিমালা তৈরির কোনো উদ্যোগ যেমন নেই, তেমনি আপাত সুরক্ষার জন্য কোনো কার্যক্রমও নেই। এ পরিস্থিতি হতাশাজনক। প্রত্যাশা রয়েছে, সরকার এ বিষয়ে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে। বিশেষত প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর। কেননা এটি গঠন করা হয়েছে প্রত্নসম্পদ রক্ষায়। এ অধিদপ্তরকে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইনের কাঠামো শক্ত করতে হবে। দেশে পুরাকীর্তি বিষয়ে তিনটি আইন বিদ্যমান: ‘ট্রেজারস ট্রুভ অ্যাক্ট ১৮৭৮’, ‘অ্যানশিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্ট ১৯০৪’ ও ‘অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট ১৯৪৭’। তিনটি আইনই ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত। আইনগুলো পাকিস্তান আমলে হুবহু আত্তীকৃত হয়েছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর একই অবস্থায় আইনগুলো কার্যকর করা হয়েছে। ট্রেজারস ট্রুভ আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রাপ্ত সময় থেকে ১০০ বছরের পুরনো (১০ টাকা মূল্যমানের হলেও) মাটির নিচে থাকা যেকোনো বস্তু পাওয়ামাত্র নিকটতম ট্রেজারিতে জমা করতে প্রাপক বাধ্য থাকবে। আইনটি ১৮৯১ ও ১৯০৭ সালে কিছু সংশোধন করা হয়। তবে নানা কৌণিকে ব্যাখ্যা করে আইনটির সংস্কার খুবই প্রয়োজন। ‘অ্যানশিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্ট’ পুরাকীর্তির পাচার রোধ এবং ঐতিহাসিক ইমারত রক্ষা, প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও শিল্পকলার নিদর্শনগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। পুরাকীর্তি পাচারের ক্ষেত্রে কঠোরতম শাস্তির বিধান রেখে আইনটির সংশোধনী আশু প্রয়োজন। অ্যান্টিকুইটিজ (এক্সপোর্ট কন্ট্রোল) অ্যাক্ট আইনবলে সরকারি অনুমোদনক্রমে বিদেশে পুরাকীর্তি রফতানি করা যায়। বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে এ আইনেও। যে কেউ কৌশল অবলম্বন করে দেশের মহামূল্য ওই-জাতীয় সম্পদ সরকারের কাছ থেকে অনুমতি সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতে পারে। আইনের এসব ফাঁকফোকর দূর করে নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে।