এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার সুপারিশ

সব সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত যাচাই হোক

এনবিআরের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অন্য করদাতাদের আয়, সম্পদ ও করসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করেন। অথচ তাদের নিজেদের সম্পদের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত না হলে কর প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেয়ার বিধান অনেক আগে থেকেই রয়েছে। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালায় পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দেয়ার নিয়ম। আবার সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু বিধান ও নির্দেশনা থাকলেও তা নিয়মিতভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ আয়ের সুযোগ থেকে যাচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ ইতিবাচক। সরকারের উচিত সুপারিশটি অনুমোদন করে কার্যকর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া। তবে এ উদ্যোগ কেবল এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে কার্যকর করা প্রয়োজন।

সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বৈধ আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অনেক অভিযোগ এরই মধ্যে প্রমাণিত এবং অনেকগুলো তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে কেবল ঘুসের টাকার মধ্যে ৭৭ হাজার থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা গেছে আমলাদের কাছে। টাকা পাচারের জন্য দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের ক্রীড়নক, আমলাদের মধ্যে এক ধরনের অনৈতিক চক্র গড়ে ওঠে।

আবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনের তথ্যে উল্লেখ করা হয়, কেবল ২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুসের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৪ (এপ্রিল) পর্যন্ত সেবা খাতে জাতীয় পর্যায়ে মোট ঘুসের ন্যূনতম প্রাক্কলিত পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৫২ কোটি টাকা।

এসব তথ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে, অনিয়ম-দুর্নীতির চর্চা ব্যাপক হারে হয় এবং এর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন মহলের মানুষ জড়িত। কিন্তু সবাইকে একভাবে তদারকির আওতায় আনা সম্ভব নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধভাবে সম্পদ আয়ের রাশ টানার একটা উপায় হতে পারে তাদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণ নিয়মিতভাবে নেয়া এবং কার্যকরভাবে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

সরকারি দায়িত্বে থেকে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সুযোগ বন্ধ করা এবং জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত আয় ও বৈধ অর্থের উৎসের অসংগতি রয়েছে কিনা তা নিয়মিতভাবে খতিয়ে দেখা গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহির সংস্কৃতিও শক্তিশালী হবে। শুধু অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের একটি নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অনিয়মের ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

এনবিআরের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অন্য করদাতাদের আয়, সম্পদ ও করসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করেন। অথচ তাদের নিজেদের সম্পদের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত না হলে কর প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এনবিআরের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও এ উদ্বেগকে জোরালো করেছে। সাবেক সদস্য মতিউর রহমান, অতিরিক্ত কমিশনার কাজী আবু মাহমুদ ফয়সল, সাবেক বৃহৎ করদাতা ইউনিটের কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী এবং সদস্য মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা বা অভিযোগের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি সংস্থাটির নিজস্ব তদন্তেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার নজির রয়েছে। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট, রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি অপরিহার্য।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায়ও কর প্রশাসনে দুর্নীতি ও জবাবদিহির ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির জরিপে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর প্রায় ৪৫ শতাংশ জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর-সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে তারা কর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ঘুসের দাবি পেয়েছে। একই জরিপে ৭৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির ঘাটতিকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ৭২ শতাংশের মতে, কর প্রশাসনে দুর্নীতি ব্যাপক। কর প্রশাসনের এ ধরনের দুর্বলতা শুধু সরকারি রাজস্ব আহরণকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অনানুষ্ঠানিক আর্থিক চাপ বাড়ায় এবং করদাতাদের আস্থাও কমিয়ে দেয়। তাই এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি বৃহত্তর স্বার্থে প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকারি সব কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব যাচাই হওয়া চাই।

সম্পদের বিবরণীতে ঘোষিত আয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। ঝুঁকির ভিত্তিতে নিরীক্ষা ও দৈবচয়নের সমন্বয়ে যাচাই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হলে সীমিত জনবল ও সম্পদ ব্যবহার করেও কার্যকর তদারকি সম্ভব। সম্পদের হিসাবে অসংগতি পাওয়া গেলে তার ব্যাখ্যা চাওয়া, অর্থের উৎস অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্ত বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে। একই সঙ্গে সম্পদের তথ্য জমা না দেয়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আইনগত কাঠামো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি। পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী চাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির ভিত্তি স্পষ্ট করতে হবে। শুধু পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কাউকে দায়ী না করে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসূত্র যাচাই করতে হবে। অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এতে একদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের সুযোগ কমবে, অন্যদিকে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।

আরও